রুহিন হোসেন প্রিন্স:
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাদের কাজের কোন রোডম্যাপ ঘোষণা করেনি । এখানো তাদের রোডম্যাপ আমাদের কাছে পরিস্কার নয় ।
এ কথাটা এজন্য আসছে যে, এই সরকার গঠিত হয়েছে একটি অভূতপূর্ব স্বতঃস্ফূর্ত ছাত্র-জনতার গণঅভ্যূর্থনের মধ্য দিয়ে। এদেশের অধিকাংশ মানুষ, অধিকাংশ গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে লড়াই করছিল বিগত স্বৈরাচারী ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের জন্য।
বিগত দিনের শাসকরা উন্নয়নের গল্প বলে মানুষকে ভুলিয়ে রাখতে চেয়েছিল। দেশকে দুর্নীতি লুটপাটের স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছিল। ব্যক্তি, পরিবর্ন্ত্র,গোষ্ঠীতন্ত্র দেশের মানুষের উপার্জিত সম্পদ অধিকাংশই লুট করে নিয়ে বিদেশে পাচার করেছিল । তারা দেশটাকে প্রকারান্তরে পরিত্যাগ করে ওইসব দেশেই নিজেদের আবাসভূমি করে তুলেছিল। দুর্বৃত্তায়িত অর্থনীতি , দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতির পথ আরো পরিষ্কার করে তুলেছিল।
পরপর তিনটি নির্বাচনে মানুষের ভোটাধিকার কে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছিল। নিজেদের ভোটে বিজয়ী দেখানোর জন্য এমন এমন তকমা সামনে এসেছিল যে, আগে কখনো দেখেনি এদেশের মানুষ।
'প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন অধিকাংশ আসনে বিনা ভোটে বিজয়ী ভোট','রাতের ভোট','আমিও ডামি'র ভোট' - দেশের ভোটাভিধানে নতুন করে যুক্ত হয়েছে। ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখতে ক্ষমতাসীনদের দিন দিন আরও কর্তৃতবাদী স্বৈরতন্ত্রী হয়ে উঠতে হয়েছিল।
এসবের বিরুদ্ধে দেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দলসমূহ ও বিভিন্ন শ্রেণি প্রেশার মানুষের লড়াই চলেছে দীর্ঘদিন ধরে। গ্রেপ্তার নির্যাতন, গুম , সারা দেশে ভয়ের রাজত্ব কায়েম করে সরকার ক্ষমতায় থাকার শেষ চেষ্টা করেও পার পায়নি। শেষে নৃশংস হত্যাযজ্ঞ পর্যন্ত সংগঠিত করেও ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারেনি।
বিগত ক্ষমতাশীল সরকারের গণতন্ত্রহীন পরিবেশে নানা ধরনের অগণতান্ত্রিক অপশক্তি গড়ে উঠেছে। সাম্প্রদায়িক শক্তি ফুলে-ফেপে উঠেছে ।সমাজের অভ্যন্তরে তারা প্রভাব বিস্তার করার নানা উপাদান তৈরি করেছে। আর পাশের আধিপত্যবাদী দেশ ও সাম্রাজ্যবাদী দেশ সমূহ, তারা তাদের স্বার্থ রক্ষায় নানাভাবে প্রভাব বিস্তারকারী হয়ে উঠেছে।
এরা যার যার অবস্থান থেকে সরকারের পক্ষে-বিপক্ষেও অবস্থান নিয়েছিল।
এরই মধ্যে বুকের রক্ত দিয়ে পাঁচই আগস্ট ২০২৪ সংগঠিত হয় অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থান। এই অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী ছাত্র-জনতার "গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করার সাথে সাথে স্বৈরাচারী ব্যবস্থার অবসান ও বৈষম্যমুক্ত দেশ গড়ার স্বপ্ন"- দেশবাসী সামনে চলে আসে।
এরই পটভূমিতে গঠিত হয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। সব রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে কথা বলে পরামর্শ নিয়ে এই সরকার গঠিত হয়েছে এমনটি নয়। কিন্তু আন্দোলনকারী গণতন্ত্রিক সব শক্তি এই সরকারের প্রতি তাদের সমর্থন ব্যক্ত করেছে।
এর মধ্য দিয়ে এই আকাঙ্খাই সামনে এসেছে যে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্ব পালন করে এ সময়ে জনগণের স্বার্থ রক্ষা করবেন। এটাই হলো জনগণের প্রধান আকাঙ্ক্ষা।
তাই আমরা সবাই শুরুতে এই সরকারের কর্মকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ দেখতে চেয়েছিলাম এখনও চাই।
একই সাথে আমাদের আকাঙ্ক্ষা সরকার দেশের অর্থনীতি সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যে ধ্বংস হয়ে গেছে এগুলো পুনরুত্থানের রূপরেখা প্রণয়নে কার্যকর ভূমিকা নেবেন। আর মূল কাজটি করবেন নির্বাসনে যাওয়া নির্বাচন ব্যবস্থার আমুল সংস্কার করে একটি গ্রহণযোগ্য সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের। যার মধ্য দিয়ে জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতিনিধিরা যার যার কাজে ফিরে যাবেন । ভোট দিয়ে যার যার কাজে ফিরে যাওয়ার কথা অবশ্য প্রধান উপদেষ্টা শুরুতেই বলেছেন।
এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তিন মাস হতে চলল। সময়টা খুব বেশি নয় আবার কমও নয়। সংগঠিত হওয়া গনঅভ্যুত্থান ও ব্যাপক জনসমর্থনে এই সরকার চলছে তাই এই সময়ে এই সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা ছিল অনেক। জনসমর্থন নিয়ে কাজ করার সুযোগও অনেক।
দেশের রাজনৈতিক সচেতন মানুষ এসময়ে সরকারের চলমান কার্যক্রমকে নানাভাবে বিশ্লেষণ করছেন। সরকার বিভিন্ন সময়ে সংকটে পড়লে সামান্য সময়ের জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোকে ডেকে কিছু কথা বলছেন, শুনছেন। কিন্তু প্রকৃতভাবে কিভাবে সরকার চলবেন, তার রোডম্যাপ কি হবে, এসব বিষয় রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে শুনছেন,বলছেন --এমন কোন খবর আমাদের জানা নেই।
অর্থাৎ সরকার এখনো রাজনৈতিক দলগুলোকে আস্থায় নিয়ে তাদের পরামর্শ নিয়ে দেশ চালাচ্ছেন এমনটি বলা যায় না।
এসব বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো ও বিভিন্ন শ্রেণী পেশার সংগঠনগুলোর মধ্যে নানা মত থাকলেও অধিকাংশের একটা সাধারণ ঐক্যমত্য দেখা যায়। তা হলো :
সরকার সংস্কারের রূপরেখা প্রণয়ন করে ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে সংস্কারের কাজ শুরু করতে পারে। আর পরবর্তী কার্যক্রম এগিয়ে নেয়ার কথা অঙ্গীকার করবেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। যারা আগামীতে ক্ষমতায় যাবেন তাদের অন্যতম দায়িত্ব হবে এসব সংস্কারের কাজ এগিয়ে নেওয়া। কিন্তু জরুরী কাজ হল এখনই নির্বাচন ব্যবস্থা আমূল সংস্কারের জন্য প্রধানত রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলোচনা করে নির্বাচনী রোডম্যাপ ঘোষণা করা। এ কথাও বলা হচ্ছে এ কাজে দেরি হলে নানা অপশক্তি নানা সুযোগ নিতে পারে। আর কেউ যদি এই কাজে দেরি করে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণসহ অন্য কোন পদক্ষেপের চিন্তা করে তা দেশবাসী গ্রহণ করবে না।
বর্তমান সরকারের তিন মাস পূর্তিকে সামনে রেখে এসব কথাই আমরা আবার তাদের মনে করিয়ে দিতে চাই।
এখনো পর্যন্ত আমরা জুলাই আগস্ট এর গণআন্দোলনের সময় নিহত আহতদের পূর্ণ তালিকা করতে পারেনি। আহতদের ক্রন্দন শেষ হয়নি। অনেকে অভিযোগ করছেন তাদের ক্রন্দন শোনা হচ্ছে না। তাদের বেঁচে থাকার পথকে আরো মসৃণ করতে আমাদের সর্বোচ্চ উদ্যোগ অব্যাহত রাখতে হবে।
এসব কাজের পাশাপাশি জনমনে আকাঙ্ক্ষা ছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দ্রুত জনজীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনবেন। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। সিন্ডিকেট ভাঙ্গা হবে।বেশন ব্যবস্থা ও ন্যায্য মূল্যের দোকান খোলায় উদ্যোগ নেওয়া হবে। কৃষক খেতমজুরের স্বার্থ রক্ষায় ভূমিকা নেয়া হবে। । শ্রমিকের জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ও ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার নিশ্চিত করা হবে।আইনশৃংখলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটানো হবে। প্রশাসনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা হবে। এক দলবাজ, এক চাঁদাবাজির পরিবর্তে আরেক দলবাজ ও চাঁদাবাজের নিয়ন্ত্রণ মুক্ত হবে দেশ। মানুষ ভয়ের রাজত্বে থাকবে না। নির্দ্বিধায় নির্বিঘ্নে তারা কথা বলতে পারবেন।মানুষের মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার পথ দেখতে পারবেন।
এসব কাজেও প্রয়োজনে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোকে আস্থায় নিয়ে পরামর্শ করবেন সরকার । এসব কাজে তারা এখনও এগুতে পারেনি । এমনকি এগুলোর লক্ষণও জনগণের সামনে তারা আনতে পারেনি।
বরং সরকার মন খুলে সমালোচনার কথা বললেও কোন কোন মহল নানাভাবে মানুষের কন্ঠ রোধ করার অপচেষ্টা চালছে। বিভিন্ন জায়গায় "মব" সৃষ্টি করে এমন কতক কর্মকাণ্ড সংগঠিত করা হচ্ছে যা পূর্ণ গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার পথে অন্তরায় বলে জনগণের সামনে দৃশ্যমান হচ্ছে।
ইতিমধ্যে আন্দোলন করতে যেয়ে শ্রমিকের রক্ত ঝরেছে। সরকার এসবের দায় এড়াতে পারে না।
সংস্কারসহ অন্যান্য কাজও দৃশ্যমান নয়। উপদেষ্টাদের মধ্যে নানা কথা শুনে মনে হয় সমন্বয়হীনতাও আছে ।
আন্দোলনের দাবিদার কোন কোন অংশ এমন এমন আচরণ করছে, তাতে মানুষের স্বস্তি আসছে না বরং বিরক্তি বাড়ছে।
কেউ কেউ মুক্তিযুদ্ধকে বিতর্কিত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছেন। ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের উপর কোথাও কোথাও নির্যাতনের তথ্য প্রকাশিত হচ্ছে। তাদের মধ্যে স্বস্তি নেই।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অন্তরের কথা এখনো দেশবাসী বুঝতে পারছে না। মানুষ এটা বুঝতে চায়।
এসবের দ্রুত সমাধান না হলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাজের সংকট তৈরি হতে পারে। তাই আমাদের প্রত্যাশা থাকবে , হাজারো ছাত্র-জনতার রক্তের বিনিময়ে এবং হাজার হাজার মানুষের আহত হওয়া আর অনিশ্চিত জীবনের যাত্রার মধ্য দিয়ে অর্জিত গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা যেন ধুলিস্যাৎ না হয়, সেই লক্ষ্যে সব কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে হবে।
এ কথা মনে রাখতে হবে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত বাংলাদেশে বিগত ৫৩ বছরে আমরা মানুষের স্বপ্ন পূরণ করতে পারিনি। এমনকি ন্যূনতম ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার কাজও করতে পারিনি। ইতিমধ্যে বিশ্ব নানা পরিবর্তন ঘটে চলেছে। ভূ-রাজনৈতিক কারণে এরাও নানাভাবে আমাদের দেশের উপর নতুন করে আধিপত্য বিস্তরের নতুন নতুন ফন্দি আটছে।
এতসবকে মোকাবেলা করে জনগণের স্বার্থ রক্ষাকে প্রাধান্য দিয়েই আমাদের এগোতে হবে। এ পথ এত সহজ নয়। কিন্তু যদি গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখা যায়, সর্বক্ষেত্রে স্বচ্ছতা জবাবদিহিতা ও জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে, দুর্বৃত্তায়িত অর্থনীতির ধারা ভেঙে, জনসচেতনতা সৃষ্টি করে আমরা এগোতে পারি এবং নীতিনিস্ঠ রাজনৈতিক বিকল্প শক্তি সমাবেশ ঘটিয়ে জনগণের সামনে দৃশ্যমান করতে পারি,তাহলে দেশবাসীর আকাঙ্ক্ষা পূরণের পথেই আমরা এগিয়ে যেতে পারবো।
-লেখক: সাধারণ সম্পাদক, সিপিবি।
hossainprince@yahoo.com.
মো. মামুন হাসান:
ইলিশ আমাদের জাতীয় মাছ এবং দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। এটি শুধু আমাদের নদী ও সাগরের সম্পদই নয়, বরং দেশের কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়ি ...
ইমদাদ ইসলাম:
বিষাক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিচ্ছে দেশের মানুষ। প্রায় প্রতিটি গণমাধ্যমেই প্রতিদিনই দেশের বায়ু মান গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করা হয়।গত ৪ মার্চ বুধবার সকাল ১০টার দিকে রাজধানী ঢা ...
মানিক লাল ঘোষ: ইতিহাসের পাতায় কোনো কোনো দিন আসে যা কেবল একটি তারিখ নয়, বরং একটি জাতির ভাগ্যবদল ও আত্মপরিচয়ের চূড়ান্ত দলিল হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ ছিল তেমনই এক মাহেন্দ্রক্ষণ। সেদি ...
আতিকুল ইসলাম টিটু:
বাংলাদেশকে নয়া উপনিবেশিক আধাসামন্তবাদী রাষ্ট্র হিসেবে বোঝার জন্য কেবল রাষ্ট্র গঠনের পরবর্তী সময় নয়, বরং বিশ্ব ইতিহাসের বৃহত্তর শ্রেণি সংগ্রাম এবং সাম্রাজ্যবাদ ...
সব মন্তব্য
No Comments