এ এম ইমদাদুল ইসলাম:
বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল ভিত্তি হলো গ্রামীণ অর্থনীতি। দেশের মোট জনসংখ্যার ৬৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ মানুষ গ্রামে এবং ৩১ দশমিক ৬৬ শতাংশ মানুষ শহরে বাস করে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-র সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের ১৯.২ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাস করছে। এর মধ্যে শহরে দারিদ্র্যের হার সাড়ে ১৬ শতাংশ এবং গ্রামে সেই হার ২০ শতাংশেরও বেশি।গ্রামের মানুষ কৃষি, ক্ষুদ্র ব্যবসা, মৎস্য ও পশুপালনের মাধ্যমে তাদের জীবিকা নির্বাহ করে। তাই দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা অত্যন্ত জরুরি। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে গ্রামীণ উন্নয়ন, কৃষি, কর্মসংস্থান ও আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতি গঠনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ইশতেহারে কৃষক কার্ড, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে সহায়তা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং কারিগরি শিক্ষার প্রসারের মতো নানা পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
গ্রামীণ অর্থনীতির প্রাণ হলো কৃষি। কৃষিখাতকে আধুনিক ও লাভজনক করা গেলে গ্রামীণ অর্থনীতির প্রাণ ফিরে পাবে। এজন্য কৃষকদের সহজ শর্তে ঋণ প্রদান, সার ও বীজের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং ফসলের সঠিক বাজারমূল্য নিশ্চিত করা গেলে কৃষকরা আরও বেশি উৎপাদনে উৎসাহিত হবে। বর্তমান সরকার কৃষকদের জন্য বিশেষ সুবিধা ও কৃষি উন্নয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, সেচব্যবস্থার উন্নয়ন এবং কৃষিপণ্যের সংরক্ষণাগার নির্মাণের মাধ্যমে কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধি সম্ভব। এজন্য বর্তমান সরকার কৃষকদের জন্য কৃষি কার্ডের ব্যবস্থা করেছ।
তিন ধাপে পর্যায়ক্রমে সারা দেশের সব কৃষককে ‘কৃষক কার্ড’ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। গত পয়লা বৈশাখ, নতুন বাংলা বছরের প্রথম দিনে টাঙ্গাইলের শহীদ মারুফ স্টেডিয়ামে এই কর্মসূচির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পাঁচটি শ্রেণিতে ভাগ করে দেওয়া হবে এই কার্ড। এর মাধ্যমে ১০ ধরনের সুবিধা পাবেন কার্ডধারী কৃষকেরা। এগুলো হলো : এক, ন্যায্যমূল্যে কৃষি উপকরণ, দুই. ন্যায্যমূল্যে সেচ সুবিধা; তিন. সহজ শর্তে কৃষিঋণ; চার. স্বল্পমূল্যে কৃষি যন্ত্রপাতি প্রাপ্তি; পাঁচ. সরকারি ভর্তুকি ও প্রণোদনা; ছয়. মোবাইল ফোনে আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও বাজার তথ্য; সাত. কৃষি বিষয়ক প্রশিক্ষণ; আট, ফসলের রোগ-বালাই দমনের পরামর্শ; নয়. কৃষি বিমা সুবিধা; এবং দশ. ন্যায্যমূল্যে কৃষিপণ্য বিক্রয়ের সুবিধা পাবেন কৃষকেরা। এটি একটি ব্যাংকিং ডেবিট কার্ড। সোনালী ব্যাংকের স্থানীয় পর্যায়ের শাখায় সংশ্লিষ্ট কৃষকদের নামে এই কার্ডের বিপরীতে ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে। প্রাক পাইলটিং পর্যায়ে ১০টি জেলার ১১টি উপজেলার ১১টি ব্লকে ফসল উৎপাদনকারী কৃষকের পাশাপাশি মৎস্যচাষি বা আহরণকারী, প্রাণিসম্পদ খাতে নিয়োজিত খামারি ও দগ্ধ খামারিসহ ভূমিহীন, প্রান্তিক, ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বড়ো শ্রেণির কৃষককে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে লবণচাষীও এতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন।
গ্রামে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প গড়ে তুলতে হবে। শুধুমাত্র কৃষির ওপর নির্ভরশীল থাকলে গ্রামীণ জনগণের আয় সীমিত থাকে। তাই গ্রামে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প, হস্তশিল্প, গার্মেন্টস ও কুটির শিল্প স্থাপন করলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। বিএনপির ইশতেহারে প্রতিটি জেলায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে আর্থিক সহায়তার কথা বলা হয়েছে। এর ফলে যুবসমাজ বেকারত্ব থেকে মুক্তি পাবে এবং শহরমুখী মানুষের চাপ কমবে।
গ্রামে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) গড়ে তুলতে সরকার বিভিন্ন ধরনের নীতি, অবকাঠামো ও আর্থিক সহায়তা দিতে পারে। এ লক্ষ্যে উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে কম সুদে জামানতবিহীন ক্ষুদ্র ঋণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য স্টার্টআপ ফান্ড ও ভর্তুকির ব্যবস্থা করা যেতে পারে। উদ্যোক্তা সৃষ্টির জন্য কারিগরি ও ব্যবসায়িক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করে গ্রামীণ শিক্ষিত নারী ও যুব উদ্যোক্তাদের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে। গ্রামীণ সড়ক, বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সুবিধা বৃদ্ধি করে শিল্পপার্ক বা ক্ষুদ্র শিল্প এলাকা গড়ে তোলা যেতে পারে। সংরক্ষণাগার ও পরিবহন সুবিধা উন্নত করাসহ সহজে কাঁচামাল সরবরাহের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। অনলাইন মার্কেটপ্লেসে পণ্য বিক্রির সহায়তাসহ সরকারি ক্রয়ে স্থানীয় এসএমই পণ্যের অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে। খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, দুগ্ধ, মৎস্য ও হস্তশিল্প শিল্পে উৎসাহ দেওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় সম্পদভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলাকে গুরুত্ব দিতে হবে। লাইসেন্স ও নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজ করা, ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালু করাসহ নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা যেতে পারে। এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা গেলে গ্রামে কর্মসংস্থান বাড়বে, শহরমুখী জনসংখ্যার চাপ কমবে এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে।
কারিগরি শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের ব্যবস্থা বাড়াতে হবে। গ্রামীণ তরুণদের আধুনিক প্রযুক্তি, কম্পিউটার ও বিভিন্ন কারিগরি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিলে তারা দেশ ও বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে। সরকারের পরিকল্পনায় দক্ষতা উন্নয়ন এবং বিদেশে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। এর মাধ্যমে গ্রামের মানুষের আয় বৃদ্ধি পাবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনও বাড়বে। এজন্য কারিগরি শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের ব্যবস্থা বাড়াতে সরকার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি খাতকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে টেকনিক্যাল স্কুল ও পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট স্থাপন করতে হবে এবং বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানের আসন ও সুবিধা বাড়াতে হবে। শিল্পকারখানার চাহিদা অনুযায়ী কোর্স হালনাগাদ করাসহ আইটি, রোবোটিক্স, অটোমেশন, গ্রাফিক ডিজাইন, ফ্রিল্যান্সিং ইত্যাদি নতুন বিষয় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়াসহ শিল্পক্ষেত্রে বাস্তব অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রশিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অংশীদারিত্ব এবং চাকরির বাজার অনুযায়ী দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হবে। নারী শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ বৃত্তি ও নিরাপদ পরিবেশ এবং দরিদ্র ও প্রতিবন্ধীদের জন্য আর্থিক সহায়তা প্রদান করা গেলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাবে। এর মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি তৈরি হবে, বেকারত্ব কমবে এবং দেশীয় শিল্প ও অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে।
গ্রামীণ অবকাঠামোর উন্নয়ন করতে হবে। ভালো রাস্তা, বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা গেলে গ্রামের অর্থনৈতিক কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে। কৃষক সহজে পণ্য বাজারে নিতে পারবে এবং উদ্যোক্তারা ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে পারবে। ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তার ঘটলে গ্রামের মানুষ অনলাইন ব্যবসা ও ফ্রিল্যান্সিংয়ের সঙ্গেও যুক্ত হতে পারবে।
গ্রামীণ অবকাঠামোর উন্নয়ন করতে হলে পরিকল্পিত ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নিতে হবে। এক্ষেত্রে সরকার, স্থানীয় প্রশাসন ও জনগণের যৌথ অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। গ্রামীণ কাঁচা রাস্তা পাকা করা, প্রয়োজন মোতাবেক সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ করে সহজ ও কম খরচে গণপরিবহন ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। গ্রামে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং পরিকল্পিতভাবে সৌরশক্তি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে। বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা এবং আধুনিক পয়ঃনিষ্কাশন ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। সেচ ব্যবস্থা উন্নত করাসহ কৃষিপণ্য সংরক্ষণের জন্য গুদাম ও হিমাগার তৈরি করে কৃষকদের জন্য আধুনিক বাজার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। বন্যা ও ঘূর্ণিঝড় প্রতিরোধী স্থাপনা নির্মাণ এবং আশ্রয়কেন্দ্র ও জরুরি সেবা বাড়াতে হবে। দ্রুতগতির ইন্টারনেট সুবিধা সম্প্রসারণসহ অনলাইন শিক্ষা ও ই-সেবার সুযোগ বৃদ্ধি করতে হবে। গ্রামীণ হাসপাতাল ও কমিউনিটি ক্লিনিকের মানোন্নয়ন এবং পর্যাপ্ত ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীর ব্যবস্থা করতে হবে। ইউনিয়ন পরিষদ ও স্থানীয় প্রশাসনকে শক্তিশালী করতে হবে। গ্রামীণ উন্নয়নে বেসরকারি খাতকে উৎসাহ দেওয়াসহ জনগণের অংশগ্রহণে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। জনগণকে রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়ন কাজে সম্পৃক্ত করা গেলে গ্রামে জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে, কর্মসংস্থান বাড়বে এবং শহরমুখী মানুষের চাপ কমবে।
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি শক্তিশালী করতে হবে। দরিদ্র কৃষক, শ্রমিক ও নিম্নআয়ের পরিবারকে সহায়তা প্রদান করলে তারা অর্থনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। ফ্যামিলি কার্ডসহ অন্যান্য জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে গ্রামীণ জনগণের জীবনমান উন্নয়নে সহায়ক হবে। গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়ন ছাড়া দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। কৃষি আধুনিকায়ন, শিল্পায়ন, দক্ষতা উন্নয়ন এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে গ্রামকে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করা সম্ভব। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লিখিত পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হলে গ্রামীণ জনগণের জীবনমান উন্নত হবে এবং বাংলাদেশ একটি আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতির পথে এগিয়ে যাবে। যার সুফল দেশের জনগণ পাবে এবং বাংলাদেশ আরও শক্তিশালী ও আত্মনির্ভরশীল রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে উঠবে।
#
-লেখকঃ জনসংযোগ কর্মকর্তা, খাদ্য মন্ত্রণালয়
পিআইডি ফিচার
লুতুব আলি:ভাষা যখন মায়ের মতো বুক দিয়ে আগলে রাখে, তখন তার নাম বাংলা। বিশ্বের নানা প্রান্তে এই ভাষাকেই বারবার ‘সবচেয়ে মিষ্টি ভাষা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। জনশ্রুতি আছে, ইউনেস্কোর এক পর্যবেক্ষণে উচ্চারণের ...
বিল্লাল বিন কাশেম:বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা এখন প্রায় প্রতিদিনই হচ্ছে। সংবাদপত্রের পাতা, টেলিভিশনের টকশো, আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদন কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম- সবখানেই অর্থনীতি একটি আলোচিত ...
লুতুব আলি:২০০ বছর ধরে চিড়িয়াখানার সংজ্ঞা ছিল একটাই - খাঁচা। বন্যপ্রাণীকে ধরে এনে মানুষকে দেখানো। লন্ডন চিড়িয়াখানা এবার সেই সংজ্ঞা ভেঙে দিল। অপারেশন থিয়েটারের সার্জনের ছুরি থেকে এবার সোজা দর্শকের ...
নাসরীন জাহান লিপি:রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ছুটি’ গল্পে দেখিয়েছিলেন, কিশোর বয়সের মতো পৃথিবীতে এমন বালাই আর নাই। এই বয়সটাকে বয়ঃসন্ধিকাল, কৈশোরÑ যত রকমের গালভরা নাম দেই না কেনো, ভুক্তভোগীমাত্র জানেন, এ আসলে ...
সব মন্তব্য
No Comments