ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন শুল্ক ব্যবস্থার সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক-অর্থনীতি ও ভূরাজনীতি জড়িত: ড. দেবপ্রিয়

প্রকাশ : 20 Jul 2025
ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন শুল্ক ব্যবস্থার সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক-অর্থনীতি ও ভূরাজনীতি জড়িত: ড. দেবপ্রিয়

স্টাফ রিপোর্টার: আজ রোববার, ২০ জুলাই ২০২৫ ইং তারিখে রাজধানীর একটি হোটেলে দৈনিক প্রথম আলো আয়োজিত ‘ইউএস রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ: কোন পথে বাংলাদেশ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও গবেষকেরা উক্ত বৈঠকে অংশগ্রহণ করেন।


উক্ত বৈঠকে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) এর সম্মাননীয় ফেলো অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বাংলাদেশ আগামী দিনে কোথায় যাবে—তা নির্ধারণে এই নতুন শুল্ক ব্যবস্থা আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। বিশেষ করে পণ্য বহুমুখীকরণ, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা তৈরির ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।


যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার বিষয় প্রকাশ না-করা প্রসঙ্গে ড. দেবপ্রিয় বলেন, বিষয়টি ইতিহাসে এই প্রথম দেখলাম—একটি বিষয়কে নন-পেপার না করে সরাসরি নন-ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট (এনডিএ) করা হয়েছে। যার ফলে এটি এখন একটি বাধ্যবাধকতায় পরিণত হয়েছে। এখন যদি বাংলাদেশ তার নিজের স্বার্থ রক্ষায় কোনো লবিস্ট নিয়োগ করে, তার কাছেও এই তথ্য প্রকাশ করা যাবে না।


তিনি আরও বলেন, কোনো দুর্বল এবং অসমন্বিত সরকারের যদি রাজনৈতিক বৈধতা না থাকে, তাহলে তাদের সফলভাবে দর কষাকষি করার নজির বিরল।


যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দর-কষাকষিতে শুল্কের বাইরেও বিভিন্ন অশুল্ক বিষয় রয়েছে উল্লেখ করে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, এখানে শুধু অর্থনীতি না, এর সঙ্গে রাজনৈতিক-অর্থনীতি ও ভূরাজনীতি জড়িত রয়েছে। ফলে এটিকে যাঁরা কেবলমাত্র একটা শুল্ক সমস্যা হিসেবে দেখেন, তাঁরা ঠিক দেখছেন না।


তিনি আরো বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য নিয়ে দর-কষাকষিতে সেবা খাতের বিষয়টি একদমই সামনে আনা হয়নি। অথচ এই সেবা খাতের সঙ্গে আমাদের তৈরি পোশাক, ওষুধ ও অন্য রপ্তানি খাতও জড়িত।’


যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ককে মোকাবিলা করতে হলে বড় ধরনের কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন বলে জানান দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, এটা শুধু শুল্ক দিয়ে সমাধান করা যাবে না। বাংলাদেশ আগামী দিনে কোথায় থাকবে, এই ভবিষ্যৎ চিন্তাটা আরেকটু বিস্তৃত পরিসরে করা প্রয়োজন।


সিপিডি’র সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, পাল্টা শুল্ক নিয়ে সরকার ভেবেছিল, আলাপ-আলোচনা করে সমাধান করে ফেলবে। এ নিয়ে সরকারের এক ধরনের কৃতিত্ব নেওয়ার মানসিকতা ছিল। দর-কষাকষির সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিরা ভেবেছিলেন, পাল্টা শুল্ককে ১০ শতাংশ বা শূন্য শতাংশে নামিয়ে আনতে পারবেন। সরকারি পর্যায়ে এমন আত্মবিশ্বাস ও অতি আত্মবিশ্বাসের খেসারত আমাদেরকে দিতে হতে পারে।


তিনি বলেন, আমাদের প্রতিযোগী দেশগুলো শুল্ক আলোচনায় কোন অবস্থায় থাকছে, সেটি আমাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে। পাশাপাশি অশুল্ক বাধা ও ভূরাজনৈতিক কৌশলের নানা ইস্যু আছে। সেখানে আমাদের সার্বভৌমত্ব, অন্য দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক—এসব আমরা কতটুকু করতে পারব, কতটুকু পারব না, তা–ও বিবেচনায় আনতে হবে।


গোলটেবিল বৈঠকে এফবিসিসিআই’র সাবেক সভাপতি ও হা-মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক একে আজাদ বলেন, আমার ৪০ বছরের ব্যবসা জীবনে এমন সংকট আর আসেনি। আমরা সরকারের সঙ্গে কথা বলি—লবিস্ট নিয়োগ করার জন্য, প্রধান উপদেষ্টার অফিসে মেসেজ পাঠাই। তখন আমাদের এক পর্যায়ে বলা হলো যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির শুল্ক বাধার ক্ষেত্রে শতকরা প্রায় ৯৫ ভাগ সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে। অথচ আমাকে একটা ব্র্যান্ডের পক্ষ থেকে মেইল পাঠিয়ে বলা হয়েছে, আগামী ১ আগস্ট থেকে যে প্রোডাক্ট তৈরি করা হবে, সেখানে নতুন ট্যারিফ থাকলে আমি (সরবরাহকারী) কত শতাংশ শেয়ার করব, সেটি তাকে জানানোর জন্য। ওই ক্রেতার কাছে আমার রপ্তানি ৮০ মিলিয়ন ডলার। সেখানে আমি ইনকাম করি ১.৩৭ মিলিয়ন ডলার। এখন আমি যদি ৮০ মিলিয়ন ডলার থেকে ৩৫ শতাংশ শেয়ার করি, তাহলে আমার কী থাকবে?


বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, পাল্টা শুল্ক বিষয়ে অন্য দেশের তুলনায় আমাদের দরকষাকষি আমাদের হতাশ করেছে। এনডিএ থাকা সত্ত্বেও মালয়েশিয়া জটিল ইস্যুগুলো নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীজনের সঙ্গে বৈঠক করছে। অন্য শক্তিশালী দেশ, যেমন ভারত, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া ও ব্রাজিল নিজেদের স্বার্থে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশেরও উচিত বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে এগোনো।


বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই) এর সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, সরকার কী করছে বা হালনাগাদে কী অগ্রগতি আছে, তা ব্যবসায়ীরা জানতে পারেনি। ওই সময় (এপ্রিল মাসে) সরকার থেকে বলা হলো তারা (সরকার) চেষ্টা করছে। কিন্তু সরকার কী করছে বা হালনাগাদে কী অগ্রগতি আছে, সেগুলো আমরা জানতে পারিনি। আমরা মনে করেছি, এ ধরনের পরিস্থিতিতে শুল্ক আলোচনায় দেশের বিভিন্ন খাতের অংশীজনদের কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করতে হবে।


সম্পর্কিত খবর

;