বার বার আগুনের ঘটনায় ক্ষিতিগ্রস্থ বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনঃ দায় কার

প্রকাশ : 12 May 2024
বার বার আগুনের ঘটনায় ক্ষিতিগ্রস্থ বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনঃ দায় কার

মোঃ নূর আলম শেখ: শুরুতেই স্থানীয় জনগন, বনবিভাগ, উপজেলা প্রশাসন, কোস্টগার্ড, নৌবাহিনী, বিমান বাহিনী, আনসার, সিপিজি, ভিটিআরটিসহ স্থানীয় সংগঠনের প্রতিনিধিরা যারা আগুন নেভাতে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন তাদের ধন্যবাদ জানাতে চাই। ধন্যবাদ জানাতে চাই গণমাধ্যমের বন্ধুদের যারা অবর্ণণীয় কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করে অগ্নিকান্ডের সংবাদ নীতিনির্ধারক ও দেশবাসীর কাছে পৌছে দিয়েছেন। গণমাধ্যমে প্রচারিত খবর আগুন প্রশমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করি। এশিয়ার ফুঁসফুঁস বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন অক্সিজেন ও কার্বনের এক সুবিশাল ভান্ডার। বায়ু মন্ডলে এ বন প্রতিনিয়ত বিপুল পরিমানে অক্সিজেন প্রদান করে চলেছে। প্রাণীর জীবন ধারক অক্সিজেন ও কার্বনডাই অক্সাইডের আদান-প্রদানের মাধ্যমে সুন্দরবন স্থানীয় জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখছে। অথচ আমাদের নীতিনির্ধারকদের কাছে সুন্দরবন আজও গুরুত্বহীন। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে বার বার কেন সুন্দরবনে আগুনের ঘটনা ঘটে? সুন্দরবনে আগুনের ঘটনা কি প্রাকৃতিক, না কি মানবসৃষ্ট? অগ্নিকান্ডে সুন্দরবনের কেমন ÿতি হতে পারে? সুন্দরবনের অগ্নিকান্ডের ঘটনায় কি বনবিভাগ দায় এড়াতে পারে? সর্বোপরি সুন্দরবনের গর্বিত অভিভাবক হিসেবে অগ্নিকান্ডের কবল থেকে সুন্দরবন রক্ষায় আমদের করণীয় কি? দেশবাসীর কাছে সেবিষয়ে আমাদের মতামত ও সুপারিশ তুলে ধরতে চাই।
আমরা মনে করি সুন্দরবনের অগ্নিকান্ডের ঘটনা মানবসৃষ্ট এবং পরিকল্পিত। বার বার সুন্দরবনে অগ্নিকান্ডের ফলে সামগ্রিক ভাবে পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে। বড়গাছসহ লতাগুল্ম মারা যাচ্ছে। প্রাণীকূলের আবাসসস্থল ও প্রজননসস্থল ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। এতে বনের শৃংখলা ক্ষতিগ্রস্থ হয়। প্রভাব পড়ে প্রাণীকূলের খাদ্যচক্রে। আঘাত আসে বাস্তুতন্ত্রে। অগ্নিকান্ডে বন্যপ্রাণীরা আতংকগ্রস্থ হয়ে পড়ে। অগ্নিকান্ডের এই ঘটনায় বনবিভাগ কোন ভাবেই দায় এড়াতে পারেনা। সুন্দরবন সংরক্ষিত বনাঞ্চল হলেও আমুরবুনিয়া টহল ফাঁড়ি অঞ্চলে চোরা শিকারীসহ মানুষের অবাধ যাতায়াত রয়েছে। গণমাধ্যমে এসেছে গত ২৪ বছরে সুন্দরবনে ২৫/২৬ বার আগুন লেগেছে; সরকারি হিসেবে প্রায় শতাধিক একর বনভূমি ধ্বংস হয়েছে। মুনাফালোভী মাছ ব্যবসায়ী ও অসৎ বনকর্মর্তাদের যোগসাজশে বারে বারে সুন্দরবনে আগুন লাগানো হচ্ছে। সুতরাং এর দায়ভার বনবিভাগকেই নিতে হবে। স্থানীয় জনগোষ্ঠি-পরিবেশকর্মী-সংবাদকর্মী- গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের মতামত উপেক্ষা, সুন্দরবনে অপরিকল্পিত খাল খনন এবং অতীতে গঠিত তদন্ত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন না করার কারনেই সুন্দরবনের আমুরবুনিয়া এলাকায় চার বছর পরে আবারো অগ্নিকান্ড সংগঠিত হলো।
আগুন জ¦ললেও বনবিভাগের উদাসীনতায় প্রথম দিকে আগুন নেভাতে বিলম্বে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে মনে করি। আগুনে প্রায় ৫ একর বনভূমি পুড়ে গেছে। বাংলাদেশের ফুঁসফুঁস সুন্দরবন রক্ষায় বনবিভাগ, স্থানীয় জনগণ, সরকারসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে গুরুত্ব দিতে হবে। সুন্দরবনের মধ্যে মুনাফালোভী ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ করতে হবে। আমরা মনে করি আমুরবুনিয়ার আগুন লাগার ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির মাধ্যমে অগ্নিকান্ডের মূল রহস্য উদঘাটন করা সম্ভব হবেনা। বিগত সময়ের অগ্নিকান্ডের ঘটনায় কারন অনুসন্ধান করতে যেয়ে স্থানীয় জনগোষ্ঠিদের সাথে আলাপকালে বনবিভাগের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাই এশিয়ার ফুঁসফুঁস সুন্দরবনের মানবসৃষ্ট অগ্নিকান্ডের রহস্য উন্মোচন এবং এই ধরনের জঘন্য কর্মকান্ডে বন্ধে বনবিভাগ ও অনান্য আইন-শৃংখলা বাহিনীর সদস্য, পরিবেশকর্মী, সুন্দরবন গবেষক ও বিশেষজ্ঞ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিকসহ নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে।
নীতিনির্ধারকদের কাছে সুন্দরবন আজও গুরুত্বহীন থাকলেও একজন বনজীবির কাছে সুন্দরবনের আর্থিক গুরুত্ব ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন পড়ে না। সুন্দরবন সংলগ্ন প্রায় ৩৫ লক্ষ মানুষের জীবন-জীবিকা প্রত্যÿ বা পরোÿভাবে এ বনের উপর নির্ভরশীল। সুন্দরবন গুরুত্বপূর্ণ বাস্তুতান্ত্রিক সেবা প্রদান করে। একটি গবেষণা প্রতিবেদনে সুন্দরবনের ২৪টি প্রতিবেশসেবার কথা উঠে এসেছে। প্রতি হেক্টর সুন্দরবনের প্রতিবেশসেবার আর্থিকমূল্য ৪৫৬ থেকে ১ হাজার ১৯২ মার্কিন ডলার। এ হিসেবে বছরে আমাদের সুন্দরবন ২৭ কোটি থেকে ৭১ কোটি মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ প্রতিবেশসেবা প্রদান করে চলেছে। দুঃখজনক হলেও বিগত সময়ে আগুন লাগার ঘটনায় কেবলমাত্র বনবিভাগের সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত তদন্ত কমিটি ১৫বার জেলে-বনজীবি-মৌয়াল, ৪বার দাবদাহ, ৪বার মাছ আহরণ এবং ৪বার আক্রোশমূলক ঘটনাকে দায়ী করেছেন। যদিও এই তদন্ত রিপোর্টরে গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে; তারপরে বলতে চাই আগুন লাগার জন্য যাদের দায়ী করা হলো তাদের কেন আইনের আওতায় আনা হলো না। অপরাধীদের কেন গ্রেফতার করা হলো না। অদক্ষ মৌয়ালদের কারনে যদি আগুন লেগে থাকে তাহলে মৌয়ালদের দক্ষ করার দায়িত্ব কার। আমাদের প্রশ্ন মৌয়ালদের কারনে কেন সুন্দরবনের অন্য অঞ্চলে আগুন লাগে না। কেন মোড়েলগঞ্জ-শরণখোলার আমুরবুনিয়া, ধানসাগর, নাংলী, রাজাপুর এলাকার একই জায়গায় বারে বারে আগুন লাগছে?
আমরা বলতে চাই সুন্দরবন রক্ষায় আমাদের সকলকে সচেতন হতে হবে। নীতিনির্ধারকদের সুন্দরবন রক্ষায় গুরুত্ব দিতে হবে। সুন্দরবনের অগ্নিকান্ডে বন্ধে সুপারিশসমুহঃ
১। অগ্নিকান্ডের কারন জানতে ও অগ্নিকান্ড বন্ধে বনবিভাগ, কোস্ট গার্ড, নৌবাহিনী, নৌপুলিশ, ট্যুরিস্ট পুলিশ, সুন্দরবন বিশেষজ্ঞ ও গবেষক, সংবাদকর্মী, জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় সংগঠনের নেতৃবৃন্দ’র সমন্বয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে।
২। অগ্নিকান্ডে বিগত দিনের গঠিত তদন্ত কমিটির সুপারিশ বাস্তয়ন করতে হবে।
৩। সুন্দরবনের লোকালয় সংলগ্ন এলাকায় ওয়াচটাওয়ার নির্মান করতে হবে।
৪। বনের মধ্যে অবাধ যাতায়াত বন্ধ করতে হবে।
৫। সুন্দরবন রক্ষায় স্থানীয় জনগোষ্ঠিকে সচেতন করতে হবে।
৬। ইআইএ ছাড়া সুন্দরবনের মধ্যে অপরিকল্পিত খাল খনন বন্ধ করতে হবে।
৭। বন বিভাগ কর্তৃক মৌয়ালদের প্রশিক্ষনের মাধ্যমে দক্ষ করতে হবে।
৮। সুন্দরবন রক্ষায় অপরাধ দমনে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে।
৯। অপরাধীদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
১১। সুন্দরবন রক্ষায় নীতি নির্ধারকদের গুরুত্ব দিরত হবে।
১২। ড্রোন ক্যামেরা, সিসি ক্যামেরাসহ সুন্দরবন রক্ষায় বিজ্ঞান , তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে।

-লেখক: কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক-বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) মোংলা, বাগেরহাট ০১৭১১০৫৮২২৬।

সম্পর্কিত খবর

;