ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীন:
একজন মানুষ ঘুমের ঘোরে থেকেও রাতভর হাতপাখা চালাতে পারেন! পারেন ঠিক নয়; পারতেন। হাতপাখা চালাতেন নিজের জন্যে নয়, অন্যের জন্যে। অন্যকে বাতাস দিয়ে দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখতেন। বিষয়টি এখনো আমার কাছে রাজ্যের বিস্ময়। তবে, আমার কাছে বিস্ময়কর হলেও আমার আব্বার কাছে মোটেও তেমনটা ছিল না। তিনি খুব সহজেই পারতেন। হাতপাখা নাড়িয়ে নাড়িয়ে রাতভর আমাকে ঘুম পাড়িয়ে রাখতে পারতেন। তাঁর হাতপাখা নাড়ানো যেন হাতপাখা নয়, ব্যাটারি বা বিদ্যুৎ চালিত পাখা। একবার শুরু করলে চলতেই থাকে।
২১শে সেপ্টেম্বর আমার সেই আব্বার জন্যেই “আমার বাবা দিবস”!! একান্তই আমার দিবস। আমি জানি, আন্তর্জাতিকভাবে ভিন্ন একদিনে প্রতীকী বাবা দিবস পালনের একটি রেওয়াজ শুরু হয়েছে। বলতে পারেন বিষয়টি শুধুই জানি; কিন্তু মন থেকে মানি না। মানতে মন সায় দেয় না। বড় জটিল জিনিস এই মন। সহজে সব কিছুতে সায় দেয় না। আজকাল তো মোটামুটি অনেকেই প্রতীকী বাবা দিবসে বাবাকে নিয়ে লেখে। আমি না হয় একটু আলাদাই থাকলাম। আমার বাবা দিবস আমার একান্তই নিজের হয়ে থাকলো।
এই দিবসে আমি নিয়মিত বাবাকে নিয়ে লেখি। গেল ১৫ বছর ধরেই লিখি। যদিও লেখালেখির অভ্যাস এর আগে কোনকালেই ছিলো না। কোনদিন লিখবো সেটাও অভাবনীয় ছিল। তাই প্রতিদিন না লিখলেও বছরের এই দিনটাতে লিখি। একটা দিনই তো! বাবা নিজে বাবা হবার পর থেকে তাঁর জীবনের প্রতিটি দিনই তো আমাদের দিয়েছেন। সন্তান হয়ে আমি কেন পারবো না, অন্তত এই একটা দিন তাঁকে দিতে! তাঁকে নিয়ে লিখতে!
তাঁকে নিয়ে লেখা খুব যে কঠিন, তা নয়। এক বা দুটো ছোট স্মৃতি বা ঘটনা নিয়ে লিখলেই বড় একটি লেখা দাঁড়িয়ে যায়। হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়ার মত লেখা হয়। লিখে তৃপ্তিও পাই অনেক। তবে যত না তৃপ্তি পাই, তার চেয়ে বেশি পাই কষ্ট। চোখের পানি সামলানোর কষ্ট। একহাতে চোখের পানি মুছে অন্য হাতে লিখতে হয়। বাবাকে হারিয়ে বাবাকে নিয়ে লেখার কিংবা ভাবার কষ্ট সীমাহীন।
২৯টি বছর সীমাহীন এই কষ্ট বয়ে বেড়াচ্ছি। খুব মনে পড়ে বাবাকে। প্রতিটি ক্ষণ মনে পড়ে এমন নয়। প্রতিটি ক্ষণে মনে করা সম্ভবও না। কিন্তু প্রতিটি ক্ষণে না হোক, মনে পড়ে প্রতিদিন। প্রতিদিন কতবার যে তাঁকে মনে পড়ে তার ইয়ত্তা নেই। সকাল-বিকেল, সন্ধ্যে-রাত্রি; কখন মনে পড়ে না! সারাদিনই মনে পড়ে। সারা বছর মনে পড়ে। কষ্টে মনে পড়ে, আবার আনন্দেও মনে পড়ে। শীত আসলে যেমনি মনে পড়ে আবার গরম পড়লেও মনে পড়ে।
সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময়ের কথা। কৈশোরে তখনও পা রাখিনি। পরিবারের সবাই মিলে বিদ্যুৎহীন গ্রামে থাকি আমরা। শুধু আমরা কেন! বাংলাদেশের কোন গ্রামেই তখন বিদ্যুৎ থাকার কথা না। বিদ্যুৎ ছিল শহরে। কেবল শহরে গেলেই বিদ্যুতের দেখা পেতাম। গোল গোল বাল্বের ভিতরে সূতো পরিমান দুটো তার জ্বলতো। হা হয়ে তাকিয়ে বিদ্যুতের জ্বলন্তসেই বাল্বের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। চোখ ফিরাতে পারতাম না। শহর ছেড়ে গ্রামেও ফিরতে মন চাইতো না। কিন্তু এক সময় ফিরতেই হতো। তবে, ফিরতাম মন বিষণ্ন করে।
বিষণ্ন তো হবেই। রাতের গ্রাম তো অন্ধকারের গ্রাম। কেরোসিনের কুপির বাতি কিংবা হারিকেনের আলোয় আমাদের রাতের গ্রামের জীবন। একমাত্র চাঁদের আলো ছাড়া রাতের গ্রামকে দেখার কোন সুযোগ ছিলো না। মোটামুটি রাত নয়টার পরে গ্রামের সব বাড়ির বাতি নিভে যেত। পড়াশুনা যা করার এর আগেই শেষ করে তড়িঘড়ি রাতের খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন। তারপরই ঘুম। বড় আরামের সে সুখের ঘুম।
কিন্তু সব সময় সুখের ঘুম দেয়া যেত না। সমস্যা করতো গরম। সাধারণ গরমেই ঘুমাতে কষ্ট হতো। বৃষ্টি কিংবা বাতাসের পরশে যেমনি শান্তির ঘুম আসতো, ঠিক তেমনি গরমে উঠতো নাভিশ্বাস। শহরে তো সিলিং ফ্যান আছে। একবার সুইচ টিপে দিলেই, ব্যাস! যতক্ষণ বিদ্যুৎ চলে না যায়, পাখা ঘুরতেই থাকতো। বিদ্যুৎহীন গ্রামে সে সুযোগ নেই। ফ্যান নেই। ফ্যান থাকার প্রশ্নই আসে না। ছিল হাতপাখা। হাতপাখার বাতাসে যতক্ষণ যৎসামান্য স্বস্তিতে থাকা যায়। তবে তাপদাহ বাড়লে সেটাও অকার্য্যকর।
সত্তর দশকে সেই সময়ে একবার প্রচণ্ড তাপদাহ শুরু হলো। অবিশ্বাস্য রকমের দাহ্য গরম। প্রকৃতি বড়ই পরিপূর্ণ রকমের সুন্দর। চারিদিকে গাছগাছালিতে ভরা। কিন্তু একটি পাতাও নড়ে না। দিনেও নড়ে না, রাতেও না। যেন পাতাদের ধর্মঘট চলছে। সব পাতা এক হয়েছে আর বাতাস দেবে না বলে। বলা যায় দুনিয়া থেকে বাতাস উধাও হয়ে স্বর্গে চলে গেছে সে বছর। আর নরক থেকে আগুনের গোলা এসে পড়ছে ভূমন্ডলে।
লোকজন বলাবলি করছে, খরা পড়েছে। কয়েক যুগ আগের খরা আবার ফিরে এসেছে ধরায়। আমি ছোট মানুষ। খরা কাকে বলে বুঝি না। কেবল বুঝি ভীষণ গরম পড়েছে। ভাদ্র মাসের কাঠফাটা গরম। গরমে ঘরে বাইরে কোথায়ও টেকা দায়। যেমনি গরম ঘরের ভিতরে, ঠিক তেমনি বাইরে। বাতাস নেই বললেই চলে। আর রৌদ্রের তেজও প্রচণ্ড। মনে হয় সূর্য তার নির্দিষ্ট স্থান থেকে অনেকটাই পৃথিবীর কাছে নেমে এসেছে।
মানুষ বৃষ্টির দেখা পাচ্ছে না কয়েক মাস হলো। সে বছর বৃষ্টি একেবারেই হয়নি। কৃষকের ফসলের মাঠ ফেটে চৌচির হয়ে একাকার। শুকিয়ে গেছে রোপা আমনের চারা। যে চারায় এখন সোনালী ধানের ছড়া দোলতো বাতাসে, সে চারায় ধানের চিটা বাসা বেঁধেছে। ঘরে ঘরে কৃষানীর মুখে তাই দুঃখের ছাপ। কোন আনন্দ নেই কারো মনে। নেই নবান্নের বার্তাও।
আমার মায়ের মনও খুব খারাপ। বাড়ির সামনে থাকা ফসলি জমির দিকে আনমনে দিনভর তাকিয়ে থাকেন আমার মা। সরকারি চাকুরে বাবা অফিস থেকে ফেরেন বাজারের ব্যাগ হাতে করে। যে ব্যাগ ভর্তি বাজার নিয়ে তিনি আগে ফিরতেন, আজকাল সে ব্যাগ আর ততটা ভরা থাকে না। খালি খালি থাকে। গোয়ালভর্তি ধানের গোলাও এখন খালি। চাল আসে ব্যাগে করে। ব্যাগে চাল থাকে, ডাল থাকে। থাকে তেল, মশলা আর আলু। থাকে না কেবলই মাছ কিংবা মাংস। বাড়ির পুকুরের চার পাড়ে থাকা শাক কুড়িয়ে কিংবা পুকুরে জাল ফেলে টেংড়াপুটি ধরিয়ে মা রান্না করতো। দুপুরের রান্নায় রাতও পার হতো আমাদের।
কিন্তু ঘুম হতো না। প্রচণ্ড গরমে বদ্ধ ঘরে ঘুমানো দায়। গা ভিজে ওঠে ঘামে। অগত্যা বিছানা হতো বাইরে। আব্বা আমাদের নিয়ে বাইরে যেতেন। বাসার সামনের পুকুর ঘাটে পানির ধারে বিছানা পেতে ঘুমের ব্যবস্থা করতেন। খালি গায়ে সবাই পাশাপাশি শুয়ে ঘুমাতাম। ঘরের ভিতর থেকে কিছুটা স্বস্তির হলেও গরম থাকতোই। আমার বালিশের কাছে আব্বা বালিশ পেতে নিজে শোবার ব্যবস্থা করতেন। বালিশে আধো কাত হয়ে হাতপাখার বাতাসে আমাকে স্বস্তি দিতে চেষ্টা করতেন। দিতেন মাথায় হাত বুলিয়ে।
প্রচণ্ড গরমে বাবার দেয়া এই শীতলতায় চোখ ভরে ঘুম আসতো। আমি ঘুমিয়ে যেতাম। কিন্তু আব্বা ঘুমুতেন না। কেবল আমাকে নয়; আমার পিঠাপিঠি বড় ভাইকে এবং মাকেও বাতাস দিয়ে ঘুম পাড়াতেন। মনে হতো প্রতিরাতে পরিবারের সবাইকে ঘুম পাড়ানোই যেন তাঁর কাজ। সবাইকে ঘুম পাড়িয়ে হয়তো এক সময় তিনিও ঘুমের কাছে হেরে যেতেন। বালিশে মাথা এলিয়ে হালকা ঘুমে নেতিয়ে পরতেন। কিন্তু তাঁর হাত থামতো না। চলতেই থাকতো। সারারাত চলতো!
এমনি করেই জগৎ সংসারে সবার সব কিছু দেখভাল করে বাবারা শুধু সারারাত নয়, সারা জীবন চলেন। নিজেদের সকল কষ্টকে লুকিয়ে সংসারের সবার সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করেন। কেবল করেন না নিজের সমস্যার সমাধান। কেমন করে যেন বাবারা এসব পারেন। আসলে বাবাদের পারতে হয়! আর পারেন বলেই সন্তানের কাছে বাবারা হন অসাধারণ। দুঃখজনক হলো, জগৎ সংসারে অসাধারণ সন্তানের সংখ্যা নেহায়েত কম হলেও অসাধারণ বাবার সংখ্যা অগণিত! যেমন আমার বাবা!! আমার বাবা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ অসাধারণ বাবা!!!
২১শে সেপ্টেম্বর, ২০২৪
-লেখক: সম্পাদক, সিমেক।
মো. মামুন হাসান:
ইলিশ আমাদের জাতীয় মাছ এবং দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। এটি শুধু আমাদের নদী ও সাগরের সম্পদই নয়, বরং দেশের কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়ি ...
ইমদাদ ইসলাম:
বিষাক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিচ্ছে দেশের মানুষ। প্রায় প্রতিটি গণমাধ্যমেই প্রতিদিনই দেশের বায়ু মান গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করা হয়।গত ৪ মার্চ বুধবার সকাল ১০টার দিকে রাজধানী ঢা ...
মানিক লাল ঘোষ: ইতিহাসের পাতায় কোনো কোনো দিন আসে যা কেবল একটি তারিখ নয়, বরং একটি জাতির ভাগ্যবদল ও আত্মপরিচয়ের চূড়ান্ত দলিল হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ ছিল তেমনই এক মাহেন্দ্রক্ষণ। সেদি ...
আতিকুল ইসলাম টিটু:
বাংলাদেশকে নয়া উপনিবেশিক আধাসামন্তবাদী রাষ্ট্র হিসেবে বোঝার জন্য কেবল রাষ্ট্র গঠনের পরবর্তী সময় নয়, বরং বিশ্ব ইতিহাসের বৃহত্তর শ্রেণি সংগ্রাম এবং সাম্রাজ্যবাদ ...
সব মন্তব্য
No Comments