সরদার মোঃ শাহীন:
অনেক আগের কথা। আমার শোনিম তখন বেশ ছোট। ঘন ঘন ঢাকায় আসতাম। আর বরাবরই টোকিও থেকে ঢাকায় ফেরার সময় আমার লাগেজটা একটু ভারী হতো। শোনিমের ফর্দের জন্য হতো। ছোট মানুষের ছোট ফর্দ! জিনিসও খুব সাধারণ। কিন্তু আমার শোনিমের কাছে সে সব অসাধারণ দামী। তাই যত ব্যস্তই থাকি ওর জিনিস সময় মত শপিং করে ব্যাগে নিতে ভুল করিনা।
একবার ঢাকায় ফেরার দু’দিন আগে কুরিয়ারে করে লাগেজ এয়ারপোর্টে পাঠিয়ে দিয়েছি। কুরিয়ার কোম্পানীর লোক বাসায় এসে লাগেজ নিয়ে গেছে। আমি ফ্লাইটের দিন এক রকম খালি হাতে এয়ারপোর্টে যাবো এবং কুরিয়ারের কাউন্টার থেকে নিজের লাগেজ বুঝে নিয়ে চেকইন করবো। এক অদ্ভুত সুন্দর ব্যবস্থা। উন্নত বিশ্বের সবখানেই সাধারণত এমনটা হয়।
কুরিয়ারের এয়ারপোর্ট অফিস থেকে একদিন আগেই ফোন। সুরেলাকন্ঠী মেয়েটি মাফটাফ চেয়ে একাকার হয়ে যাচ্ছে। বিষয়টি আর কিছুই নয়; ওদের এয়ারপোর্ট অফিস আমার লাগেজটি সামান্য একটু ফাটা অবস্থায় পেয়েছে। এই নিয়ে ওদের অসাধারণ উদ্বেগ। ধরে নিয়েছে ওদের হাতেই ফেটে গেছে। আর এ জন্যে মাফ চাচ্ছে আমার কাছে। আবার মাফ চাইবার জন্যে এই যে আমাকে ফোন দিয়ে বিরক্ত করা, এর জন্যেও মাফ চাচ্ছে। মাফ চাচ্ছে আমার ব্যস্ত সময় নষ্ট করার জন্যেও।
মাফ চাইবার একটা হিড়িক পড়ে গেছে আর কি। ব্যাপারটি আমি আগেই জানতাম। কারণ লাগেজটি একটু ফাটাই ছিল যেটা ওদের লোক রিসিভ করার সময় টের পায়নি। তাই তেমন বিচলিত না হয়ে আমি বললাম, ঠিক আছে; নো প্রবলেম। এ নিয়ে তোমরা চিন্তা করোনা। এ সব ছোটখাটো ফাটায় আমার সমস্যা হবে না।
কিন্তু ওরা এটা মানতে নারাজ। এবং পুরো দোষ নিজেদের ঘাড়ে নিয়ে এর সুন্দর সমাধান খুঁজছে। দু’তিনটে নতুন স্যুটকেস ইতিমধ্যেই ওরা ম্যানেজও করে রেখেছে। মুশকিল হলো আমার পুরোনোটার মত ঠিক একই ডিজাইনের কোন স্যুটকেস ওরা মার্কেটে পাচ্ছে না। এটাই ওদের মাথা ব্যাথার মূল কারণ। তাই একটু পর পর ফোন দিয়ে আমার মাথা খারাপ করে দেবার পালা করেছে। একবার ছোট অফিসার ফোন দেয়, তো একবার মাঝারো অফিসার।
পরদিন দুপুরে এয়ারপোর্টে পৌঁছে দেখি মাঝারো একজন অফিসার আমার জন্যে দাঁড়িয়ে আছেন। সাথে তিনটে নতুন স্যুটকেস। ওসব রেখে আমি আমারটাই ভাল করে দেখে বললাম, তোমাদের তটস্থ হওয়ার কিছু নেই; এটা তোমাদের হাতে ফাটেনি। আগে থেকেই ফাটা ছিল। ভুলটা আমারই হয়েছে; ছোটখাটো হলেও এমন ফাটা জিনিসটা তোমাদেরকে দেয়া ঠিক হয়নি। আমি খুবই সরি; খুবই লজ্জিত। ওরা বলছে, না, না! হয়তো তোমার হাতে এতটা ফাটা ছিল না। আমাদের হাতে আসার পরেই হয়তো ফাটাটা বেড়েছে।
এভাবে কিছুক্ষণ ফাটা নিয়ে ফাটাফাটির পর হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। এবং ওদের কেনা নতুন স্যুটকেসটি নিতে বাধ্য হলাম। এখানেই শেষ নয়। স্যুটকেসের সাথে জোর করে ধরিয়ে দিল একটি চকোলেটের প্যাকেট। আপাত উপহার মনে হলেও আসলে জরিমানা। সরাসরি জরিমানা না বলে উপহার হিসেবে দিল। গ্রাহককে সন্তুষ্ট করার কী অসীম কৌশল!
এবার দেখা যাক বাংলাদেশী কৌশল। সাপ্তাহিক সিমেকের অনেকগুলো কপি আমরা নামকরা দু’টো কুরিয়ার থেকে দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠাই। কুরিয়ারে দেবার পরে প্রাপকের হাতে পৌঁছা পর্যন্ত আমাদেরকে আঁঠার মত লেগে থাকতে হয়। কিন্তু প্রায় সময়ই বুঝতে পারি কোথায়ও না কোথাও পত্রিকা মিস হচ্ছে। কিন্তু এ নিয়ে কুরিয়ারকে অভিযোগ করতে পারিনা। করলাম তো মহা অপরাধ করে ফেললাম।
ঠিক মত কেউ জবাব দেবে না। বাংলাদেশের ব্যাপার; অপেক্ষা করেন, ভাল করে খবর নেন, আমরা তো পৌঁছে দিয়েছি; না পাবার কারণ কী, আমরা কি আপনাদের মাল খেয়ে ফেলেছি নাকি? ইত্যাদি আজগুবি কথাবার্তা শুরু করে দেবে। দুঃখ লাগে পত্রিকা দেই, পাঠানোর খরচও দেই; কিন্তু ঝারিটা দিতে পারি না। উল্টো ছোটখাটো ঝারি খেয়ে ফিরি। আবার মাঝে মাঝে পত্রিকা পৌঁছায় বটে, তবে অনেক দেরিতে। দু’দিনের পত্রিকা পৌঁছায় আটদিনে। এ নিয়ে তো কথা বলাই যাবে না। এদের কাছে সময়ের কোন মূল্য নেই।
মূল্য আছে জাপানীজদের কাছে। ৯টার ট্রেন ঠিক নয়টায় আসে। এক সেকেন্ড আগেও নয়, পরেও নয়। আপনি হাজার কিমি জার্নি করলেও এক সেকেন্ড লেট হবে না পৌঁছাতে। কাঁটায় কাঁটায় সময় মত পৌঁছে যাবেন গন্তব্যে। অফিসে মিটিং টাইম দশটা; ঠিক দশটার দশ মিনিট আগেই সবাই উপস্থিত থাকবে মিটিং রুমে। একজন লোক পাওয়া যাবে না যে দেরিতে পৌঁছে গাইগুই করে দেরি হবার জন্যে বাহানা করে। যিনি যত বড় কর্তা, তিনি তত আগে আসেন। যিনি যত বড় মন্ত্রী, তিনি তত রাইট টাইমে মিটিং এ পৌঁছান। কোন বাহানা নেই, কোন অজুহাত তোলার সুযোগ নেই। আমাদের দেশে যিনি যত বড়, তিনি তত দেরিতে আসবেন। এক জায়গায় নয়; সব জায়গায়!
ছাত্রাবস্থায় কিছুদিন জাপানের একটি হোটেলে পার্টটাইমার হিসাবে কাজ করেছিলাম। প্রায় দিনই এখানে বিয়ের পার্টি হতো। সেই সুযোগে অনেকগুলো জাপানী বিয়ের অনুষ্ঠান দেখার সুযোগ হয়েছে। বিয়ের জন্যে হোটেলের হল ভাড়া নিত ওরা আড়াই ঘণ্টার জন্যে; বিকেল সাড়ে পাঁচটা থেকে রাত আটটা। সাড়ে পাঁচটা থেকে অতিথি আসা শুরু হয়ে ছয়টার আগেই হল ভরে যেত। একটি সিটও খালি থাকতো না।
ঠিক পাঁচটা ৫৯ মিনিটে হলের সব বাতি একসাথে নিভে যেত। এরপর জ্বলে উঠতো সার্চলাইট। অতিথিগণের তুমুল করতালি আর সার্চলাইটের উজ্জ্বল আলোতে হাস্যজ্জ্বল মুখে হলে প্রবেশ করতো নবদম্পতি। খাওয়া দাওয়া সহ বিয়ের আনুষ্ঠানিকতার যা কিছু আছে সব শেষ করে আবার হলের বাতি নিভে যেত ঠিক সাতটা ৫৯ মিনিটে। এরপর জ¦লে উঠতো আবার সেই সার্চলাইট; আবারো অতিথিদের মুখর করতালি আর সার্চ লাইটের আলোতে হল থেকে হাত ধরাধরি করে বেরিয়ে যেত তারা দু’জনায়। বাকী অতিথিগণ মাত্র পাঁচ মিনিটেই হল খালি করে দিতেন।
এমনি কাঁটায় কাঁটায় শুরু করে বিয়ের অনুষ্ঠান রাইট টাইমে শেষ করাটা কেবল জাপানীদের দ্বারাই হয়তো সম্ভব। বাংলাদেশে তো এটা চিন্তাও করা যায় না। এদেশে বিয়ে চলে চার দিনব্যাপী। প্রতিদিন প্রায় একই ধরনের আয়োজন, একই ধরনের খাবার। এক খাবার কয়দিন আর ভাল লাগে! তবুও খেতে হয়। অথচ একটু ভাবলেই একেক দিন একেক স্বাদের খাবার দেয়া যায়।
কিন্তু কেউ ভাবে না। উলটো, ভাবায়। ইদানীং বিয়ে আর বৌভাতের দিনে ঘটে আরো মহাকান্ড। অতিথিরা যায়, অতিথিরা আসে; কেবল আসে না পাত্রপাত্রী দু’জনা। তারা ব্যস্ত সময় পার করে পার্লারে। অতিথিরা বসে থেকে থেকে এক সময় চলে যাবার সময় হয়; তবুও তাদের আসার সময় হয় না! এক সময় তারা আসে। কিন্তু ততক্ষণে হলরুমে কাছের কিছু মানুষ ছাড়া আর তেমন কেউ থাকে না।
তারা হন্তদন্ত হয়ে এসেই আবার ব্যস্ত হয়ে পড়ে। অপেক্ষমান ক্যামেরাম্যানের দল তাদেরকে জেঁকে ধরে। পড়ন্ত বেলায় অতিথি শূন্য হল ঘরে দু’জনে ছবি তোলায় ব্যস্ত; কোন দিকে, কারো দিকে কোন খেয়াল নেই। তাদেরকে দোয়া করতে উপহার নিয়ে এই যে এতসব মানুষ কষ্ট করে এলো সেদিকে তাদের কারোরই কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। তারা দু’জনে কেবল ব্যস্ত ভিডিওর সামনে হাসিমুখে পোজ দিতে। ক্যামেরাম্যানের দল ক্লিকের পর ক্লিক করে যাচ্ছে।
মনে হয় বিয়ে বাড়ি নয়; সুপার মডেলদের ডুপার ফটোসেশন স্টুডিও। শুনেছি এসবই নাকি হালের ফ্যাশন। কে জানে এভাবে দিনে দিনে কোন অতলে তলিয়ে যাচ্ছে দূর্ভাগা এই বাঙালি নেশন!
-লেখক: সম্পাদক, সিমেকনিউজ২৪ ডটকম।
মো. মামুন হাসান:
ইলিশ আমাদের জাতীয় মাছ এবং দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। এটি শুধু আমাদের নদী ও সাগরের সম্পদই নয়, বরং দেশের কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়ি ...
ইমদাদ ইসলাম:
বিষাক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিচ্ছে দেশের মানুষ। প্রায় প্রতিটি গণমাধ্যমেই প্রতিদিনই দেশের বায়ু মান গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করা হয়।গত ৪ মার্চ বুধবার সকাল ১০টার দিকে রাজধানী ঢা ...
মানিক লাল ঘোষ: ইতিহাসের পাতায় কোনো কোনো দিন আসে যা কেবল একটি তারিখ নয়, বরং একটি জাতির ভাগ্যবদল ও আত্মপরিচয়ের চূড়ান্ত দলিল হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ ছিল তেমনই এক মাহেন্দ্রক্ষণ। সেদি ...
আতিকুল ইসলাম টিটু:
বাংলাদেশকে নয়া উপনিবেশিক আধাসামন্তবাদী রাষ্ট্র হিসেবে বোঝার জন্য কেবল রাষ্ট্র গঠনের পরবর্তী সময় নয়, বরং বিশ্ব ইতিহাসের বৃহত্তর শ্রেণি সংগ্রাম এবং সাম্রাজ্যবাদ ...
সব মন্তব্য
No Comments