মেসিকে রাগালেই বিপদ!

প্রকাশ : 16 Jul 2026
মেসিকে রাগালেই বিপদ!


।। মুক্তার হোসেন নাহিদ ।।

ফিফান্টিনা কিংবা রেফারির দল-যেভাবেই আর্জেন্টিনা বিরোধী সমালোচকরা ট্রল করুক না কেন, ফুটবল যদি কোনো থ্রিলার উপন্যাস হতো, তবে আজকের সেমিফাইনালটি হতো তার শ্রেষ্ঠ অধ্যায়। ফুটবল ম্যাচ তো অনেকেই দেখে, কিন্তু আজকের সেমিফাইনালটি ছিল হৃদযন্ত্রের ধারণক্ষমতা মাপার এক চরম পরীক্ষা।  যে পরীক্ষায় সারা দুনিয়ার কোটি কোটি ভক্তকে বিজয়ের হাসিতে ফাইনালের আনন্দ উপভোগের সুযোগ দিয়েছে মেসি বাহিনী। একজন আর্জেন্টাইন সমর্থক হিসেবে আমি হলফ করে বলতে পারি মারাকানার সবুজ গালিচায় আজ (১৬ জুলাই) যা মঞ্চস্থ হলো, তা ফুটবল ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। মাঠের লড়াইয়ে মেসিকে রাগালেই যে বিপদ তা হারে হারে টের পেয়েছে ইংল্যান্ড। স্নায়ুব চাবুকে উপযুক্ত জবাব দিয়েছে ম্যারাডোনার যোগ্য উত্তসূরী।

ম্যাচের প্রথমার্ধটা লিওনেল স্ক্যালোনির অদ্ভুত দাবার ছকে শেষ হয় গোলশূন্য সমতায়। কিছুটা আক্রমণাত্মকও ছিল। উভয় দলের আচরণে মনে হচ্ছিল এটা যেন সেমিফাইনাল নয়, ফকল্যান্ড যুদ্ধের পুনরাবৃত্তি। কিন্তু লড়াইয়ের তেজ দেখা যায় দ্বিতীয়ার্ধের ৫৫ মিনিটে। রক্ষণভাগের সামান্য অসতর্কতার সুযোগ নিয়ে ইংল্যান্ডের গর্ডন বুলেট গতির এক শটে বল জালে জড়িয়ে দিলেন। স্তব্ধ হয়ে গেল গ্যালারির নীল-সাদা সমুদ্র, পিনপতন নীরবতা নেমে এলো আর্জেন্টাইন শিবিরে। ১-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ে বিদায়ের ঘণ্টা বাজছে আর্জেন্টাইন শিবিরে। মাঠের করতালি আর ড্রামের গুড়গুড় আওয়াজে হার্টবিট বন্ধ হয়ে যাওয়ার  উপক্রম, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় মেসি ভক্তরা। তবে আমি মোটেও বিচলিত ছিলাম না। বিশ্বাস ছিল শেষ লড়াইয়ে আর্জেন্টিনার বিজয় হবে। হলোও তাই। মাঝমাঠে মেসিকে অকারণে রাগালেন হ্যারি-কেন বাহিনী। মেসি কেবল কঠিন দৃষ্টিতে তাকালেন। তারপরেই জ্বলে উঠলেন মেসি, জ্বলে উঠলো আলবিওসেলেস্তেরা। একের পর এক ইংল্যাণ্ডের রক্ষণভাগে আক্রমণ করতে থাকলেন মেসি বাহিনী। আর্জেন্টিনা-ইংল্যাণ্ড লড়াই রূপ নিল আর্জেন্টিনা পিওফোর্ড লড়াইয়ে। একের পর এক আক্রমণ সেভ করে ইংল্যান্ডে জয়ের ধারা অক্ষত রাখতে লাগলেন গোলকিপার জর্ডান পিওফোর্ড। ৮৫ মিনিটের মাথায় মাঝমাঠে লিওনেল মেসির সেই চিরচেনা পায়ে বলের ছোঁয়া লাগতেই যেন মাঠে বিদ্যুৎ খেলে গেল। প্রতিপক্ষের তিন-চারজন ডিফেন্ডারকে ড্রিবলিংয়ের মায়াজালে নাচিয়ে তিনি যখন আক্রমণ শানালেন, ঠিক তখনই এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। মেসির পাস থেকে বক্সের ভেতর বল পেয়ে এনজো ফার্নান্দেজ নিখুঁত ফিনিশিংয়ে গোল করে আর্জেন্টিনাকে সমতায় ফেরালেন। গ্যালারি তখন উল্লাসের অগ্ন্যুৎপাতে ফেটে পড়েছে, সমর্থকদের চোখে আনন্দের অশ্রু। সবাই ভাবছিল খেলা হয়তো অতিরিক্ত সময়ে গড়াবে। কিন্তু ইনজুরি সময়ের ৯২ মিনিটে কর্নার থেকে উড়ে আসা এক ভাসন্ত বলকে বাতাসে ভাসমান অবস্থায় এক অবিশ্বাস্য ভলিতে ইংল্যান্ডের জালে জড়ালেন লাওতারো মার্টিনেজ! ২-১-এ অবিশ্বাস্য কামব্যাকে মেসি বাহিনীর ফাইনালের পথের টিকিট প্রায় কনফার্ম। রেফারির শেষ বাঁশির সাথে সাথে তা নিশ্চিত হয়ে গেল। স্টেডিয়ামের ছাদ ফুঁড়ে যেন উল্লাসের জোয়ার নামল। গ্যালারির দর্শকরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছেন, এ এক অলৌকিক আনন্দের রাত। ডাগআউটে স্ক্যালোনির স্বস্তির হাসি আর মাঠে মার্টিনেজের সেই বুনো উদযাপন বুঝিয়ে দিল-এই আর্জেন্টিনা সহজে মরতে শেখেনি। যাইহোক মারকানায় ফুটবল ইতিহাসের মহাকাব্য লিখেছে মেসি বাহিনী। এবার নিউ জার্সির মেটলাইফে শুধু ফাইনালে মুকুট পরার অপেক্ষা! সেই অপেক্ষায় থাকলাম। অভিনন্দন আর্জেন্টিনা।

সম্পর্কিত খবর

;