অন্তর্বর্তী সরকারের সময় হামের টিকা আমদানি করা হয়নি: সংসদে প্রধানমন্ত্রী

প্রকাশ : 22 Apr 2026
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় হামের টিকা আমদানি করা হয়নি: সংসদে প্রধানমন্ত্রী


স্টাফ রিপোর্টার: অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শিশুদের হামের টিকা আমদানি করা হয়নি বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, হাম পরীক্ষার কিটের স্বল্পতা আছে। তবে কিছু কিট ইতিমধ্যে এসেছে, আর কাস্টমসে থাকা কিট দ্রুত ছাড় করানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য সালাহ উদ্দিনের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে প্রশ্নোত্তর অনুষ্ঠিত হয়েছে।

সম্পূরক প্রশ্নে সালাহ উদ্দিন বলেন, দেশের চিকিৎসা খাতে এটি এখন একটি ‘ক্রুশিয়াল কোশ্চেন’। চট্টগ্রামে দেশের একমাত্র সংক্রামক রোগের চিকিৎসাকেন্দ্র ও বিশেষায়িত ইনস্টিটিউটসহ অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে হাম শনাক্তকরণের ব্যবস্থা বন্ধ রয়েছে। এ কারণে হাম শনাক্ত করতে বিভিন্ন ইনস্টিটিউট ও চিকিৎসাকেন্দ্র থেকে নমুনা ঢাকার পাবলিক হেলথ সেন্টারের ন্যাশনাল পোলিও অ্যান্ড রুবেলা ল্যাবরেটরিতে পাঠাতে হচ্ছে। এতে টিকা পাওয়ার পরও রোগ শনাক্তে রোগীদের অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এই ব্যবস্থা উত্তরণে খুব দ্রুত কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হবে কিনা।

জবাবে সংসদ নেতা তারেক রহমান বলেন, আসলে এটি একটি দুঃখজনক ঘটনা। এই সংসদে আজ আমরা যারা উপস্থিত আছি, সবাই মিলে একটি স্বৈরাচারকে এই দেশ থেকে বিতাড়িত করেছি। সেই স্বৈরাচারের সময় এবং আরও দুঃখজনক ব্যাপার হলো, আমরা যেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে সমর্থন দিয়েছিলাম দেশে একটি সুষ্ঠু, সুন্দর, নিরপেক্ষ নির্বাচন করার জন্য; দুঃখজনকভাবে সেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় শিশুদের হামের টিকা গত কয়েক বছর ধরে বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়নি।

দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ইউনিসেফ আমাদের, বাংলাদেশকে অনেক হেল্প করেছে এই ব্যাপারে। হামের ভ্যাকসিন খুব দ্রুততার সঙ্গে তারা পাঠিয়েছে। যার ফলে আমরা ওষুধগুলো পেয়েছি এবং প্রায় ২ কোটি শিশুকে এই হামের ভ্যাকসিন আমরা দেব।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, মাননীয় সংসদ সদস্য, আপনি যে প্রশ্নটি করেছেন, টেস্ট করার যে কিটটি, সেটির স্বল্পতা রয়েছে, সঠিক। এটির ব্যাপারেও সরকার কাজ করছে। একটি কিটে কতটি পরীক্ষা করা সম্ভব, সে বিষয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এরই মধ্যে অনেক কিট এসে পৌঁছেছে। সম্ভবত একটি কিট দিয়ে বোধহয় তিনটি শিশুকে টেস্ট করা সম্ভব। তিনটি টেস্ট করা যায়, একটি কিটে। কিছু কিট এই মুহূর্তে খুব সম্ভবত ঢাকার কাস্টমসে আছে, এয়ারপোর্টে আছে। সেগুলো আমরা দ্রুত ছাড় করানোর ব্যবস্থা ইনশা আল্লাহ করছি।’

হামে শিশুমৃত্যুর প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুঃখজনক। অনেকগুলো শিশুর প্রাণ ঝরে গিয়েছে, আমাদের মাঝ থেকে চলে গিয়েছে। তবে পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার ব্যবস্থা নিয়েছে। সামনে আমরা চেষ্টা করছি, যাতে এই পুরো সিচুয়েশনকে ম্যানেজ করতে পারি। সে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে সরকার।

ফ্যাসিস্ট আওয়ামী আমলে সংঘটিত অর্থ পাচার ও দুর্নীতির অনুসন্ধান করে একটি পূর্ণাঙ্গ শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সংসদ সদস্য কামরুজ্জামানের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, অর্থ পাচারের গন্তব্য দেশগুলো থেকে প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ১০টি দেশের মধ্যে (যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও হংকং-চায়না) তিনটির (মালয়েশিয়া, হংকং ও সংযুক্ত আরব আমিরাত) সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সম্মতি দিয়েছে। অপর সাতটি দেশের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সভাপতিত্বে গঠিত আন্তসংস্থা টাস্কফোর্সের চিহ্নিত ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ১১টি মামলায় পাচার হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধারের জন্য আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর উপস্থাপিত ১১টি অগ্রাধিকারভুক্ত মামলা হচ্ছে—সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তাঁর পরিবার ও তাঁদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান; সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তাঁর স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান; এস আলম গ্রুপ ও এর স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান; বেক্সিমকো গ্রুপ ও এর স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান; সিকদার গ্রুপ ও এর স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান; বসুন্ধরা গ্রুপ ও এর স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান; নাসা গ্রুপ ও এর স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান; ওরিয়ন গ্রুপ ও এর স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান; নাবিল গ্রুপ ও এর স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান; এইচ বি এম ইকবাল, তার পরিবার ও তাঁদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এবং সামিট গ্রুপ ও এর স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিবারসহ ১১টি মামলায় পাচার হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধারে আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বর্তমান সরকার দুর্নীতি, মানি লন্ডারিং ও আর্থিক অপরাধ দমনের কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিদেশে পাচার করা সম্পদ পুনরুদ্ধার কার্যক্রমকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে সংসদ নেতা তারেক রহমান বলেন, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অর্থপ্রবাহের পরিমাণ আনুমানিক ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা প্রতিবছরে গড়ে ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ১.৮ লাখ কোটি টাকা)। পাচার করা অর্থ একাধিক দেশে স্থানান্তরিত হওয়ার অভিযোগ থাকায় তা উদ্ধারে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে তথ্যবিনিময়, সম্পদ শনাক্তকরণ ও পারস্পরিক আইনগত সহায়তা জোরদার করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে ‘পারস্পরিক আইনগত সহায়তা চুক্তি’ সম্পাদন ও বিনিময়প্রক্রিয়ার জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করা হচ্ছে।

অপর এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, স্থানীয় সরকার (এলজিআরডি) মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা প্রায় ২০০টি অব্যবহৃত বহুতল ভবন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে। এই ২০০টির মতো বিল্ডিং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে হস্তান্তরের প্রসেস এই মাসের মধ্যেই কমপ্লিট হয়ে যাবে। আগামী দুই মাসের মধ্যে এগুলোকে ছোট ছোট মাতৃসদন ক্লিনিকসহ শিশু ও নারীদের চিকিৎসার উপযোগী করে গড়ে তোলা হবে।

সংসদ সদস্য মো. আবুল কালামের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, সারা দেশে শহর ও গ্রাম অঞ্চলে খেলার মাঠ নির্ধারণ ও অবকাঠামো উন্নয়ন, ‘ই-হেলথ কার্ড’ এর মাধ্যমে চিকিৎসা সেবা দেওয়া, পাঁচ লাখ সরকারি কর্মচারী নিয়োগ এবং এ অর্থবছরে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২ লাখ শিশুদের মাঝে বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস বিতরণসহ অন্যান্য উদ্যোগ বাস্তবায়নের কার্যক্রম চলমান।

সংসদ সদস্য মো. আব্দুল আজিজের লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ফ্রিল্যান্সার তৈরিতে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদফতর পাঁচ বছরে এক হাজার জনকে প্রশিক্ষণ দেবে এবং একই সময়ে দুই লাখ ফ্রিল্যান্সারকে আইডি কার্ড দেওয়া হবে। ইতোমধ্যে সাড়ে সাত হাজার ফ্রিল্যান্সারকে আইডি কার্ড দেওয়া হয়েছে এবং এর কার্যক্রম চলমান।


সম্পর্কিত খবর

;