মোঃ নূর আলম শেখঃ
মহান মুক্তিযুদ্ধের অকৃত্রিম বন্ধু, কবি-সাহিত্যিক-অনুবাদক, শিক্ষাবিদ ফাদার মারিনো রিগনের শততম জন্মদিনে তাঁর প্রতি রইলো বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। ১৯২৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ইতালির ভিল্লাভেরলা গ্রামের এক সংস্কৃতিবান পরিবারে মারিনো রিগনের জন্ম। পিতা রিকার্ডো রিগন। তিনি পেশায় কৃষক এবং একজন দক্ষ যাত্রা শিল্পী ছিলেন। মাতা ইতালিয়া মনিকা। পেশায় একজন শিক্ষিকা ছিলেন। খ্রিষ্টিয় মঙ্গলময় বাণী প্রচারের উদ্দেশ্য নিয়ে ১৯৫৩ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ( বাংলাদেশে ) আসেন ফাদার মারিনো রিগন। এরপর দেশের বিভিন্ন স্থান ঘুরে অবশেষে মোংলার শেলাবুনিয়ায় স্থায়ী আবাস গড়েন। ইতালির ভিল্লাভেরলা থেকে বাংলাদেশ এই দুইয়ের মধ্যে সংযোগ এবং সম্পর্কের বিষয়ে কবি ফাদার মারিনো রিগন বলেন ”জগৎ পেয়েছি ভিল্লাভেরলায় খুঁজে/জীবন পেয়েছি বাংলাদেশের মাঝে।”
ফাদার মারিনো রিগন প্রায় বলতেন ’আমার মস্তকে রবীন্দ্রনাথ অন্তরে লালন’। ফাদার রিগন বলেছেন ”বাংলাদেশে এসে আমি অপূর্ব আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক ধনসম্পদ পেয়েছি, যা দিয়ে আমার জীবন পুষ্ট হয়েছে; যার জন্য আমার সম্পূর্ণ জীবন পূন্য ও ধন্য হয়েছে এবং পরিপূর্ণতা পেয়েছে”। লালন সংগীতের মধ্যে তিনি ঐশ্বরিক অনুভূতি খুঁজে পান। ফাদার রিগনকে প্রশ্ন করা হয়েছিলো ধর্মজীবন না শিল্পজীবন কোনটাকে প্রথমে রাখবেন? উত্তরে তিনি বলেছিলেন ”আমার জীবনে ধর্মজীবন ও শিল্পজীবন পৃথক দেখিনা, এক সঙ্গে মিলিত রূপ দেখে মনে করি সে শিল্প ও কবিত্ব আমার অন্তরের জগত, যে শিল্পে ও কবিত্বে বিশ্ব সৃষ্টি হয়েছে।” যাজকীয় দায়িত্ব পালনের বাইরে এসে ফাদার মারিনো রিগন জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষ ও প্রাণ-প্রকৃতির সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন। দারিদ্র বিমোচন ও উন্নয়ন, মানসম্মত শিক্ষা বিস্তার, চিকিৎসা সেবা প্রদান ও দুস্থ নারীদের ভাগ্য বদলে ফাদার মারিনো রিগনের ভূমিকা অতুলনীয়। তাঁর হাত দিয়েই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মোংলার বিখ্যাত স্কুল সেন্ট পল্স উচ্চ বিদ্যালয়। তাঁর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় মোংলা এলাকায় গড়ে উঠেছে ১৭টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। গড়ে তুলেছিলেন শেলাবুনিয়া শেলাই কেন্দ্র ও সেন্ট পল্স হাসপাতাল। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ে গোপালগঞ্জের বানিয়ারচরে মুক্তিযোদ্ধাদের যে সেবা ও আশ্রয় তিনি দিয়েছেন জাতি তা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। ধর্ম প্রচার ও কল্যাণমূলক কর্মকান্ডকে ছাপিয়ে ফাদার রিগনকে বিশিষ্ট করে তুলেছে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর তীব্র অনুরাগকে। ফাদার মারিনো রিগন ইতালিয়ান ভাষায় অনুবাদ করেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গীতাঞ্জলিসহ প্রায় ৪০টি কাব্যগ্রন্থ, লালন সাঁইয়ের ৩৫০টি গান, জসীম উদ্দীনের নক্সীকাঁথার মাঠ, সোজন বাদিয়ার ঘাট ছাড়াও বাংলাদেশের খ্যাতিমান কবিদের অসংখ্য কবিতা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও লালন সাঁইজির গানের ইতালিয়ান ভাষায় অনুবাদ ছাড়াও ফাদার রিগন ’শেলাবুৃুনিয়ার রূপকথা’ ’আমার গ্রাম’ ’ভিল্লাভেরলা থেকে শেলাবুনিয়া’ নামক তিনটি বাংলা বই লিখেছেন। এছাড়া ইতালিয়ান ভাষায় ৯টি বই লিখেছেন। ইতালি লেখক কার্লো কল্লোদি’র নন্দিত রূপকথা ’কাঠের মানুষ পিনোকিও’ বাংলা ভাষায় অনুবাদ করেছেন ফাদার মারিনো রিগন। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক দলের নেতৃত্ব দিয়ে এদেশের সংস্কৃতিকেও তিনি পৌছে দিয়েছেন ইতালিতে। ভিল্লাভেরলা গ্রামে ’রবীন্দ্র সড়ক’, ’রবীন্দ্র অধ্যায়ন’ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছেন। সামগ্রিক ভাবে বললে বলা যায় ইতালিতে ফাদার মারিনো রিগন বাংলাদেশের অঘোষিত রাস্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেছেন।
ফাদার মারিনো রিগনকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ২০০৮ সালে সম্মানসূচক নাগরিকত্ব সনদ প্রদান করে। ২০১২ সালের ২০ অক্টোবর বাংলাদেশ সরকার মহান মুক্তিযুদ্ধে অনন্য সাধারণ অবদানের জন্য বাঙালি জাতির শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার নিদর্শনস্বরূপ ”মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা” ( Friends OF Liberation War Honour ) পদক প্রদান করে। এছাড়াও ফাদার মারিনো রিগনকে কবি জসিম উদ্দিন একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার, ড্যানিশ লায়ন্স ক্লাব মেট্রো পুরস্কার, ইতালিয়ান রেডিও-টেলিভিশন কর্তৃক মারিয়েল ভাস্ত্রে পুরস্কার, ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠি সম্মননা পুরস্কার, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী ও লালন রিসার্চ ফাউন্ডেশন কর্তৃক লালন রিসার্চ লালন রিসার্চ ফাউন্ডেশন সম্মাননা পুরস্কার প্রদান করা হয়।
১৯৫৩ সালে ফাদার মারিনো রিগন বাংলাদেশে আসার পর থেকে দেশের বিভিন্ন স্থান ঘুরে অবশেষে মোংলার শেলাবুনিয়ায় স্থায়ী আবাস গড়েন। যাজকীয় দায়িত্ব পালন থেকে অবসর নেয়ার পরেও বাংলাদেশের সমৃদ্ধ সংস্কৃতি ও সাহিত্যকে ভালোবেসে ইতালিতে ফিরে না গিয়ে তিনি এদেশেই রয়ে যান। ২০১৪ সালে ফাদার রিগন হৃদরোগে আক্রান্ত হন। পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁকে ইতালি নিয়ে যেতে চাইলে তিনি বলেন ”যেতে পারি, তবে আমার মৃত্যু হলে আমাকে বাংলাদেশে এনে সমাহিত করতে হবে। মৃত্যুর আগ মুহুর্ত পর্যন্ত যতক্ষন তাঁর জ্ঞান ছিলো ততক্ষণ তিনি বলতেন ”আমি শেলাবুনিয়া যাবো”। ২০১৭ সালের ২০ অক্টোবর ফাদার মারিনো রিগন ইতালিতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ফাদার মারিনো রিগনের অন্তিম ইচ্ছা পূরণে তাঁর পরিবার আগ্রহ দেখালে বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তা বাস্তবায়নে নির্দেশনা প্রদান করেন। মৃত্যুর এক বছর পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে ২০১৮ সালে ২১ অক্টোবর ফাদার মারিনো রিগনের অন্তিম ইচ্ছা বাস্তবায়নে মরদেহ বাংলাদেশে তথা মোংলায় তাঁর প্রিয় শেলাবুনিয়ায় আনা হয়। একই সাথে রাস্ট্রীয় মর্যাদায় মুক্তিযোদ্ধার সম্মানে ফাদার রিগনকে শেলাবুনিয়ায় সমাহিত করা হয়। আজ ফাদার মারিনো রিগনের শততম জন্মদিনে বলতে চাই ’ফাদার রিগন; তুমি আমাদেরই লোক’। ফাদার রিগনের শততম জন্মদিনে তাঁরই লেখা কবিতার মাধ্যমে তাঁর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানাতে চাই।
”বিদায় আমি নিয়েছি!
আর নয় ভ্রাতৃগণ, যেতে দাও মোরে,
সদয় বচনে গৃহের চাবি সঁপিলাম তব করে,
থেকেছি অনেক কাল তোমাদের সনে-
দিয়েছি সামান্য মাত্র, পেয়েছি অনেক গুণে,
দিন আমার চলেছে প্রায়, হতে অবসান
হতে পারে যে কোন ক্ষণে শেষ আহ্বান।
রব তাই কৃতজ্ঞ হয়ে, সবার সন্নিধান
সবারে জানাই মোর- বিদায় বিলক্ষণ।”
লেখকঃ সাবেক কেন্দ্রিয় সাধারণ সম্পাদক বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, সাবেক মোংলা উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান, আহ্বায়ক- সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট মোংলা।
তথ্যসূত্র বইঃ ’ফাদার রিগন নিভৃত কোলাহল’ ’শেলাবুনিয়ার রূপকথা’ ও ’আমার গ্রাম’।
মো. মামুন হাসান:
ইলিশ আমাদের জাতীয় মাছ এবং দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। এটি শুধু আমাদের নদী ও সাগরের সম্পদই নয়, বরং দেশের কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়ি ...
ইমদাদ ইসলাম:
বিষাক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিচ্ছে দেশের মানুষ। প্রায় প্রতিটি গণমাধ্যমেই প্রতিদিনই দেশের বায়ু মান গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করা হয়।গত ৪ মার্চ বুধবার সকাল ১০টার দিকে রাজধানী ঢা ...
মানিক লাল ঘোষ: ইতিহাসের পাতায় কোনো কোনো দিন আসে যা কেবল একটি তারিখ নয়, বরং একটি জাতির ভাগ্যবদল ও আত্মপরিচয়ের চূড়ান্ত দলিল হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ ছিল তেমনই এক মাহেন্দ্রক্ষণ। সেদি ...
আতিকুল ইসলাম টিটু:
বাংলাদেশকে নয়া উপনিবেশিক আধাসামন্তবাদী রাষ্ট্র হিসেবে বোঝার জন্য কেবল রাষ্ট্র গঠনের পরবর্তী সময় নয়, বরং বিশ্ব ইতিহাসের বৃহত্তর শ্রেণি সংগ্রাম এবং সাম্রাজ্যবাদ ...
সব মন্তব্য
No Comments