নাগরিক সংলাপে বক্তারা

রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহারে পরিবেশ, প্রতিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনকে প্রধান্য দিতে হবে

প্রকাশ : 19 Jan 2026
রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহারে পরিবেশ, প্রতিবেশ ও  জলবায়ু পরিবর্তনকে প্রধান্য দিতে হবে


স্টাফ রিপোর্টার: আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে পরিবেশ, প্রতিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনকে প্রধান্য দেয়া দাবি জানিয়েছেন নাগরিক সমাজ ও পরিবেশবাদিরা। আজ ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ সকাল ১১ টায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর রুনি মিলনায়তনে পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন আন্দোলন (পরিজা) এবং  দুঃস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্র (ডিএসকে)’র যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত নাগরিক সংলাপে দুঃস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্র (ডিএসকে)’র সভাপতি অধ্যাপক নূর মোহাম্মদ তালুকাদারের সভাপতিত্বে এবং পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন আন্দোলন (পরিজা)’র সাধারণ সম্পাদক ফেরদৌস আহমেদ উজ্জলের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে ধারণাপত্র উত্থাপন করেন পরিজার সভাপতি ও পরিবেশ অধিদপ্তরের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালনক প্রকৌশলী মো: আবদুস সোবহান। নাগরিক সংলাপে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন ডিএসকে’র নির্বাহী পরিচালন ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা: দিবালোক সিংহ।

 

আরও বক্তব্য রাখেন শ্রমীক নেতা আসলাম খান, কৃষিবিদ মো: আহসান করিম ভূইয়া, উন্নয়ন কর্মী সানজিদা জাহান আশরাফি, শিক্ষা আন্দোলন নেতা রুস্তম আলী খোকন, সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী খালেকুন্নাহার তানইয়া, নগর দরিদ্র মানুষের প্রতিনিধি হোসনে আরা বেগম রাফেজা, পরিবেশ কর্মী মোহাম্মদ সেলিম, বানিপা’র সভাপতি প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন, সাংবাদিক রিয়াজ হোসেন প্রমূখ।

নাগরিক সংলাপের ধারণাপত্রে প্রকৌশলী মো: আবদুস সোবহান বলেন,  ভোটাররা ইশতেহার দেখে তুলনা করেন কোন দলের পরিকল্পনা বাস্তবসম্মত এবং কোন প্রতিশ্রুতি তাদের জীবনে প্রভাব ফেলবে। নির্বাচনী প্রচারের সময় ইশতেহার হয়ে ওঠে প্রধান রাজনৈতিক বার্তা। নির্বাচনী ইশতেহার শুধু প্রতিশ্রুতি বা প্রতিজ্ঞা নয় এটা একটি দলের ভবিষ্যত রাষ্ট্র চিন্তার একটি পথ পরিকল্পনা যা কোনো লক্ষ্য অর্জনের জন্য বিস্তারিত ধাপ বা কৌশল হিসাবে বিবেচিত। দেশের আর্থ সামাজিক উন্নয়নে পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে নাগরিক জীবনে দীর্ঘ মেয়াদে সুফল লাভের লক্ষ্যে পরিবেশ সুরক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বিশেষ ভাবে গুরুত্ব প্রদান করা অত্যাবশ্যক। এ লক্ষ্যে রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের নিবাচনী ইশতেহারে পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন সুরক্ষা কর্মসূচি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সন্নিবেশিত করা প্রয়োজন।

বিশেষ অতিথি ডা: দিবালোক সিংহ বলেন,  বাঙ্গালী জাতির স্বার্থে পরিবেশ রক্ষা করতে হবে। বাংলাদেশে পানি ও পয়: নিষ্কাসনের অব্যবস্থাপনার জন্য ২লক্ষ ৭২ হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করেন বলে গবেষণায় পাওয়া গেছে। তিনি আরও বলেন, আমাদের সংসদ এমন হওয়া উচিত যাাতে সেখানে সর্বদা পরিবেশবান্ধব নীতি ও আইনগুলো গ্রহণ করা হয়। রাজনৈতিক দলের ইশতেহার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ইশতেহারে পরিবেশ বিষয়ে ঘোষণা এবং তার লক্ষ্যমাত্রাও নির্ধারণ করে দিতে হবে।  

সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক তালুকদার বলেন, আমাদের সংসদগুলোতে অধিকাংশ সদস্য নির্বাচিত হয় ব্যবসায়ীদের থেকে আর তারাই সবচেয়ে বেশি পরিবেশ ধ্বংস করে । যারা ক্ষমতায় যায় তারাই সব ভুলে যায়। তাই ইশতেহারে পরিবেশ নিয়ে সুস্পষ্ট বক্তব্য থাকতে হবে ্এবং পরিবেশ ধ্বংসকারীদের বয়কট করতে হবে। সকল রাজনৈতিক দলের কাছে পরিবেশ বিষয়ক সুস্পষ্ট সুপারিশগুলোও পাঠানোর উপর জোর দেন তিনি।

সংলাপে বক্তারা আরও বলেন, নদীমাতৃক বাংলাদেশে নদ-নদী, খাল-বিল, হাওর, জলাশয় হচ্ছে এদেশের প্রাণ। এদেশে অভিন্ন নদীর সংখ্যা ৫৭টি।  ৫৪টি ভারতের এবং ৩টি মিয়ানমারের সাথে সংশি¬ষ্ট। দেশের ৯৩% মিঠা পানি এই নদীগুলো থেকে আসে, যা পরিবেশ, প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং নৌ চলাচল, কৃষি, মৎস্য, শিল্প উৎপাদন এবং পানীয় জলের জন্য অত্যাবশ্যক। মানুষের অত্যাচারে নদীগুলো আজ মৃতপ্রায়। উজানে পানি প্রত্যাহারের কারণে উত্তরাঞ্চলের নদীসমূহ শুস্ক বালুচরে পরিণত হয়েছে এবং দক্ষিণাঞ্চলের নদীগুলোতে লবণাক্ততা বেড়েই চলেছে। ফলে কৃষি, মৎস্য, নৌ যোগাযোগ, শিল্প উৎপাদনে বিরুপ প্রভাব পড়ছে। নদী, খাল-বিল, জলাশয় হারিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি সারা দেশে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রতিনিয়ত নিচে নেমে যাচ্ছে। দেশের অন্যান্য এলাকার মতো ঢাকাতেও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ভীতিকর গতিতে নিচে নেমে যাচ্ছে।

আলোচকরা আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশ অন্যতম ক্ষতিগ্রস্থ দেশ। ২১০০ সাল নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে দেশের আঠারো শতাংশের বেশী ভূমি পানির নীচে স্থায়ীভাবে তলিয়ে যাবার আশংকা রয়েছে। ফলে উপক’লীয় এলাকার ২ কোটি মানুষ জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হবে এবং খাদ্য উৎপাদন ব্যাপকভাবে হ্রাস পাবে। ব্যাপক জনগোষ্টির খাদ্য সংকুলান করতে সীমিত আবাদী জমির উপর চাপ বাড়ছে। জমির অতিকর্ষণে ভূমি ক্ষয় হচ্ছে। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, কৃষি জমি হ্রাস, নদী-খাল-বিল-হাওর দখল-ভরাট-দূষণ, বনাঞ্চল দখল-হ্রাস, ভ’গর্ভস্থ পানির উপর নির্ভরশীলতা, পানি ও বায়ু দূষণ এর বর্তমান অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে উন্নয়ন কর্মকান্ড পরিচালনা করা হলে তা টেকসই হবে এবং বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দীর্ঘমেয়াদী সুফল বয়ে আনবে। কৃষি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তার পাশাপাশি আয় এবং কর্মসংস্থান নিশ্চিত করে। খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে তরুণদের সম্পৃক্ততা বাড়াতে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ব্যাপক কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে।

ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশের বিশাল জনসংখ্যার একটি উলে¬খযোগ্য অংশ যুব সমাজ। এই তরুণ হৃদয় ও মনই হবে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের রূপকার। যদি এই বিশাল জনগোষ্ঠী একত্রিত হয় তবে বিশ^ উষ্ণায়ন মোকাবেলার মাধ্যমে এক পরিবেশ বান্ধব প্রজšম তৈরি সম্ভবপর হবে। বাংলাদেশের যুব সমাজের এই শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করে এবং প্রধান পরিবেশগত ও উন্নয়ন বিষয়সমূহ সম্পর্কে তাদের সচেতন করে দেশের সার্বিক উন্নয়ন তরান্বিত করা সম্ভব।

 পরিবেশ সুরক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে অন্তর্ভুক্তির জন্য সুপারিশঃ

 পানি সম্পদের সুবিচারপূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিতকরণে কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা

 নদীর তলদেশের পলি অপসারণের মাধ্যমে নদীর পানি ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি করা

 কৃষি, শিল্প উৎপাদনে ভ’উপরিস্থ পানির ব্যবহার করা

 সেচ কাজে ভূগর্ভ ও ভূউপরিস্থ পানির ব্যবহার কমানোর লক্ষ্যে ঋতুভিত্তিক চাষাবাদকে অগ্রাধিকার দিয়ে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করা

 কৃষককে প্রয়োজনীয় আর্থিক প্রণোদনা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে কৃষিপণ্যের ক্ষতি হলে ঋণ মওকুফসহ উপকরণ সহায়তা প্রদান করা।

 কৃষি খাতে তরুণদের সম্পৃক্ত করে সময়োপযোগী কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা

 যুব সমাজকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত করা

 প্রাকৃতিক দুর্যোগ বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, ভ’কম্পন মোকাবেলায় প্রস্তুতি গ্রহণ এবং জনসচেতনা সৃষ্টি করা

 বায়ু ও শ্বদ দূষণ নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ গ্রহণ করা

 নদী দখল-ভরাট নিয়ন্ত্রণ ও খননের মাধ্যমে পানি প্রবাহ বৃদ্ধি এবং শিল্প ও পয়ঃবর্জ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা

 শিল্প ও পয়ঃবর্জ্য পরিশোধন করা

 ব্যাপকহারে গাছ লাগানো এবং জীববৈচিত্র সংরক্ষণ করা

 জনস্বাস্থ্য রক্ষায় এবং শিশুদের শারিরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য খেলার মাঠ, পার্ক, উন্মুক্ত স্থান সংরক্ষণ করা

 পররাষ্ট্র নীতিতে (১) আঞ্চলিক পর্যায়ে অভিন্ন নদীর পানির ন্যায়সঙ্গত হিস্যা প্রাপ্তির উদ্যোগ গ্রহণ করা (২) বৈশ্বিক পর্যায়ে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিরুপ প্রভাব মোকাবলায় আর্থিক ও কারিগরী সহায়তা প্রাপ্তির লক্ষ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী রাষ্ট্রসমূহ এবং জাতিসংঘ এর সাথে জলবায়ু ক’টনৈতিক কার্যক্রম গ্রহণ কর।

সম্পর্কিত খবর

;