এমপক্স ভাইরাস: করোনার পর নতুন মহামারি

প্রকাশ : 04 Sep 2024
এমপক্স ভাইরাস: করোনার পর নতুন মহামারি

মোঃ মামুন হাসান


২০২০ সালে হয়ে যাওয়া করোনা মহামারির রেশ এখনও পর্যন্ত কাটিয়ে উঠতে পারেনি বিশ্ববাসী।তার মধ্যেই নতুন ভাইরাস দেখা গেল সারা বিশ্বে। উঁকি দিতে শুরু করেছে নয়া বিপদ, যার নাম এমপক্স বা মাঙ্কিপক্স। ইতোমধ্যেই বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে এই মাঙ্কিপক্সের দাপট। বেশ কয়েকটি দেশে দ্রুত ছড়াচ্ছে এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব। আরও এক মহামারির জন্য দিন গুনছে পৃথিবী? স্বাভাবিকভাবেই বিষয়টিকে ঘিরে বাড়তে শুরু করেছে উদ্বেগ।মাঙ্কিপক্স পশুবাহিত রোগ। তাই মূলত পশ্চিম এবং মধ্য আফ্রিকার দেশগুলিতেই এই রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি।কঙ্গোয় দাবানলের মতো সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তেই মাঙ্কি পক্স নিয়ে ২০২৪ সালের ১৪ই আগস্ট  বিশ্বে জরুরি অবস্থা জারি করল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু)। ২০২২ সালের পর এই নিয়ে দ্বিতীয় বার মাঙ্কিপক্স নিয়ে সতর্কতা জারি করল হু।২০২২ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত এটি আফ্রিকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের ১৫ই আগস্ট প্রথম আফ্রিকার বাইরে সুইডেনে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ল এক ব্যক্তির হাত ধরে।


এমপক্স একটি ভাইরাল রোগ, যা অর্থোপক্সভাইরাসগণের একটি প্রজাতি। বিজ্ঞানীরা ১৯৫৮ সালে প্রথমবার এই ভাইরাসটি শনাক্ত করেন। বানরের মধ্যেই সবার প্রথম এই 'পক্স-জাতীয়' রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। সেখান থেকেই তা ছড়িয়ে পড়ে মানবশরীরে। অনেকটা গুটিবসন্তের সমগোত্রীয় এই ভাইরাস। পরবর্তীতে এই সংক্রামক রোগ ছড়িয়েছে মানুষ থেকে মানুষেও। বিশ্বব্যাপী বিশেষজ্ঞদের সাথে একের পর এক আলোচনার পর, হু একটি নতুন পছন্দের শব্দ "এমপক্স" (Mpox) ব্যবহার করা শুরু করেছে "মাঙ্কিপক্স" (monkeypox) -এর প্রতিশব্দ হিসেবে।আশির দশকে প্রথম মাঙ্কিপক্সের খোঁজ মেলে। তার পর থেকে মূলত পশ্চিম এবং মধ্য আফ্রিকার দেশগুলিতেই এই রোগ সীমাবদ্ধ ছিল। কারণ মাঙ্কিপক্স পশুবাহিত রোগ। আর যে ধরনের পশুর শরীর থেকে এ রোগ ছড়ানোর আশঙ্কা তাদের বাস মূলত গ্রীষ্মপ্রধান এলাকার বৃষ্টি বনাঞ্চলে (রেইন ফরেস্ট ) ।

এই ভাইরাসের দুটি ধরণ রয়েছেসাধারণত, প্রথমটিক্লেড ১ ভাইরাস। যার প্রাদুর্ভাব গত কয়েক দশক ধরেই কঙ্গোতে বিক্ষিপ্তভাবে ছিল। যেখানে শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বেশি। ক্লেড ২ধরণটি এর থেকে কম গুরুতর। তবেগত বছরে সংক্রামিত অনেকের তুলনামুলকভাবে নতুন ও আরও গুরুতর ধরনের এমপক্স ক্লেড ১বি-তে আক্রান্ত হয়েছেন। যা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। আফ্রিকা সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) বলছে, “২০২৪ সালের শুরু থেকে জুলাইয়ের শেষ পর্যন্ত সাড়ে ১৪ হাজারেরও বেশি মানুষ এমপক্সে আক্রান্ত হয়েছে আর এতে ৪৫০ এরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এই সংখ্যা ২০২৩ সালের একই সময়ের তুলনায় সংক্রমণের ক্ষেত্রে ১৬০ শতাংশ এবং মৃত্যুর ক্ষেত্রে ১৯ শতাংশ বেশি।“ ২০২২ সালে এমপক্সের মৃদু ধরন ক্লেড ২ এর কারণে জরুরি জনস্বাস্থ্য অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছিল। এশিয়া এবং আফ্রিকার মতো যে দেশগুলোতে সাধারণত এই ভাইরাস দেখা যায় না এমন প্রায় ১০০টি দেশে এটি ছড়িয়ে পড়ে।

এর সংক্রমণ শরীরের ত্বক বা শরীর থেকে নিঃসৃত বিভিন্ন তরলের সরাসরি সংস্পর্শে আসার মাধ্যমে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে ঘটে থাকে। অপরদিকে, সংক্রমিত পশুর সঙ্গে সংঘর্ষ কিংবা কামড় বা আঁচড়ের মাধ্যমে পশু থেকে পশুতে ছড়িয়ে পড়ে। আর পশু থেকে মানুষে সংক্রমণ ঘটে আক্রান্ত পশুর কামড় অথবা আঁচড় বা পশু শিকার, চামড়া কাটা বা রান্নার মতো কার্যকলাপের সময়। এমপক্স ভাইরাস ত্বক, থুথু, লালা, নাকের পানি ও যৌনাঙ্গের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে। অর্থাৎ কথা বলা, কাশি বা হাঁচির মাধ্যমেও এটি ছড়িয়ে পড়তে পারে।

এই রোগের প্রাথমিক লক্ষণগুলিরমধ্যে রয়েছে জ্বর, মাথাব্যথা, ফোলা, পিঠে এবং পেশিতে ব্যথা। আক্রান্ত ব্যক্তির একবার জ্বর উঠলে গায়ে ফুসকুড়ি দেখা দিতে পারে। অত্যন্ত চুলকানো বা ব্যথাদায়ক এই ফুসকুড়িগুলো পরিবর্তন হয় এবং বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে স্ক্যাব বা গোল গোল পুরু আস্তরে পরিণত হয়ে শেষে পড়ে যায়। এর ফলে দাগ সৃষ্টি হতে পারে। সাধারণভাবে ১৪-২১ দিনের মধ্যেই ঠিক হয়ে যাওয়ার কথা এই রোগের। কিন্তু ভাইরাসটি ক্রমাগত ভ্যারিয়েন্ট পরিবর্তন করায় ক্রমশ জটিল হচ্ছে পরিস্থিতি। বহু ক্ষেত্রেই বয়স্ক ও শিশুদের ক্ষেত্রেও ভয়ের হয়ে উঠছে এই ভাইরাস। এমনকি মুখ, চোখ ও যৌনাঙ্গসহ গোটা শরীরেও ক্ষত তৈরি হতে দেখা যাচ্ছে এই সংক্রমণের ফলে।


 

এমপক্স ভাইরাসের উদ্ভব হয়েছে বন্যপ্রাণী থেকে, এটি প্রাণীবাহিত রোগ।বর্তমানে এমপক্স ভাইরাস মানুষ থেকে মানুষের মধ্যে ছড়াচ্ছে। এজন্য ঝুঁকি বেড়ে গেছে।যেভাবে ছড়ায়- এমপক্স ভাইরাস মানুষ থেকে মানুষে ছড়াচ্ছে শারীরিক সংস্পর্শের মাধ্যমে । সংক্রমিত ব্যক্তিকে চুমু দেওয়া,র্স্পশ করা, যৌন সম্পর্ক থেকে এটি ছড়াতে পারে।আক্রান্ত ব্যক্তির শ্বাস-প্রশ্বাসের খুব কাছাকাছি থাকলে সংক্রমণ ঝুঁকি থাকতে পারে। আক্রান্ত বন্যপ্রাণী মাংস কাটা  শিকার করা, চামড়া তোলা, এমনকি রান্নার সময়, কম তাপে রান্না করা খাবার খেলে সেখান থেকে ভাইরাস ছড়াতে পারে। আমাদের দেশে বন্যপ্রাণী শিকার করা হয় না খুব একটা। কিন্তু এমপক্স আক্রান্ত প্রাণীর কাছাকাছি গেলেও সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।সংক্রমিত ব্যক্তির ব্যবহার করা পোশাক, তোয়ালে, বিছানার চাদর, যেকোনো ব্যবহার্য জিনিসপত্র থেকে ভাইরাস ছড়াতে পারে।সংক্রমিত ব্যক্তির ব্যবহার করা ইনজেকশনের সুঁই অন্য কারো শরীরে প্রবেশ করালেও এমপক্স হতে পারে।সন্তানসম্ভবা নারী এমপক্স আক্রান্ত হলে অনাগত সন্তানও এমপক্স ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে।এমপক্স শুকিয়ে যাওয়ার পর ফোসকার আবরণ যদি বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে, সেখান থেকে ভাইরাস সংক্রমণ হতে পারে।


এমপক্স আক্রান্ত হলে সবাইকে তা জানাতে হবে। বিনা প্রয়োজনে যেন কেউ আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে না আসে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। চিকিৎসক বা অন্য কেউ রোগীর সংস্পর্শে আসলে অবশ্যই গ্লাভস ও মাস্ক পরতে হবে এবং যথাসম্ভব সুরক্ষা নিয়ে রোগীর চিকিৎসা ও সেবা দিতে হবে। আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহার করা জিনিসপত্র ও পোশাক ব্যবহার করা যাবে না।আক্রান্ত প্রাণীর সংস্পর্শে যাওয়া যাবে না। পক্স শুকিয়ে যাওয়ার পর ফুসকুড়ির আবরণ যেন যেখানে সেখানে না পড়ে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। আক্রান্ত ব্যক্তিকে পুরোপুরি সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত বাসায় থাকতে হবে। যতদিন শরীরে ফোসকার স্থানে নতুন আবরণ তৈরি না হয় ততদিন পর্যন্ত।আক্রান্ত ব্যক্তিকে মাস্ক ব্যবহার করতে হবে, শারীরিক দূরত্ব মেনে চলতে হবে। শরীরে গুটি বা ফুঁসকুড়িগুলো ঢেকে রাখতে হবে চিকিৎসকের পরামর্শে দেওয়া মলমের মাধ্যমে।রোগ সংক্রমণের হার বেশি এরকম কয়েকটি দেশে এবং যাদের রিস্ক বেশি তাদের স্মলপক্সের ভ্যাক্সিন দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। এছাড়াও ইতোমধ্যে যারা আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এসেছেন কিন্তু রোগের লক্ষণ এখনো প্রকাশ হয়নি তাদের টিকা দেওয়া যাবে। এমপক্সের বিরুদ্ধে এই টিকা ৮৫ শতাংশ সুরক্ষা দিতে সক্ষম।আমাদের দেশে সেই ভ্যাকিসন দেওয়া হবে কি না সেটি ভ্যাকসিন বিশেষজ্ঞ এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষ বিবেচনা করবেন।

সময়মতো সঠিক চিকিৎসা না হলে এবং দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পন্ন রোগী হলে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত, বিকৃত দাগ, ফোসকায় সেকেন্ডারি ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন (Secondary Bacterial Infection), ব্রঙ্কোপনিউমোনিয়া(Bronchopneumonia), শ্বাসকষ্ট (Dyspnoea), সেপটিসেমিয়া (Septicemia), মেনিনজাইটিস (Meningitis), এনকেফালাইটিস (Encephalitis) ইত্যাদি হতে পারে।

এমপক্স উদ্বেগের কারণ কতটা তা নির্ভর করে বাংলাদেশের কাছাকাছি দেশগুলোতে সংক্রমণ কেমন। যদি আশপাশের অঞ্চলে এমপক্স ছড়াতে থাকে তাহলে তা দেশের জন্য অবশ্যই উদ্বেগের কারণ হবে। বর্তমানে প্রাথমিক ঝুঁকি অবস্থায় সবাইকে সচেতন হতে হবে।বিমানবন্দর, নৌ ও স্থল বন্দরে স্ক্রিনিং চালু করতে হবে। এমপক্সের লক্ষণ আছে এমন ব্যক্তিদের পরীক্ষা করতে হবে। এমপক্স আক্রান্ত দেশ থেকে আসা ব্যক্তিদের বিষয়ে আলাদা নজর দিতে হবে। পরে তারা আক্রান্ত হলো কি না সেটা মনিটরিং করতে হবে, লক্ষণ দেখা দিলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হটলাইনে ফোন দিয়ে রোগীকে সে বিষয়ে জানাতে হবে। সারাদেশেই নজরদারি বাড়াতে হবে, হাসপাতালগুলোতে প্রস্তুতি রাখতে হবে যাতে রোগী পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

বাংলাদেশে এখনো এই রোগে আক্রান্ত কোনো রোগী শনাক্ত হয়নি। তবে পাকিস্তানে ৩ জন ব্যক্তির দেহে এ ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে এই ভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে ইতোমধ্যে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ।কোনো ব্যক্তির শরীরে এরকম কোনো রোগের লক্ষ্মণ দেখা দিলে, বিদেশে থাকাকালীন আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এলে অথবা সংক্রমিত কোনো দেশ ভ্রমণের ২১ দিনের মধ্যে এই লক্ষণ দেখা দিলে অধিদপ্তরের হটলাইন  ১৬২৬৩ এবং ১০৬৫৫ নম্বরে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।

তবে শুধু বিমান পথেই না সড়কপথ, নৌপথ এবং সব বর্ডারগুলোয় সতর্ক থাকতে হবে। কারণ এসব পথেও আক্রান্ত রোগী দেশে প্রবেশ করতে পারে। এছাড়া রেডিও, টেলিভিশন, পত্রিকা, মাইকিং, পোস্টার এবং অন্যান্য গণমাধ্যমের মাধ্যমে সর্বস্তরের মানুষকে সচেতন হতে আহ্বান জানাতে হবে।যেহেতু রোগটি নতুন তাই ভয় না পেয়ে বা আতঙ্কিত না হয়ে রোগটি সম্পর্কে সবাইকে সঠিক তথ্য জানানো, সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। 

#

পিআইডি ফিচার



-লেখক-তথ্য অফিসার পিআইডি।



সম্পর্কিত খবর

;