প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিমান দূর্ঘটনা

প্রকাশ : 24 Jul 2025
প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিমান দূর্ঘটনা

স্টাফ রিপোর্টার: ব্র্যাক, সিয়েরা লিওনে স্মল এনটারপ্রাইজ প্রোগ্রামে কর্মরত এরিয়া ম্যানেজার মুকুল বিশ্বাস তার ফেইসবুক ওয়ালে আজ ২৪ জুলাই লিখেছেন—


আমাদের ছেলে সূর্য সময় বিশ্বাস, রাজধানীর উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে ইংরেজি ভার্সনের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। দোতলার গ্রীল কাটা হলে বের হয়ে এসে সান শেডে অপেক্ষা করছে বন্ধুদের নিয়ে। সকল বন্ধুদের বের করে দিয়ে সবার শেষে সূর্য নীচ নামে। সূর্য নিজে আহত হয়েছে, ওর ডান হাত কিছুটা আগুনে ঝলসে গেছে, ফোস্কা পড়েছে, পাঁচ বন্ধু আগুনে পুড়ে মারা গেছে, তবে চার বন্ধুকে সে নিরাপদে বের করতে পেরেছে এজন্য তার কিছুটা সান্ত্বনা।


কয়েকদিন আগেই সিয়েরা লিওন থেকে ছুটিতে দেশে ফিরি। ছেলেকে আনতে গিয়ে ২১ জুলাই মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিমান দূর্ঘটনার দিন আমিও মারাত্মকভাবে আহত হয়েছি। বিমান যেখানে বিধ্বস্ত হয়েছে, আমি সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম। বারান্দায় গেটে ছাত্র শিক্ষক বেষ্টিত আমি এক শিক্ষকের সাথে কথা বলছিলাম। দুপুর ১.০০ টায় ছুটি হয়েছে, ছাত্ররা নীচে নামবে বলে ঐ শিক্ষক আমাকে নীচে যেতে বললেন। ঘড়ির কাঁটায় তখন সময় ১.১৩ মিনিট। আমি বারান্দার সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামতেই দেখি বিমান আমার দিকে ধেয়ে আসছে। মনে হলো বিমানের একটা অংশ বিচ্ছিন্ন হয়েছে। মাঝখানে একটা ফুটবলের মাঠ। আমি মূহুর্তের মধ্যে বারান্দার সিঁড়ি থেকে লাফ দিয়ে বাম দিকে পড়ে যাই, বিমান আমার ডান দিকে আছরে পড়ে। মাটি-বালির মধ্যে পড়ে কোনমতে উঠে আবার দৌড় দিই। এসবই ঘটেছে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে। পেছনে তাকিয়ে দেখি আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছে। আমার ছেলের ক্লাসরুম ছিল ঠিক আগুনের উপরে। আমার মনে হচ্ছিল আমি আমার ছেলেকে আগুনে পুড়তে দেখছি অথচ আমার কিছুই করার নেই। আমার স্ত্রী শারমিন সাথী, মাইলস্টোন কলেজের জীববিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক। সে কলেজ বিল্ডিংয়ে ছিল। পরে দুই তিন মিনিটের মধ্যে আমরা একসাথে হয়ে ছেলের জন্য অপেক্ষা করতে থাকি। আমার বুকের বাম পাশে শরীর দিয়ে রক্ত পড়ছে খেয়াল করি নাই। সাথী প্রথম খেয়াল করে আমি আহত।


আগুনে জ্বলছে নীচ তলা এবং দোতলা। এদিকে দোতলার গ্রীল কেটে দুই পাশে উদ্ধার কাজ শুরু হয়েছে। আমরা একপাশে ছিলাম। সবাই একে একে বের হলেও আমার ছেলে আর বের হলো না। আমি হতাশ হয়ে বসে আছি, এমন সময় অপরিচিত এক নম্বর থেকে সাথীর মোবাইলে ফোন আসে, সূর্য কথা বলছে। সূর্যদের তাদের উদ্ধার করে বাংলা মিডিয়ামের এক বিল্ডিংয়ে আনা হয়েছে। আমি দাঁড়াতে পারছি না, সাথী গিয়ে ছেলেকে আনলো। আমরা আমাদের ছেলেকে পেয়ে কাঁদতে লাগলাম। তারপর কোনমতে হেঁটে একটা রিকশা নিয়ে হাসপাতালে যাই। এরপর আমার নিজের উপর আর নিয়ন্ত্রণ ছিল না। আমার বুকে সেলাই হয়েছে। ডাক্তারের পরামর্শে আমরা বসায় এসেছি। অনেক অজানা বাবা মায়ের সন্তান হারানোর কষ্ট, আগুনে পুড়ে যাওয়া আহতদের কষ্ট অনুভব করছি। বিছানায় শুয়ে শুয়ে তীব্র শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রনার মধ্যেও ভাবতে বাধ্য হচ্ছি—আবাসিক এলাকায় যুদ্ধ বিমান ট্রেনিংয়ের সরকারি ভুল সিদ্ধান্তের কথা!

সম্পর্কিত খবর

;