রাসেল'স ভাইপার – আতঙ্ক নয় সচেতন হই

প্রকাশ : 28 Jun 2024
রাসেল'স ভাইপার – আতঙ্ক নয় সচেতন হই

ইমদাদ ইসলাম:

ইদানিং রাসেল'স ভাইপার নিয়ে বেশ কিছু জেলায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।সোসাল মিডিয়ায়ও বিষয়টি নিয়ে অনেকে নানাভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। ফেজবুকে রাসেল'স ভাইপার নিয়ে কিছু ভুলভাল পোস্ট এবং সংবাদ ঘুরে বেড়াচ্ছে, যা জনমনে ভুল ধারণা এবং আতঙ্কের জন্ম দিচ্ছে। যার দরুণ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পাশাপাশি মানুষও ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। অনেকে প্রচার করছেন যে সাপটি কামড় দিলে দ্রুত মানুষের মৃত্যু হয়। পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে রাসেল'স ভাইপার সাপ মেরে ফেলার প্রচারণাও চালানো হচ্ছে ফেসবুকে। অনেকে রাসেল'স ভাইপার সাপ মারার জন্য  পুরস্কার ও ঘোষণাও করছে। অনেকে বলছেন, রাসেল'স ভাইপার খুব দ্রুত বংশ বিস্তার করে। ফলে সহসা বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে এই সাপের আধিক্য মানুষের জন্য হুমকি তৈরি করবে।


আমাদের প্রথমে জানা দরকার  রাসেল'স ভাইপার কি ধরনের সাপ এবং  রাসেল’স ভাইপার নিয়ে যে মাত্রায় উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে তা কতটা যৌক্তিক? Russell’s Viper বা রাসেল'স ভাইপার এদের এমন নামকরণের কারণ হলো "স্যার প্যাট্রিক রাসেল ১৭ শতকে ভারতীয় সাবকন্টিনেন্টের রাসেল'স ভাইপারসহ অনেক সাপের সর্বপ্রথম পরিচিতি এবং বিশ্লেষণ করেছিল । তাই ১৮ শতকে সাপের ক্লাসিফিকেশনের সময় বিজ্ঞানীরা উনার নাম জুড়ে দেয় এ সাপগুলোর সাথে।"বাংলাদেশে যদিও এই সাপ চন্দ্রবোড়া বা উলুবোড়া নামে পরিচিত। শরীরের বিভিন্ন স্থানে চন্দ্রাকৃতি ছোপ ছোপ গোল দাগের জন্য এ নামকরণ হয়ে থাকতে পারে।


বাংলাদেশের প্রধান তিনটি বিষাক্ত সাপ হলো গোখরা (কোবরা), কেউটে (ক্রেইট) এবং রাসেলস ভাইপার বা চন্দ্রবোড়া।  দেশে প্রতিবছর সাপের কামড়ে চার লাখেরও বেশি মানুষ আক্রন্ত হয়, যাদের মধ্যে সাত হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়।আর এই সাত হাজারেরও বেশি মানুষের মধ্যে অর্ধেকই মারা যায় পাতি কেউটে সাপের কামড়ে। তবে সময়মত চিকিৎসা না নিলে রাসেল’স ভাইপারের কামড়েও মৃত্যু হতে পারে। পৃথিবীতে রাসেলস ভাইপারের দুটি প্রজাতি আছে।এগুলো হলো: Daboia russelii—যার বিস্তিৃতি ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কায় এবং Daboia siamensis—এর বিস্তৃতি চীন, মিয়ানমার, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ডে। অনেকে সোসাল মিডিয়ায় রাসেল'স ভাইপারকে  বিশ্বের ৫ম বিষধর সাপ হিসেবে উল্লেখ করছে।এটা মোটেও সঠিক না, এমনকি এটি সেরা ৩০ নাম্বারের মধ্যেও নেই বরং এটির অবস্থান আমাদের দেশের গোখরো বা ক্রেইটের-ওপরে।


রাসেলস ভাইপার সাধারণত গরমকালে সন্ধ্যা ও রাতে বেশি সক্রিয়, তবে শীতকালে দিনের বেলায় এরা বেশি সক্রিয় থাকে।ফসলি জমি, খোলা ঘাসযুক্ত এলাকা, ঝোপঝাড়, বনের প্রান্ত, পাথুরে টিলা, ঘন কাঁটাযুক্ত ঝোপঝাড় এবং ম্যানগ্রোভ বন ও আশপাশে এর বাস করে ।মূলত ইঁদুরজাতীয় প্রাণী, পাখি, গিরগিটি বা টিকটিকি, ব্যাঙ ও পোকামাকড় এসাপের প্রধান খাদ্য । বেশির ভাগ সাপ ডিম পাড়লেও রাসেল ভাইপার বাচ্চা দেয়। এদের প্রজননকাল মে থেকে নভেম্বর পর্যন্ত  । তবে সবচেয়ে বেশি জুন-জুলাইয়ে। স্ত্রী রাসেলস ভাইপার পেটে নিষিক্ত ডিম ধারণ করে রাখে এবং তা থেকে ৬ মাস পর ৬-৬৩টি বাচ্চা প্রসব করে। প্রাকৃতিক বা ইকোসিস্টেমের কারণে অর্ধেক বাচ্চা এমনিতেই মা-রা পড়ে, যেমন: চিল, পেঁচা, শিয়াল, বনবিড়াল, বানর, গুইসাপ, বেঁজি ইত্যাদির দ্বারা আক্রান্ত হয়ে মারা যায় । একদিকে রাসেল ভাইপারের উচ্চ প্রজনন ক্ষমতা, অন্যদিকে সাপের শত্রু বেজি, গুইসাপসহ অন্যান্য প্রাণী প্রকৃতি থেকে বিলীন হয়ে যাওয়ায় এবং ইঁদুর, ব্যাঙসহ সাপের পর্যাপ্ত খাবারের উপস্থিতি থাকায় বাড়ছে রাসেল ভাইপার। দেশে একটা সময় বিলুপ্ত বলা হলেও বরেন্দ্র অঞ্চলের বাসিন্দা এ সাপটির রাজত্ব এখন দেশের অন্তত ২৫টি জেলায়। সবচেয়ে বেশি আনাগোনা মানিকগঞ্জ, ফরিদপুর, শরীয়তপুরসহ পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার অববাহিকায়, যার ছোবলে চলতি বছর এরই মধ্যে মারা গেছে অন্তত ১০ জন, যাদের অধিকাংশই কৃষক এবং জেলে।

 

কোনো সাপ-ই তেড়ে এসে কামড়ায় না,বরং সাপেরা মানুষদের এড়িয়ে চলা পছন্দ করে। যদি এগুলোকে কোণঠাসা না করা হয় বা খুব কাছে গিয়ে বা এমন কিছু করে এগুলোকে থ্রেট ফিল না করানো হয়, তবে কখনোই এরা  কামড়াতে উদ্যত হয় না। অনেক সময় এই সাপ আক্রমনাত্মক ভঙ্গিতে হিস সাউন্ড অথবা বাইট ছুঁড়ে ভয় দেখাতে, যেটা দেখে অনেকেই ভেবে বসে যে তাড়া করছে। তাছাড়া রাসেল'স ভাইপারের বাইটের প্রায় অধিকাংশ রেকর্ড-ই হলো এগুলোর ওপর পা অথবা হাত দেয়া, নয়তো অজগর ভেবে ধরতে যাওয়া। এছাড়া রাসেল'স ভাইপার এতোটাই অলস প্রকৃতির যে মানুষ দেখে তেড়ে আসা অথবা পালানো, কোনোটিই  এরা করে না। এমনকি বাধ্য না হলে এরা নিজের জায়গা থেকেই নড়ে না, একই জায়গাতেই ৩-৪ দিনও পড়ে থাকে। তবে আক্রমণের ক্ষেত্রে এরা এত ক্ষিপ্র যে, ১ সেকেন্ডের ১৬ ভাগের ১ ভাগ সময়ে শেষ করতে পারে পুরো প্রক্রিয়া। ক্ষেপে গেলে শব্দ করে প্রচণ্ড জোরে। ঠিক যেন প্রেসার কুকারের শব্দের মতো।


রাসেল’স ভাইপার মোটেও দেশের সবচেয়ে বিষধর কিংবা প্রাণঘাতী সাপ নয়। রাসেল ভাইপারের বিষ হেমাটোটক্সিক, যার কারণে ছোবল দিলে আক্রান্ত স্থানে পঁচন ধরে। ছোবলের পাঁচ মিনিটের মধ্যে ফুলে যায় ক্ষতস্থান। এই সাপের বিষ শরীরে প্রবেশ করলে মূলত শরীরের রক্ত পাতলা হয়ে শরীরের বিভিন্ন জায়গা থেকে স্বতঃস্ফূর্ত রক্তক্ষরণ হতে পারে, কিডনি বিকল হতে পারে, স্নায়ু অবশ হয়ে ফুসফুসের কার্যকারিতা হারিয়ে যেতে পারে এমনকি হার্ট অ্যাটাকও হতে পারে। এটি দংশনে সঠিক সময়ে চিকিৎসা শুরু না করতে পারলে অঙ্গহানি এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে, তাই কালক্ষেপণ না করে যতো দ্রুত সম্ভব এন্টিভেনম সমৃদ্ধ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য পৌছুতে হবে। রাসেল'স ভাইপারের কামড়ে সুস্থতার হার প্রায় ৭০% এর মতো, যদি সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা নেওয়া যায় তাহলে সুস্থতার হার ৯০% এর চেয়ে বেশি হয় ।তথ্যানুসারে শুধু হাসাপাতালে দেরিতে যাওয়া, ওঝার কাছে গিয়ে সময় নষ্ট করা এবং ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী না চলা বা কনসাল্টের মধ্যে না থাকার কারণেই রোগী মারা যায়।

রাসেলস ভাইপার নিয়ে আমাদের করণীয় কী? ঘাসের ঝোপ ও ঝোপঝাড়ে যেতে হলে প্রথমে ৫-১০ ফুট লাঠি বা বাঁশ দিয়ে নাড়াচাড়া করে তারপর সেখানে যেতে হবে। পরনে গামবুট ও জিনসের প্যান্ট থাকা ভালো। ফসলি জমিতে কাজ করা বা ফসল কাটার সময় একই পোশাক পরা যেতে পারে। রাতে চলাচলের সময় টর্চলাইট ব্যবহার করতে হবে।শোবার ঘরে বস্তায় ফসল রাখা যাবে না। কারণ, সেখানে পোকামাকড়, টিকটিকি ও ইঁদুর ফসল খেতে আসতে পারে এবং এদের খেতেও সাপ আসতে পারে। একই কারণে রাতের খাবারের উচ্ছিষ্টাংশও খোলা রান্নাঘরে বা উঠানে রাখা যাবে না। রাসেলস ভাইপার উপদ্রুত এলাকা, বিশেষ করে পদ্মা নদী অববাহিকা অঞ্চলের সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করা। স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও মসজিদের ইমাম, মোয়াজ্জিনসহ অন্যদের মধ্যেও রাসেলস ভাইপার সম্বন্ধে সচেতনতা সৃষ্টি করা। রাসেলস ভাইপার বা অন্য কোনো সাপ কামড়ালে আক্রান্ত ব্যক্তিকে যত দ্রুত সম্ভব নিকটস্থ উপজেলা বা জেলা হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।


সরকারি পর্যায়ে ইতিমধ্যে রাসেলস ভাইপার উপদ্রুত এলাকার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অ্যান্টিভেনম অর্থাৎ ওষুধ  সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে। রাসেলস ভাইপার কামড়ালে করণীয়, এ ব্যাপারে উপজেলা পর্যায়ের ডাক্তারদের পরামর্শ ও অ্যান্টিভেনম প্রয়োগের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এক ডোজ অ্যান্টিভেনম প্রয়োগ করে প্রয়োজনে নিকটস্থ জেলা সরকারি হাসপাতালে উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রেরণ করার উপদেশও দেওয়া হয়েছে। যার সুফল ইতিমধ্যে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাওয়া গেছে।জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অধীনস্ত তথ্য অধিদফতর, গণযোগাযোগ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতারসহ অন্যান্ন প্রতিষ্ঠান ব্যাপক প্রচার কার্যক্রম অব্যহত রেখেছে।


ভয় বা আতঙ্ক নয়, সচেতনাতার মাধ্যমে রাসেলস ভাইপারের আক্রমণ থেকে নিজেকে,পরিবারের সদস্যদের এবং প্রতিবেশিদের রক্ষা করতে হবে।আর যেন না ঘটে কোণ অনাকাঙ্খিত মৃত্যু,তাই সবাইকে সচেতন হতে হবে।

#

পিআইডি ফিচার


সম্পর্কিত খবর

;