জুলাই সনদ বাস্তবায়নে কাজ চলছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

প্রকাশ : 13 Oct 2026
জুলাই সনদ বাস্তবায়নে কাজ চলছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

স্টাফ রিপোর্টার: সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের এখতিয়ার সুনির্দিষ্ট করা, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার সংস্কার, সংসদে উচ্চকক্ষ গঠন এবং রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির কিছু বিষয় মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সংবিধান বিশেষজ্ঞরা।


মঙ্গলবার(১৪ অক্টোবর) জাতীয় সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সপ্তম বৈঠকে এসব প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। বৈঠকে বিভিন্ন পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, অধ্যাপক এবং সংবিধান বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন। বৈঠক শেষে জাতীয় সংসদের মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত তুলে ধরেন কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।


সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ঐকমত্যের ভিত্তিতে গৃহীত জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সরকার কাজ করছে। এই কাজে সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন। তিনি বিরোধী দলকে সংবিধান সংস্কার কার্যক্রমে অংশগ্রহণের আহ্বান জানান।


কমিটি সূত্রে জানা গেছে, বৈঠকে সংবিধান সংশোধন, জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়ন এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আলোচনায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষাবিদদের অনেকে লিখিত মতামত জমা দিয়েছেন এবং বাকিদের আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে লিখিত প্রস্তাব জমা দিতে অনুরোধ জানানো হয়েছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সংবিধানের ব্যাখ্যা এবং মৌলিক কাঠামো সংক্রান্ত বিষয়ে বিচার বিভাগের ক্ষমতার সীমা সাংবিধানিকভাবে নির্ধারণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন আলোচকরা।


স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বৈঠকটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। রাষ্ট্রের একটি অঙ্গ যাতে অন্য অঙ্গের কাজে হস্তক্ষেপ করতে না পারে তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বজায় রেখে তার এখতিয়ারও স্পষ্ট করা প্রয়োজন, যাতে সংবিধানের ব্যাখ্যার মাধ্যমে এমন কিছু না হয় যা জনপ্রত্যাশার পরিপন্থী। তিনি আরও জানান, ভবিষ্যতে সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়ায় নমনীয়তা ও স্থিতিশীলতার ভারসাম্য, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার বাইরে বিকল্প পদ্ধতি, সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ এবং পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বিলুপ্ত বিষয়গুলো নিয়েও খোলামেলা আলোচনা হয়েছে।


বৈঠকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ও এর গঠনপ্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হলেও সুনির্দিষ্ট কোনো প্রস্তাব চূড়ান্ত হয়নি। তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের শেষ বিকল্প হিসেবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়ার বিধানটি বিলুপ্ত করার পক্ষে মত দিয়েছেন শিক্ষাবিদরা। এ বিষয়ে কমিটির সভাপতি জানান, জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়নের সময়ও রাষ্ট্রপতির ভূমিকা বাদ দেওয়ার বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছিল। আগের বিকল্পগুলোতে সমঝোতা না হলে সর্বশেষ পথ হিসেবে বিচার বিভাগের কোনো প্রতিনিধি বা অন্য কাউকে যুক্ত করার সুযোগ রাখা যায় কি না তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।


বৈঠকে এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রকাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সংসদে দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট ব্যবস্থা বা উচ্চকক্ষ গঠনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা হয়। উচ্চকক্ষে কোন কোন শ্রেণি, পেশা বা এলাকার প্রতিনিধিত্ব থাকবে, প্রতিনিধিরা কীভাবে নির্বাচিত হবেন, জেলাভিত্তিক প্রতিনিধিত্ব থাকবে কি না এবং আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা রাখা যায় কি না এসব বিষয়ে শিক্ষাবিদরা মতামত দেন। এছাড়া সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে জনগণের সার্বভৌমত্বের বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করার প্রস্তাব আসে। রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির যে বিষয়গুলো বর্তমানে আদালতের মাধ্যমে বাস্তবায়নযোগ্য নয়, সেগুলোকে রাষ্ট্রের আর্থিক ও সামর্থ্য অনুযায়ী মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত করে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।


সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ায় বিরোধী দলের অনুপস্থিতি প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়ন হয়েছে ঐকমত্য কমিশনের আলোচনার মাধ্যমে। তৎকালীন কমিশনের সহ-সভাপতি ছিলেন অধ্যাপক আলী রীয়াজ এবং সভাপতি ছিলেন সাবেক প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। আমরা সেই জুলাই সনদ বাস্তবায়নেই কাজ করছি।


তিনি বলেন, আমরা কমিটিতে প্রতিনিধি দেওয়ার জন্য বারবার আহ্বান জানিয়েছি। প্রতিটি বৈঠকে তাঁদের নাম দেওয়ার অনুরোধ করছি। তারা এলে স্বাগত জানানো হবে। সরকার ও বিরোধী দল মিলে সমঝোতার ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধন করতে চায়। তবে বিরোধী দল না এলেও জাতির প্রত্যাশা পূরণ ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া থেমে থাকবে না।


বৈঠকে কমিটির সদস্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নূরুল হকসহ অন্য সদস্যরা।


আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে অংশ নেন জাতীয় অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এস এম এ ফায়েজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম, বুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম একরামুল হক, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ, অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান, অধ্যাপক গীতিআরা নাসরিনসহ বিশিষ্ট শিক্ষাবিদরা।


সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়াকে আরও সমৃদ্ধ করতে আগামী ২৪ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির প্রতিনিধি এবং বিশিষ্ট সংবিধান বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে দিনব্যাপী আলোচনার প্রাথমিক পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

সম্পর্কিত খবর

;