এ্যাম্বুলেন্সের সামনে অসহায়ত্ব

প্রকাশ : 03 Sep 2024
এ্যাম্বুলেন্সের সামনে অসহায়ত্ব


খন্দকার দেলোয়ার জালালী:

এ্যাম্বুলেন্স। পরিবারের ভয়াবহ দুঃসময়ের গুরুত্বপূর্ণ বাহন। জীবনের সর্বশেষ যানবাহন হিসেবেও এ্যাম্বুলেন্স অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আর এ কারণেই, রাজপথে এ্যাম্বুলেন্সের ছুটে চলায় আইনের বিধি নিষেধ নেই। শুধু সাধারণ মানুষ নয়, ভিআইপিরাও এ্যাম্বুলেন্সের চলাচলে কখনোই বিঘœ সৃষ্টি করে না। ট্রাফিক সদস্য বা সার্জনরা এ্যাম্বুলেন্সকে সব সময় অগ্রাধিকার দিয়ে সড়কের শৃংখলা রক্ষা করেন। 


এ্যাস্বুলেন্স নামের এই যানবাহন কি সাধারণ মানুষের সেবায় নিয়োজিত ? নাকি বিপদের মাত্রা দেখে হায়েনার মত আচরণ করে এ্যাম্বুলেন্সের মালিক ও ড্রাইভার ? মানুষের চরম বিপদে দেশের মানুষ এ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস থেকে কেমন আচরণ পায় তা দেখার কেউ কি আছে ? গভীর রাতে এ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস কতটা জনবান্ধব ?


গেলা রাতের কথা (২ সেপ্টেম্বর ২০২৪ দিবাগত)। রাত দেড়টায় এক বন্ধুর ফোন থেকে কল এলো। বন্ধুটি একজন বড় মাপের সরকারি কর্মকর্তা। অপর প্রাপ্ত থেকে বললো, “ভাইয়া খুব অসুস্থ। তাকে আমরা হৃদরোগ ইনষ্টিটিউটে নিয়ে যাচ্ছি। ভাইয়া, আপনাকে জানাতে বলেছেন।” 


যথাসম্ভব দ্রæততার সাথে হৃদরোগ ইনষ্টিটিউটে পৌঁছেছি। সরকারি হাসপাতালে রোগীর ভর্তি হয়েছে, কিন্তু সিট নেই। হাসপাতালের মেঝেতেও জায়গা নেই। দায়িত্বরতরা জানালেন, সকালে তারা স্যারের জন্য কেবিন দিতে পারবেন। পরিবারের পক্ষ থেকে সিদ্ধন্ত হলো, রোগীকে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনে নেয়া হবে। 


রাত আড়াইটা। হৃদরোগ ইনষ্টিটিউটের সামনে অনেকগুলো এ্যাম্বুলেন্স। মরদেহবাহী গাড়িও আছে অনেকগুলো। হৃদরোগ ইনষ্টিটিউট থেকে মিরপুরের ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনে যেতে ড্রাইভার ভাড়া হেকেছেন আড়াই হাজার টাকা। পরে আলাপ-আলোচনায় দেড় হাজারে দফারফা হয়েছে। 


ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনে অসাধারণ চিকিৎসা। রোগীকে তাৎক্ষনিক চিকিৎসা দিয়েছেন জরুরি বিভাগে। রোগী ও স্বজনরা দারুণ খুশি। দুঃসংবাদ হচ্ছে, সেখানেও কোন বেড খালি নেই। মুমুর্ষ রোগীর জন্য তখন উন্নত চিকিৎসার জন্য একটি বেড খুবই জরুররি হয়ে পড়েছে। পরিবারের সিদ্ধান্ত হলো, রোগীকে ইউনাইটেড হাসপাতালে নেয়া হবে। 


রাত সাড়ে ৩টা। মিপুরপুর ২ সার্কেলে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের সামনে এ্যাম্বুলেন্স ও মরদেহ বহনের জন্য অসংখ্য গাড়ি। হার্ট ফাউন্ডেশনের একজন কর্মী জানালেন, “আমাদের নিজস্ব এ্যাস্বুলেন্স আছে। ড্রাইভারের সাথে আলাপ করুন।” সুমন নামে একজন ড্রাইভার ঘুম থেকে উঠে এসে বলললেন, মিরপুরের হার্ট ফাউন্ডেশন থেকে গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতালে যেতে “আড়াই হাজার টাকা লাগবে”। আমরা অনুরোধের সুরে ভাড়া একটু কমাতে বললাম। ঘুমের চোখে রেগে গেলেন ড্রাইভার। “ভাড়া কম পেলে সেই এ্যাম্বুলেন্স ভাড়া নিন।” এটা বলে সে রাজ্যের বিরক্তি প্রকাশ করে আবারও ঘুমাতে চলে গেলো। 


রোগীর স্বজনরা ততক্ষণে রাস্তার দু’পাশে সারি সারি এ্যাম্বুলেন্সের ড্্রাইভারদের সাথে ভাড়া নিয়ে কথা বলছেন। রাস্তার পাশের এ্যাম্বুলেন্সের ড্রাইভাররা আরো বেপরোয়া। তারা মিরপুর থেকে গুলশান পর্যন্ত ভাড়া হেকেছেন সর্বনি¤œ সাড়ে ৩ হাজার টাকা। আমাদের পাশেই এক রোগীকে ফেনী নিয়ে যাওয়ার জন্য এ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করছে একটি পরিবার। তখন ড্রাইভার ঢাকা টু ফেনী ভাড়া চেয়েছেন ৬ হাজার টাকা। অথচ, মিরপুর থেকে গুলশানে ৩ হাজার টাকার নিচে যেতে রাজী হচ্ছে না।   


এক সরকারি কর্মকর্তার অসুস্থতায়, এ্যাম্বুলেন্সের সামনে শিক্ষিত ও সচেতন পরিবারের অসহায়ত্ব দেখেছি। যাদের এত টাকা নেই তাদের কী অবস্থা হয় ? যারা অসচেতন তাদের অবস্থা কেমন ? যারা ঢাকার বাইরে থেকে চিকিৎসার জন্য আসেন তাদের অবস্থা কেমন হয় ?    


আমার মনে হচ্ছে... সবার আগে এ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস সংস্কার জরুরি। রোগীদের অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে যে সকল এ্যাম্বুলেন্স মালিক বা ড্রাইভার অতিরিক্ত টাকা কামানোর ধান্দা করে, তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়ার এখনই সময়।


-লেখক: সাংবাদিক ও জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান এর প্রেস সেক্রেটারি। 

ঢাকা, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৪।

সম্পর্কিত খবর

;