আত্ম গোপনে থেকেও পদ বাণিজ্যে আওয়ামী লীগ নেতারা!

প্রকাশ : 29 Oct 2026
আত্ম গোপনে থেকেও পদ বাণিজ্যে আওয়ামী লীগ নেতারা!


স্টাফ রিপোর্টার: কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের কমিটি পুনর্গঠন এবং পদ-পদবি বণ্টন নিয়ে বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে আত্মগোপনে থাকা নেতাদের বিরুদ্ধে। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ও উত্তরের শীর্ষ নেতা ও তাদের সন্তানদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন পদ বঞ্চিত সক্রিয় নেতাকর্মীরা। এছাড়াও পটুয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, সিরাজগঞ্জ জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগ কমিটি গঠনে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। 

জানা গেছে, অতি সম্প্রতি ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের আওতাধীন ঢাকা-৫ আসনের ডেমরা ও যাত্রাবাড়ী থানার আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। ডেমরা কমিটি গঠন নিয়ে বির্তক সবচেয়ে বেশি। আহ্বায়ক করা হয়েছে ডেমরা থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও স্বতন্ত্র এমপি মশিউর রহমান মোল্লা সজলকে। সদস্য সচিব করা হয়েছে নেহেরিন মোস্তফা দিশিকে। দিশি বাসা যাত্রাবাড়ীতে। এছাড়াও দিশি এর আগে কখনো থানা-ওয়ার্ড কমিটিতে কোন পদ পদবীতে ছিলেন না। অভিযোগ রয়েছে, দক্ষিণের সভাপতি আবু আহমেদ মান্নাফীকে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে এই পদ নিয়েছেন নেহেরিন মোস্তফা দিশি। অথচ ডেমরা থানায় দক্ষ সংগঠক ও ত্যাগী নেতাকর্মীরা ছিলেন সদস্য সচিব করার মতো। অভিযোগ রয়েছে, মান্নাফীর ছেলে ইমতিয়াজ আহমেদ গৌরবকে হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাঠিয়ে এ পদ নেওয়া হয়েছে। গৌরব বর্তমানে কলকাতায় বসবাস করছেন। তাঁর বাসাতেই দক্ষিণ আওয়ামী লীগের নেতারা বসেন বলে কলকাতা সূত্রে জানা গেছে। ৬৮ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক করা হয়েছে মাহমুদুল হাসান পলিনকে। ৫ আগস্টের আগে ও পরে পলিনের রাজপথে সক্রিয় কোন ভুমিকা না থাকায় দলীয় নেতাকর্মীরা হতাশ হয়েছে। পলিন মান্নাফীর ব্লকে রাজনীতি করতেন বলে জানা গেছে। এখানেও মোটা অংকের অর্থ লেনদেন হয়েছে বলে নেতাকর্মীরা জানান। ৭০ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য সচিব করা হয়েছে মামুনকে। আগেও মামুন নিস্ক্রিয় ছিল, এখনো নিস্ক্রিয়। জানা গেছে, মামুনকে পদ দিতে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মোর্শেদ কামাল ও প্রচার সম্পাদক চৌধুরী সাইফুন নবী সাগরের প্রস্তাবে তাকে পদ দেওয়া হয়েছে। 

কলকাতার একটি সূত্র জানায়, মান্নাফী  তার পছন্দের লোককে কমিটিতে রাখতে এবং বাণিজ্য ‘জায়েজ’ করতে মহানগরের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মোর্শেদ কামাল, সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম সরোয়ার কবির ও প্রচার সম্পাদক চৌধুরী সাইফুন নবী সাগরকে ব্যবহার করছেন। 

৪৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য সচিব জুয়েলকে পদে বসাতে মান্নাফী কলকাতায় যেদিন কমিটি চুড়ান্ত হয় সেদিন অন্যদের সঙ্গে রাগারাগিও করেছেন। ৬৫ নম্বর ওয়ার্ডে আহ্বায়ক আল আমিন মোল্লা চরম বির্তকিত লোক। সংগঠনেও নিস্কিয়। ৬২ নম্বর ওয়ার্ডে আহ্বায়ক আবদুর রহমান রতনের ভাইয়েরা বিএনপির সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। ৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগের পক্ষে কোন মিছিল-মিটিং করতে দেখা যায়নি রতনকে। সভাপতি মান্নাফীর লোক হিসেবে পরিচিত। তাকে আহ্বায়ক করা নিয়ে গৌরব সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে তর্কাতর্কিতেও লিপ্ত হয়েছিলেন অভিযোগ রয়েছে। কলকাতার সূত্রটি জানায়, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের নেতারা ঢাকা-৪, ঢাকা-৬, ঢাকা-৮ আসনের থানা-ওয়ার্ডের কমিটি চুড়ান্ত করে রেখেছেন। যে কোন সময়ে ঘোষণা দেবেন। এ সব কমিটির প্রস্তাবিত নামেও যাদের শীর্ষ পদে রাখা হয়েছে তাদের কাছ থেকে মোটা অংকের নিয়েছেন গৌরব। বিশেষ করে শাহবাগ থানা কমিটিতে বির্তকিত ব্যক্তি জিএম আতিককে আবারও শীর্ষ পদে রাখা হয়েছে। ঢাকা-৫ আসনে বির্তকিতদের ঠাই হওয়ায় কমিটি গঠন প্রক্রিয়া বন্ধ রাখতে দলীয় সভানেত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। শুধু ঢাকা মহানগর দক্ষিণই নয়, ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগও পিছিয়ে নেই পদ বাণিজ্যে। সম্প্রতি ঢাকা-১৩ ও ঢাকা-১৪ আসনে থানা ও ওয়ার্ডের কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। সেখানেও বির্তকিত ও নিস্ক্রিয়দের পদ দেওয়া হয়েছে অর্থের বিনিময়ে। অভিযোগ রয়েছে উত্তরের সভাপতি শেখ বজলুর রহমান ও সাংগঠনিক সম্পাদক আজিজুল হক রানা এই কমিটি বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত। পদ পেতে হলে রানার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতে হয়। রানা খুশি হলেই সেই নাম সভাপতি প্রস্তাব ও সমর্থন করে কমিটিতে ওঠে। 

পদ প্রত্যাশী নেতারা জানিয়েছেন, তারা হামলা-মামলায় জর্জরিত। বাড়িতে ঘুমাতে পারেন না। তারপরও বির্তকিত ব্যক্তি যাদের ৫ আগস্টের পর দলের জন নূন্যতম অর্জন নেই তারা কমিটিতে আসছে। এই নেতৃত্ব দিয়ে আগামীতে মাঠে নামানো যাবে না। ঢাকা মহানগরের পাশাপাশি পিছিয়ে নেই তৃণমূলও। কার্যক্রম নিষিদ্ধ মির্জাগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে এ নিয়ে ক্ষোভ ও বিতর্ক দেখা দিয়েছে। একই অবস্থা নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের কমিটি নিয়েও অভিযোগ উছে। গত ১০ অক্টোবর ঘোষিত নিষিদ্ধ জেলা ছাত্রলীগের ৮১৬ সদস্যের কমিটিতে স্থান পাওয়া ব্যক্তিদের পরিচয় ও যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নেতাকর্মীরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজনের দাবি, কমিটিতে পদ পেতে পাঁচ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে। কমিটিতে বিবাহিত ব্যক্তি, প্রবাসী ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের অন্তর্ভুক্তি নিয়েও সমালোচনা রয়েছে। তবে পদ বাণিজ্যের অভিযোগ অস্বীকার করে নিষিদ্ধ সংগঠন জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, অভিযোগ পাওয়া ব্যক্তিদের কমিটি থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে।

এদিকে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ মির্জাগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের সভাপতি গাজী আতাহার উদ্দিন আহমেদের পরিবর্তে সহ-সভাপতি রুস্তম আলী মোল্লাকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করার সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। গত ১৬ অক্টোবর জেলা আওয়ামী লীগের ভার্চুয়াল বর্ধিত সভায় বিষয়টি চূড়ান্ত হয়নি বলে কয়েকজন নেতা দাবি করলেও জেলা সাধারণ সম্পাদক ভিপি আবদুল মান্নান দাবি করেন, সভায় সর্বসম্মতিক্রমে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। গত ১৯ অক্টোবর দায়িত্ব পরিবর্তনের চিঠি প্রকাশ্যে আসার পর বিতর্ক আরও বাড়ে। গাজী আতাহার উদ্দিন ফেসবুক লাইভে এসে বলেন, ১৯ অক্টোবর আদালতে হাজিরা দিতে গিয়ে তিনি দায়িত্ব পরিবর্তনের বিষয়টি জানতে পারেন। তিনি সিদ্ধান্তটিকে অগণতান্ত্রিক ও নিয়মবহির্ভূত দাবি করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

কার্যক্রম নিষিদ্ধ উপজেলা আওয়ামী লীগের এক সদস্যের অভিযোগ, রুস্তম আলী মোল্লাকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করার পেছনে চার লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে আবদুল মান্নান বলেন, প্রায় আড়াই বছর ধরে গাজী আতাহার উদ্দিন দলীয় কার্যক্রমে সম্পৃক্ত ছিলেন না। তার অসুস্থতা এবং চার সহসভাপতির মৃত্যুর কারণে সাংগঠনিক কার্যক্রম সচল রাখতে সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দায়িত্ব পরিবর্তন করা হয়েছে। এদিকে সিরাজগঞ্জ জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের কমিটিতে কারণ দর্শানো নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। তাড়াশ ও রায়গঞ্জ উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের কমিটি গঠনে আর্থিক লেনদেনের কারণে এই দুই উপজেলার কমিটি ভেঙ্গে দেয় কেন্দ্র স্বেচ্ছাসেবক লীগ। একই সঙ্গে  জেলা কমিটি কেন বাতিল করা হবে মর্মে কারণ দর্শানো নোটিশ দেওয়া হয়।

সম্পর্কিত খবর

;