মো: ইকবাল হোসেন: বাংলা ভাষার লিখনপ্রণালী ও প্রকাশরীতির সুষ্ঠতার জন্য নিজস্ব বানানরীতি অপরিহার্য। প্রাচীনকালে লিপিকারেরা ইচ্ছামতো বানান ব্যবহার করায় বাংলা বানানে ভিন্নতা দেখা দেয়। উনিশ শতকে বাংলা ভাষার লিখিত রূপে তৎসম শব্দগুলোর সংস্কৃত ব্যাকরণের নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত ও স্থিতিশীল হলেও অন্য শব্দে নৈরাজ্য চলতে থাকে।
প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা পুথিতে যেসব বাংলা বানানবিধি ব্যবহার করা হতো তার সর্বজনবোধ্য মোটামুটি একটা রূপ ঠিকই ছিল। কিন্তু এর কোনো সুনির্দিষ্ট মান্য রূপ ছিল না।
মানোএল দা আসসুম্পসাউ কর্তৃক রচিত "Vocabulario em idioms Bengala e Partuguez, dividedo em duas parts" ১৭৪৩ খ্রিষ্টাব্দে পর্তুগালের রাজধানী লিসবন শহর থেকে প্রকাশিত হয়। এটি রোমান হরফে লেখা একটি পর্তুগিজ-বাংলা শব্দকোষ। এই বইটিতে স্বাভাবিকভাবে বাংলা বানানের কোনো নমুনা পাওয়া যায় না।
১৭৭৮ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত ন্যাথানিয়েল ব্র্যাসি হ্যালহেডের "A Grammar of the Bengal Language" গ্রন্থে বাংলা বর্ণের মুদ্রিত রূপ ব্যবহৃত হয়েছিল। কিন্তু বাংলা বানানের কোনো নিয়মরীতি উল্লেখ করা হয়নি।
রাজা রামমোহন রায় ১৮২৬ সালে ইংরেজিতে লেখেন “Bengali Grammar in the English Language” এবং পরে ১৮৩৩ এটি বাংলা ভাষায় অনুবাদ করে নাম দেন "গৌড়ীয় ব্যাকরণ"। এই গ্রন্থে তিনি বাংলা ভাষার ব্যাকরণিক গঠন, বাক্যরীতি ও ধ্বনিগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করেন। তবে তিনি বাংলা বানানের নিয়ম নিয়ে কোনো আলাদা অধ্যায় বা সুসংগঠিত আলোচনা করেননি।
বাংলা বর্ণমালায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন করেছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। তাঁর "বর্ণপরিচয়" ১৮৫৫ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত হয়। বিদ্যাসাগরের পরে বাংলা বর্ণমালার সংস্কারে তেমন কেউই যত্নবান হননি। তিনিও বাংলা বানানের নিয়মে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেননি।
এই যখন বাংলা বানানের নিয়মাবলি প্রণয়ন ও সংস্করণের নাজুক অবস্থা। ঠিক তখনই নড়েচড়ে বসলেন বিখ্যাত সাহিত্যিকরা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উদ্যোগে ১৯৩৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বানান সংস্কার কমিটি গঠিত হয় এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে ১৯৩৬ সালে ‘বাংলা বানানের নিয়ম’ প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি (১৯৮৭) ও বাংলাদেশের এনসিটিবি (১৯৮৮) পাঠ্যপুস্তকের বাংলা বানান সংস্কারে উদ্যোগ নেয়। অবশেষে বাংলা একাডেমি ১৯৯২ সালে ‘প্রমিত বাংলা বানানরীতি’ প্রকাশ করে। যার মাধ্যমে বাংলা বানানে ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের জন্য বাংলা একাডেমি প্রণীত বাংলা বানানের গুরুত্বপূর্ণ কিছু নিয়মাবলি নিচে তুলে ধরা হলো-
➤ বাংলা একাডেমি প্রণীত বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত তৎসম শব্দের বানানের ৫টি নিয়ম নিম্নরূপ:
১। প্রমিত বাংলা বানানের নিয়মে বর্ণিত ব্যতিক্রম ছাড়া তৎসম বা সংস্কৃত শব্দের নির্দিষ্ট বানান অপরিবর্তিত থাকবে। যেমন: পক্ষী, আকাঙ্ক্ষা, শৃঙ্খলা ইত্যাদি।
২। যেসব তৎসম শব্দের বানানে ই ঈ বা উ ঊ উভয় শুদ্ধ। কেবল সেসব শব্দে ই বা উ এবং তার কারচিহ্ন (ি, ু) হবে। যেমন: কিংবদন্তি, পদবি, রচনাবলি, শ্রেণি ইত্যাদি।
৩। তৎসম শব্দের বানানে রেফের পর ব্যঞ্জনবর্ণের দ্বিত্ব হবে না। যেমন: কর্ম্ম, কার্য্য, সূর্য্য ইত্যাদির পরিবর্তে যথাক্রমে কর্ম, কার্য, সূর্য ইত্যাদি হবে।
৪। সন্ধির ক্ষেত্রে ক খ গ ঘ পরে থাকলে পূর্ব পদের অন্তস্থিত ম্ স্থানে অনুস্বার (ং) হবে। যেমন: অহম্ + কার = অহংকার, এভাবে ভয়ংকর, সংগীত, সংঘটন ইত্যাদি।
৫। সংস্কৃত ইন্-প্রত্যয়ান্ত শব্দের দীর্ঘ ঈ-কারান্ত রূপ সমাসবদ্ধ হলে সংস্কৃত ব্যাকরণের নিয়ম-অনুযায়ী সেগুলোতে হ্রস্ব ই-কার হয়। যেমন: গুণী> গুণিজন, প্রাণী> প্রাণিবিদ্যা, মন্ত্রী> মন্ত্রিপরিষদ ইত্যাদি।
➤ বাংলা একাডেমি প্রণীত বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত অতৎসম শব্দের বানানের ৫টি নিয়ম নিম্নরূপ:
১। সকল অতৎসম অর্থাৎ তদ্ভব, দেশি, বিদেশি, মিশ্র শব্দে কেবল ই এবং উ এবং এদের কারচিহ্ন (ি, ু) ব্যবহৃত হবে। যেমন: আরবি, ইংরেজি, ইরানি, জাপানি ইত্যাদি।
২। শব্দের শেষে প্রাসঙ্গিক ক্ষেত্রে সাধারণভাবে অনুস্বার (ং) ব্যবহৃত হবে। যেমন: গাং, ঢং, রং, সং। তবে অনুস্বারের সঙ্গে স্বর যুক্ত হলে ঙ হবে। যেমন: বাঙালি, ভাঙা, রঙিন ইত্যাদি। উল্লেখ্য বাংলা ও বাংলাদেশ শব্দে অনুস্বার থাকবে।
৩। অতৎসম শব্দের বানানে ক্ষ এর পরিবর্তে খ ব্যবহৃত হবে। যেমন: খিদে, খুর, খেত ইত্যাদি।
৪। অতৎসম শব্দের বানান ঊর্ধ্ব-কমা যথাসম্ভব বর্জন করতে হবে। যেমন: বলে, হয়ে, দুজন ইত্যাদি।
৫। হস্ চিহ্ন যথাসম্ভব বর্জিত হবে। যেমন: টক, টাক, শখ, বক ইত্যাদি।
এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কিছু বানান শুদ্ধকরণ নিচে উল্লেখ করা হলো-
অশুদ্ধ বানান➤শুদ্ধ বানান
অপেক্ষামান - অপেক্ষমাণ
অধ্যায়ন - অধ্যয়ন
অত্যান্ত - অত্যন্ত
অহরাত্রি - অহোরাত্র
অধ্যাবসায় - অধ্যবসায়
অনুসূয়া - অনসূয়া
অপরাহ্ন - অপরাহ্ণ
আশাঢ় - আষাঢ়
আকাংখা - আকাঙ্ক্ষা
আইনজীবি - আইনজীবী
আদ্যান্ত - আদ্যন্ত
আমাবস্যা - অমাবস্যা
আবিস্কার - আবিষ্কার
ইতিপূর্বে - ইত:পূর্বে
ইতিমধ্যে - ইতোমধ্যে
উপরোক্ত - উপর্যুক্ত/ উপরিউক্ত
উপযোগীতা - উপযোগিতা
উচ্ছাস - উচ্ছ্বাস
উদীচি - উদীচী
ঐক্যতান - ঐকতান
ঐক্যমত - ঐকমত্য
ঔজ্জল্য - ঔজ্জ্বল্য
কর্মজীবি - কর্মজীবী
কথোপোকথন - কথোপকথন
কার্য্যালয় - কার্যালয়
কিংবদন্তী - কিংবদন্তি
কুপমন্ডুক - কূপমণ্ডূক
কুজ্জটিকা - কুজ্ঝটিকা
ক্ষতীগ্রস্ত - ক্ষতিগ্রস্ত
গ্রামীন - গ্রামীণ
গ্রন্থাবলী - গ্রন্থাবলি
গীতাঞ্জলী - গীতাঞ্জলি
চতুস্কোন - চতুষ্কোণ
জাজল্যমান - জাজ্বল্যমান
জীবীকা - জীবিকা
জৈষ্ট্য - জৈষ্ঠ্য
টুর্নামেন্ট - টুনার্মেন্ট
ডাষ্টবিন - ডাস্টবিন
দায়ীত্ব - দায়িত্ব
দূর্দম - দুর্দম
দ্বন্দ - দ্বন্দ্ব
দন্ডবিদি - দণ্ডবিধি
দারিদ্রতা - দরিদ্রতা/ দারিদ্র্য
দূরাবস্থা - দুরবস্থা
দিবারাত্রি - দিবারাত্র
দৌরাত্ম - দৌরাত্ম্য
দুর্বিসহ - দুর্বিষহ
নমষ্কার - নমস্কার
ননদী - ননদি
নুপুর - নূপুর
নুন্যতম - ন্যূনতম
নিশিথিনি - নিশীথিনী
প্রবাহমান - প্রবহমান
পল্লীগ্রাম - পল্লিগ্রাম
পরিস্কার - পরিষ্কার
পরজীবি - পরজীবী
প্রতিযোগীতা - প্রতিযোগিতা
প্রাণীবিদ্যা - প্রাণিবিদ্যা
পিপিলিকা - পিপীলিকা
পোষ্টমাষ্টার - পোস্টমাস্টার
পানিনি - পাণিনি
পুরষ্কার - পুরস্কার
প্রতিদ্বন্দিন্তা - প্রতিদ্বন্দ্বিতা
প্রাণী জগৎ - প্রাণি জগৎ
পৈত্রিক - পৈতৃক
প্রাত:ভ্রমণ - প্রাতর্ভ্রমণ
প্রনয়িণী - প্রণয়িনী
প্রত্নতাত্তিক - প্রত্নতাত্ত্বিক
প্রতিদন্দি - প্রতিদ্বন্দ্বী
ফটোষ্ট্যাট - ফটোস্ট্যাট
বয়:জেষ্ঠ্য - বয়োজ্যেষ্ঠ
ব্রাহ্মন - ব্রাহ্মণ
ব্যাতিত - ব্যতীত
বুদ্ধিজীবি - বুদ্ধিজীবী
বহি:স্কার - বহিষ্কার
বিভিষন - বিভীষণ
বিভিসিকা - বিভীষিকা
বিদুষি - বিদুষী
বাল্মিকি - বাল্মীকি
বাংগালী - বাঙালি
বুৎপত্তি - ব্যুপত্তি
বিনাপানি - বীণাপানি
বৈয়াকরণিক - বৈয়াকরণ
ভূবণ - ভুবন
ভৌগলিক - ভৌগোলিক
ভ্রাতুস্পুত্র - ভ্রাতুষ্পুত্র
মনকষ্ট - মন:কষ্ট
মনযোগ - মনোযোগ
মুহুর্ত - মুহূর্ত
মুমর্ষু - মুমূর্ষু
মনিষা - মনীষী
মরীচীকা - মরীচিকা
মুকস্ত - মুখস্থ
মন্ত্রীসভা - মন্ত্রিসভা
মনোপুত - মন:পূত
মন্ত্রীত্ব - মন্ত্রিত্ব
মুহুর্মুহু - মুহুর্মুহু
মুর্চ্ছনা - মূর্ছনা
মহত্ব - মহত্ত্ব
রেজিষ্ট্রার - রেজিস্ট্রার
রেজিষ্ট্রেশন - রেজিস্ট্রেশন
লজ্জাস্কর - লজ্জাকর
সরনার্থী - শরণার্থী
শান্ত্বনা - সান্ত্বনা
শ্রেণী - শ্রেণি
শশ্রুষা - শুশ্রূষা
শিরচ্ছেদ - শিরশ্ছেদ
শিরোমনি - শিরোমণি
শ্বাশুড়ি - শাশুড়ি
শ্বাস-প্রসাস - শ্বাস-প্রশ্বাস
শ্রমজীবি - শ্রমজীবী
শ্রোতস্বিনি - স্রোতস্বিনি
শ্বাশত - শাশ্বত
ষাম্মাসিক - ষাণ্মাসিক
ষ্টেডিয়াম - স্টেডিয়াম
সমীচিন - সমীচীন
সন্যাসী - সন্ন্যাসী
স্বত্ত্বাধিকারী - স্বত্বাধিকারী
স্বস্ত্রীক - সস্ত্রীক
সহযোগীতা - সহযোগী
সায়াহ্ণ - সায়াহ্ন
সুষ্ঠ - সুষ্ঠু
স্বরস্বতী - সরস্বতী
সর্বশ্বান্ত - সর্বস্বান্ত
স্বামীগৃহ - স্বামিগৃহ
সাতন্ত্র - স্বাতন্ত্র্য
সম্বর্ধনা - সংবর্ধনা
স্নেহাশীষ - স্নেহাশিস
স্বায়ত্বশাসন - স্বায়ত্তশাসন
স্বত্ত্বা - সত্তা
শুচীপত্র - সূচিপত্র
হীনমন্যতা - হীনম্মন্যতা
-লেখক: প্রভাষক, ক্যামব্রিয়ান কলেজ, ঢাকা।
তারানা চৌধুরী:২০১৮ সালের অক্টোবর মাস। এক শুক্রবার রাতে মামার বাসায় দাওয়াত খেয়ে বাড়ি ফেরেন মুনিয়া (ছদ্মনাম)। তখনো সব স্বাভাবিক। কিন্তু পরদিন সকাল থেকেই হঠাৎ প্রচণ্ড জ্বর আর মাথাব্যথা শুরু হয়। বুঝতে দের ...
রাহাদ সুমন: বরিশালের বানারীপাড়ার আমৃত্যু সংগ্রামী শতবর্ষী নারী মায়া রাণী দাস। যেন কবি জসিম উদ্দিনের কবিতার "কঙ্কাল সার" দেহের সেই আসমানীর প্রতিরূপ। শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত জীবিকার সন্ধানে কঙ্কালসার ...
মোঃ মাহফুজুর রহমান:একটা সময় ছিল গ্রামের অনেক কৃষক সাদা কাগজে টিপসই দিয়ে ভিটেমাটি হারিয়ে পথের ফকির হয়ে যেত । আবার অনেকে ঋণ না নিয়েও ঋণের ফাঁদে পড়তো । কারণ তারা ছিল নিরক্ষর । মানুষের অজ্ঞতার সুযোগকে কাজ ...
এ এম ইমদাদুল ইসলাম:তরুণ বয়সে যে হাত লাঙল ধরেছিল, বার্ধক্যেও সেই হাতেই এখন ধরা থাকে একটি প্লাস্টিকের কার্ড। দেখতে সাধারণ, কিন্তু এর ভেতরে জমা আছে এক কৃষকের পরিচয়, তার জমির হিসাব, প্রাপ্য ভর্তুকি এবং ভব ...
সব মন্তব্য
No Comments