জমে উঠেছে কোরবানির হাট: ঢাকায় ২৬টি, সারাদেশে প্রস্তুত কোটি পশু

প্রকাশ : 23 May 2026
জমে উঠেছে কোরবানির হাট: ঢাকায় ২৬টি, সারাদেশে প্রস্তুত কোটি পশু

রফিকুল ইসলাম সুজন: পবিত্র ঈদুল আজহা সামনে রেখে রাজধানীসহ সারাদেশে কোরবানির পশুর হাট জমে উঠেছে। এবার ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় মোট ২৬টি হাটে কোরবানির পশু বিক্রি হবে। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ১৩টি এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ১৩টি হাট বসছে। দক্ষিণে সারুলিয়া স্থায়ী হাটের পাশাপাশি ১২টি অস্থায়ী হাট এবং উত্তরে গাবতলী স্থায়ী হাটের পাশাপাশি ১২টি অস্থায়ী হাট বসবে। হাটগুলোতে ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে গরু-ছাগল আসতে শুরু করেছে এবং গাবতলী হাটের প্রস্তুতি প্রায় শেষ। 


বিক্রি শুরুর প্রথম দিকেই ক্রেতাদের ভিড় বাড়ছে। তবে হাট এখনো পুরোপুরি জমেনি। অনেকেই আগেভাগে গরু দেখতে আসছেন, কিনছেন কম। খামারিরা জানিয়েছেন, খাদ্য, শ্রমিক ও পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় এবার গরুর দাম কিছুটা বেশি। গাবতলী হাটে আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত দামের গরু উঠেছে। 


ক্রেতা-বিক্রেতাদের নিরাপত্তায় এবার কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে প্রশাসন। ঢাকা মহানগর পুলিশ জানিয়েছে, প্রতিটি হাটে অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প, সিসিটিভি নজরদারি, সাদা পোশাকে পুলিশ ও গোয়েন্দা টহল থাকবে। জাল টাকা শনাক্তে বিশেষ মেশিন রাখা হচ্ছে এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা জোরদার করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, রাস্তাঘাটে কোরবানির পশু আনা-নেওয়ার সময় চাঁদাবাজি হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর ব্যবস্থা নেবে। মহাসড়ক ও রেললাইনের ওপর কোনো হাট বসতে দেওয়া হবে না এবং নির্ধারিত স্থানের বাইরে হাট বসালে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার জানিয়েছেন, চাঁদাবাজদের চিহ্নিত করে ইতিমধ্যে কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং এবার কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। 


স্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রতিটি বড় হাটে একাধিক ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম রাখা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষার সনদ ছাড়া কোনো পশু হাটে তোলা যাবে না। দুই সিটি করপোরেশন আলো, পানি, স্যানিটেশন ও দ্রুত বর্জ্য অপসারণে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করছে। পাশাপাশি অনলাইনে পশু কেনাবেচা জনপ্রিয় হচ্ছে। অনলাইনে কিনলে কোনো হাসিল দিতে হয় না। 


ছাগলের হাটের অবস্থাও জমজমাট। খামারিরা ছোট ও মাঝারি আকারের ছাগলের সরবরাহ বাড়িয়েছেন। বাজারে ছোট গরুর পাশাপাশি ছাগলের চাহিদাও বেশি। দোয়ারাবাজারে খামারিরা জানান, ৭০-৭৫ হাজার টাকার মধ্যে ছোট গরু ও ছাগলের চাহিদা বেশি, তবে বড় গরুর ক্রেতা কম। ফেনী জেলায় এবার ১৩ হাজার ২২৯টি ছাগল কোরবানির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। যশোরে প্রস্তুত করা ১ লাখ ১৭ হাজার ৯৯৭টি পশুর মধ্যে ৮১ হাজার ২৭৬টি ছাগল রয়েছে। 


উটের হাটের বিষয়ে এখন পর্যন্ত রাজধানী বা বিভাগীয় শহরগুলোতে আলাদা করে উটের হাট বসার তথ্য পাওয়া যায়নি। সাধারণত গরু, ছাগল, মহিষ ও ভেড়াই হাটগুলোতে বেশি উঠছে। ফেনীতে এবার ১ হাজার ৭৩৫টি মহিষ ও ৩ হাজার ৯১৯টি ভেড়া প্রস্তুত আছে। 


সারাদেশে এবার কোরবানির পশুর সংখ্যা চাহিদার চেয়ে বেশি। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী জানিয়েছেন, এবার দেশীয় পশু দিয়েই কোরবানি হবে। সারাদেশে ১ কোটির বেশি পশু প্রস্তুত রয়েছে এবং লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে সরবরাহ বেশি। জেলা ভিত্তিক তথ্যে ফেনীতে ৯০ হাজার ৪৫২টি পশু প্রস্তুত, যা চাহিদার চেয়ে ৭ হাজার ৯২৭টি বেশি। এর মধ্যে গরু ৭১ হাজার ৫৬৯টি, ছাগল ১৩ হাজার ২২৯টি। যশোরে প্রস্তুত ১ লাখ ১৭ হাজার ৯৯৭টি পশু, চাহিদা ১ লাখ ৩ হাজার ১২৮টি। সেখানে ২৮ হাজার ৮৪৪টি ষাঁড়, ৬ হাজার ৪৫৮টি গাভী, ৮১ হাজার ২৭৬টি ছাগল ও ৪৪২টি ভেড়া রয়েছে। খুলনা বিভাগে এবার ১৭০টি কোরবানির হাট বসছে এবং পশুর স্বাস্থ্য দেখতে ১৪২টি পশুচিকিৎসা দল নিয়োজিত থাকবে। বিভাগীয় শহরগুলোর বাইরে গুরুত্বপূর্ণ হাটের মধ্যে কুমিল্লার রাজনগর হাটে সাড়ে তিন থেকে চার হাজার গরু উঠেছে এবং সবই দেশি গরু। সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজারে ১০-১৫টি স্থায়ী-অস্থায়ী হাট বসেছে। 


ভারত থেকে পশু আসার বিষয়ে সরকার কঠোর অবস্থানে আছে। প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী জানিয়েছেন, এবার সরকার কোনো পশু আমদানি করবে না এবং সীমান্ত দিয়ে চোরাচালান ঠেকাতে বর্ডার গার্ডসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে কুমিল্লা সীমান্তের পাঁচটি পয়েন্ট দিয়ে চোরাকারবারিরা গরু আনছে বলে খবর পাওয়া গেছে। তারা সীমান্তের গ্রামে দেশি গরুর সঙ্গে মিশিয়ে পরে হাটে বিক্রি করছে। সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার ও পঞ্চগড়ের রাজনগর হাটের খামারিরা জানিয়েছেন, ভারতীয় গরুর কারণে দেশি গরুর দাম ও চাহিদায় প্রভাব পড়ছে এবং তারা লোকসানের আশঙ্কা করছেন। 


সারাদেশে কত টাকার বেচাকেনা হতে পারে তার সুনির্দিষ্ট সরকারি হিসাব এখনো প্রকাশ হয়নি। তবে চাহিদার চেয়ে সরবরাহ বেশি থাকায় খামারিরা দাম নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন। গত বছর যশোরে ৪০০-৪৫০ টাকা কেজি দরে গরু বিক্রি করে অনেকের লোকসান হয়েছিল। এবার খাদ্য ও পরিবহন খরচ বাড়ায় দাম কিছুটা বেশি চাইছেন বিক্রেতারা। 


সম্পর্কিত খবর

;