তেল আড়ালে কি কেবলই সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ?

টার্গেট মাদুরো, লক্ষ্য ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদ

প্রকাশ : 04 Jan 2026
টার্গেট মাদুরো, লক্ষ্য ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদ


এম এইচ নাহিদ।। ২ জানুয়ারি, স্থানীয় সময় গভীর রাত। ভেনেজুয়েলার আকাশে মার্কিন যুদ্ধবিমানের টহল। ভোরের আলো ফোটার আগেই একের পর এক বিমান হামলায় কেঁপে ওঠে রাজধানী কারাকাসের মার্টি। সকালে বিশ্ববাসী স্তম্ভিত হয়ে জানতে পারে, দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে তাদের শয়নকক্ষ থেকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন এই অপহরণের কথা স্বীকার করে দাবি করেছে, মার্কিন আইনেই তাদের বিচার হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, মাদুরো বিশ্বের অন্যতম মাদক পাচারকারী এবং তিনি ‘ত্রেন দে আরাগুয়া’ নামক একটি সন্ত্রাসী সংগঠনকে মদদ দিচ্ছেন। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছেএকটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশে সামরিক অভিযান চালিয়ে প্রেসিডেন্টকে তুলে নিয়ে যাওয়ার অধিকার কি যুক্তরাষ্ট্রের আছে?

তাছাড়া, ভেনেজুয়েলার জলসীমায় বেশ কয়েকটি জাহাজে হামলা চালিয়ে শতাধিক মানুষকে হত্যা করার পরও কোনো মাদক উদ্ধার করতে পারেনি মার্কিন বাহিনী। বরং মাদুরো সরকার একাধিক মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়ে প্রমাণ করেছে যে ভেনেজুয়েলা মাদক পাচারকারী দেশ নয়। প্রকৃতপক্ষে, কোকেনের প্রধান উৎপাদনকারী দেশ কলম্বিয়া, যেখান থেকে ভিন্ন পথে মাদক যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছায়।

মাদকবিরোধী বিশেষজ্ঞরা বলছেন ভিন্ন কথা। মার্কিন ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (ডিইএ) ২০২০ সালের প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানো কোকেনের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ আসে প্রশান্ত মহাসাগরীয় পথে; ক্যারিবিয়ান রুট দিয়ে আসে অতি সামান্য অংশ।

ট্রাম্প দাবি করেছেন, লক্ষ্যবস্তু করা নৌকাগুলোতে ফেন্টানিলের স্তূপ রয়েছে এবং তিনি ফেন্টানিলকে ‘গণবিধ্বংসী রাসায়নিক অস্ত্র’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। অথচ বাস্তবতা হলো, ফেন্টানিল মূলত মেক্সিকোতে উৎপাদিত হয় এবং তা স্থলপথে দক্ষিণ সীমান্ত দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ঢোকে। ডিইএ-এর ২০২৫ সালের ‘ন্যাশনাল ড্রাগ থ্রেট অ্যাসেসমেন্ট’ রিপোর্টেও যুক্তরাষ্ট্রে পাচার হওয়া ফেন্টানিলের উৎস হিসেবে ভেনেজুয়েলার নাম উল্লেখ নেই। সুতরাং মাদকের এই অভিযোগ কেবলই একটি অজুহাত মাত্র।

বিশ্লেষকদের মতে, মাদুরোকে সরানোর মূল লক্ষ্য ভেনেজুয়েলার বিশাল তেল সম্পদের দখল নেওয়া, চীন-রাশিয়ার বলয়কে দুর্বল করা এবং ল্যাটিন আমেরিকায় নিরঙ্কুশ আধিপত্য বিস্তার। মার্কিন জ্বালানি সংস্থা ইআইএ-এর মতে, ভেনেজুয়েলায় ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের মজুত রয়েছে, যা বিশ্বের মোট মজুতের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ এবং ইরাকের চেয়েও বেশি।

বাজার বিশ্লেষক ফিল ফ্লিন স্পষ্টভাবেই বলেছেন, ভেনেজুয়েলায় মার্কিন অনুকূলে একটি সরকার থাকলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ বাড়িয়ে দাম নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হতো। এছাড়া ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারলে চীন ও রাশিয়ার অর্থনীতিকেও চাপে রাখা সম্ভব।

বিশ্বজুড়ে নিন্দার ঝড়: এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে চীন বলেছে, “অবিলম্বে মাদুরোর মুক্তি ও সরকার উৎখাত বন্ধ করতে হবে।” রাশিয়া একে ‘বিশ্বাসযোগ্য যুক্তিহীন হামলা’ বলেছে। ইরান একে ‘সার্বভৌমত্বের স্পষ্ট লঙ্ঘন’ এবং ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভা একে ‘সীমা লঙ্ঘন’ বলে অভিহিত করেছেন। কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো এবং চিলির গ্যাব্রিয়েল বোরিকও এই সামরিক পদক্ষেপের কড়া সমালোচনা করেছেন।

পুরনো ষড়যন্ত্রের নতুন রূপ মাদুরোকে ক্ষমতা থেকে সরাতে মার্কিন ষড়যন্ত্র দীর্ঘদিনের। তাকে ধরার জন্য আগে ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল, যা ২০২৫ সালে বাড়িয়ে ৫ কোটি ডলার করা হয়। অবরোধ দিয়েও কাজ না হওয়ায় অবশেষে ‘ডেল্টা ফোর্স’ পাঠিয়ে তাকে আটক করা হলো। মার্কিন প্রশাসনের অভিযোগ-মাদুরো তার দেশের জেল খালি করে অপরাধীদের অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকিয়ে দিচ্ছেন। তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন, এটি মাদুরো সরকারকে পতনের মাধ্যমে কিউবার কমিউনিস্ট সরকারকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করা এবং পুরো ল্যাটিন আমেরিকায় মার্কিনবিরোধী শক্তির মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার একটি মাস্টারপ্ল্যান।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্বনেতাদের নিন্দা ও তথ্যের অসংগতি প্রমাণ করে যে নিকোলাস মাদুরো কোনো অপরাধী নন, বরং তিনি একটি সুপরিকল্পিত সাম্রাজ্যবাদী টার্গেটের শিকার।

 

সম্পর্কিত খবর

;