জুলাইয়ে সড়কে ঝরল ৪১৬ প্রাণ

প্রকাশ : 07 Aug 2026
জুলাইয়ে সড়কে ঝরল ৪১৬ প্রাণ

স্টাফ রিপোর্টার: বাংলাদেশে চলতি বছরের জুলাই মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ৪১৬ জন নিহত এবং ৬২৯ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি ছিলেন মোটরসাইকেল আরোহী ও পথচারী। এক মাসে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৩৮ জন এবং পথচারী হিসেবে ১০৬ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা দেশের সড়ক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আবারও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান স্বাক্ষরিত মাসিক প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। প্রতিবেদনটি ৯টি জাতীয় দৈনিক, ১৭টি জাতীয় ও আঞ্চলিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল, বিভিন্ন ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম এবং সংস্থাটির নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে।


প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাই মাসে সারা দেশে মোট ৪৫৮টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। এসব দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে ৫৭ জন নারী ও ৪৮ জন শিশু রয়েছেন। এছাড়া ৫১ জন চালক ও পরিবহন সহকারী নিহত হয়েছেন, যা মোট মৃত্যুর ১২ দশমিক ২৫ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, পেশাদার চালকদের মৃত্যুর এই হার দেশের পরিবহন ব্যবস্থায় নিরাপত্তা সংকটেরই ইঙ্গিত বহন করে।


দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চালকের নিয়ন্ত্রণ হারানোই ছিল প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার প্রধান কারণ। মোট ১৬৪টি দুর্ঘটনা ঘটেছে নিয়ন্ত্রণ হারানোর কারণে, যা মোট দুর্ঘটনার ৩৫ দশমিক ৮০ শতাংশ। এছাড়া ১২৩টি মুখোমুখি সংঘর্ষ, ১০৮টি পথচারীকে চাপা বা ধাক্কা দেওয়ার ঘটনা, ৫৪টি পেছন থেকে ধাক্কা এবং ৯টি অন্যান্য কারণে সংঘটিত হয়েছে। সড়ক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, অতিরিক্ত গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, ক্লান্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো এবং ট্রাফিক আইন অমান্য করার প্রবণতা এসব দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।


যানবাহনভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত যানবাহনের মধ্যে মোটরসাইকেলের সংখ্যা ছিল সর্বোচ্চ ১৭২টি। এছাড়া বাস ১২৪টি, ট্রাক ৯২টি, থ্রি-হুইলার ১৩১টি এবং স্থানীয়ভাবে তৈরি বিভিন্ন যানবাহন ৫২টি দুর্ঘটনায় জড়িত ছিল। সব মিলিয়ে জুলাই মাসের সড়ক দুর্ঘটনায় ৭১১টি যানবাহন সম্পৃক্ত ছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, মোটরসাইকেলের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, নিরাপত্তা সরঞ্জাম না মানা এবং তরুণ চালকদের ঝুঁকিপূর্ণ চালানোর প্রবণতা মৃত্যুহার বাড়িয়ে দিচ্ছে।


বিভাগভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঢাকা বিভাগেই সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটেছে। এ বিভাগে ১৩৩টি দুর্ঘটনায় ১২৫ জন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে বরিশাল বিভাগে সবচেয়ে কম ২৮টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ২৪ জন। রাজধানী ঢাকায় পৃথকভাবে ৩৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১৮ জন নিহত এবং ৪৭ জন আহত হয়েছেন।


সড়কের ধরন অনুযায়ী, জাতীয় মহাসড়কে ১৬৯টি, আঞ্চলিক সড়কে ১৫৫টি, গ্রামীণ সড়কে ৬১টি এবং শহরের সড়কে ৬৬টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া অন্যান্য স্থানে আরও ৭টি দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। এতে স্পষ্ট যে, জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়ক এখনও সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে রয়ে গেছে।


পেশাভিত্তিক নিহতদের তালিকায় রয়েছেন ৫৩ জন শিক্ষার্থী, ২৩ জন রাজনৈতিক কর্মী, ২৭ জন স্থানীয় ব্যবসায়ী, ১৬ জন এনজিও কর্মী, ১৪ জন ব্যাংক ও বিমা কর্মকর্তা, ৭ জন শিক্ষক, ৩ জন সাংবাদিক, ২ জন চিকিৎসক, ২ জন প্রকৌশলী এবং ৩ জন আইনজীবী। এতে বোঝা যায়, সড়ক দুর্ঘটনা সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য সমান হুমকি হয়ে উঠেছে।


সড়ক দুর্ঘটনার পাশাপাশি জুলাই মাসে দেশে ১৩টি নৌ-দুর্ঘটনায় ৯ জন নিহত ও ১১ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া ২৯টি রেল দুর্ঘটনায় ২৪ জন নিহত এবং ১৮ জন আহত হয়েছেন। ফলে এক মাসে সড়ক, নৌ ও রেল—তিন ধরনের পরিবহন দুর্ঘটনায় মোট ৪৪৯ জনের প্রাণহানি ঘটেছে।


রোড সেফটি ফাউন্ডেশন বলছে, দেশের সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে কার্যকর ট্রাফিক আইন প্রয়োগ, ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল বন্ধ, দক্ষ চালক তৈরি, মোটরসাইকেল চলাচলে কঠোর নজরদারি, পথচারীদের নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা এবং মহাসড়কে ঝুঁকিপূর্ণ যান চলাচল নিয়ন্ত্রণে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। সংস্থাটির মতে, এসব বিষয়ে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা না হলে সড়কে প্রাণহানির সংখ্যা কমিয়ে আনা কঠিন হবে।

সম্পর্কিত খবর

;