প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়া ও চীন যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

প্রকাশ : 20 Jun 2026
প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়া ও চীন যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

বিশেষ প্রতিনিধি: বাংলাদেশের একাদশ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের চার মাসের মাথায় প্রথম বিদেশ সফরে যাচ্ছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আগামীকাল রোববার, ২১ জুন তিনি মালয়েশিয়ার উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করবেন। এরপর সোমবার, ২২ জুন চীনের উদ্দেশে রওনা হবেন তিনি।


মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণে এই সফরকে ঘিরে দেশ-বিদেশে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে মালয়েশিয়ায় বসবাসরত প্রায় ১২ লাখ বাংলাদেশি প্রবাসী এই সফরের দিকে তাকিয়ে আছেন।


সরকারি সূত্র জানায়, শ্রমবাজার সম্প্রসারণ, বাণিজ্য বৃদ্ধি, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা জোরদার করাই এ সফরের মূল লক্ষ্য। সফরকালে দুই দেশের মধ্যে দুটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) এবং দুটি ‘নোট অব এক্সচেঞ্জ’ সই হওয়ার কথা রয়েছে।


সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে একান্ত বৈঠক করবেন। পরে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। বৈঠকে নতুন বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ, সিন্ডিকেটমুক্ত কর্মী প্রেরণ ব্যবস্থা চালু, অনিয়মিত কর্মীদের বৈধ করার সুযোগ সৃষ্টি, আসিয়ানে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুতে মালয়েশিয়ার সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হবে।


মালয়েশিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষা, গবেষণা সহযোগিতা, শিক্ষার্থী বিনিময় কর্মসূচি ও বৃত্তির সুযোগ বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছেন। ব্যবসায়ী মহল হালাল শিল্প, প্রযুক্তি, কৃষি ও উৎপাদন খাতে নতুন বিনিয়োগ ও যৌথ উদ্যোগের আশা করছে।


মালয়েশিয়া সফর শেষে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের আমন্ত্রণে চীন সফরে যাবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম জানিয়েছেন, এ সফরে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ১৩টি সমঝোতা স্মারক, দুটি চুক্তি, একটি অ্যাকশন প্ল্যান এবং একটি প্রটোকলসহ মোট ১৫ থেকে ১৭টি দ্বিপাক্ষিক দলিল স্বাক্ষরিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বহুল আলোচিত তিস্তা প্রকল্পও আলোচ্যসূচিতে থাকবে।


আগামী ২৫ জুন চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করবেন তারেক রহমান। ২৬ জুন তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন।


সফরের অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী লিয়াওনিং প্রদেশের দালিয়ানে অনুষ্ঠিতব্য ‘নিউ চ্যাম্পিয়নস’-এর ১৭তম বার্ষিক সম্মেলনে (সামার দাভোস ফোরাম) অংশ নেবেন। ‘ইনোভেটিং অ্যাট স্কেল’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত এ সম্মেলনে বিশ্বের ৯০টিরও বেশি দেশ ও অঞ্চলের প্রায় ১,৭০০ প্রতিনিধি অংশ নেবেন। বৈশ্বিক অর্থনীতি, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং উদ্ভাবননির্ভর প্রবৃদ্ধি নিয়ে আলোচনা হবে।


সরকারি সূত্রে জানা গেছে, দুই সফরেই প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধি দল তুলনামূলক ছোট রাখা হয়েছে। সফরসঙ্গীর সংখ্যা ২৭ থেকে ২৮ জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ। আগামী শুক্রবার রাতে তাঁর দেশে ফেরার কথা রয়েছে।


প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম বিদেশ সফরের গন্তব্য হিসেবে মালয়েশিয়াকে বেছে নেওয়ার পেছনে একটি আবেগঘন দিকও রয়েছে। তারেক রহমানের ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকো ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি মালয়েশিয়ায় মৃত্যুবরণ করেন। সেই মালয়েশিয়াতেই আজ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথমবার রাষ্ট্রীয় সফরে যাচ্ছেন তিনি।


প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে শনিবার রাতে কুয়ালালামপুরের বুকিট বিনতাংয়ের একটি রেস্টুরেন্টে জরুরি সংবাদ সম্মেলন করে মালয়েশিয়া বিএনপি। এতে বাংলাদেশ থেকে আগত গণমাধ্যমকর্মী ছাড়াও স্থানীয় সাংবাদিকেরা উপস্থিত ছিলেন। বক্তব্য দেন মালয়েশিয়া বিএনপির সভাপতি বাদলুর রহমান খান, সাধারণ সম্পাদক মোশাররফ হোসেন, সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুব আলম শাহ, মির্জা সালাউদ্দিন, যুবদলের সভাপতি জসিম উদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক রমজান আলী, স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি এসএম রহমান তনু প্রমুখ।


১৯৮৮ সালে বগুড়ার গাবতলী থানা বিএনপির প্রাথমিক সদস্যপদ গ্রহণের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিক রাজনীতি শুরু করেন তারেক রহমান। ২০০২ সালে তিনি বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এবং ২০০৯ সালে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।


এক-এগারোর প্রেক্ষাপটে ২০০৭ সালের ৭ মার্চ গ্রেপ্তার হওয়ার পর প্রায় ১৮ মাস কারাবন্দি ছিলেন। মুক্তির পর চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান এবং দীর্ঘ ১৭ বছরের বেশি সময় প্রবাসে কাটান। গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর তিনি দেশে ফেরেন।


বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর গত ৯ জানুয়ারি দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন তারেক রহমান। পরে ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় এবং ১৭ ফেব্রুয়ারি তিনি দেশের একাদশ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।


রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মালয়েশিয়া ও চীন সফরের মাধ্যমে আঞ্চলিক কূটনীতি, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং বহুমাত্রিক আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন বার্তা দিতে চাইছে বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জন্য এটি তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।


সম্পর্কিত খবর

;