উত্তপ্ত মধ্যপ্রাচ্য

হরমুজ প্রণালীতে ট্যাংকারে হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলা

প্রকাশ : 08 Jul 2026
হরমুজ প্রণালীতে ট্যাংকারে হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: হরমুজ প্রণালীতে তিনটি বাণিজ্যিক ট্যাংকারে হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সামরিক সংঘাত শুরু হয়েছে। গত মঙ্গলবার রাতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে ‘শক্তিশালী’ ধারাবাহিক হামলা শুরু করে। অন্যদিকে বুধবার ভোরে বাহরাইন ও কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে পাল্টা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। এই পাল্টাপাল্টি হামলায় দুই দেশের মধ্যে চলমান ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।


যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাওয়ার সময় তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার জবাবে ইরানের ৮০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। সেন্টকমের বিবৃতিতে বলা হয়, “বেসামরিক নাবিকদের নিয়ে আন্তর্জাতিক জলপথে চলা বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার জন্য ইরানকে ভারী মূল্য দিতে হবে”। লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিল ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, উপকূলীয় নজরদারি কেন্দ্র, সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল, জাহাজ-বিধ্বংসী ক্রুজ মিসাইল সাইট, ড্রোন উৎক্ষেপণ কেন্দ্র এবং বন্দর স্থাপনা। মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, ইরানের খার্গ দ্বীপ, কেশম দ্বীপ, সিরিক ও বন্দর আব্বাসে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। খার্গ দ্বীপ থেকে ইরান তাদের ৯০% অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করে। 


হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল বিক্রির ওপর দেওয়া সাময়িক নিষেধাজ্ঞা ছাড়ও বাতিল করেছে। গত জুনে দেওয়া ওই লাইসেন্সের আওতায় ২১ আগস্ট পর্যন্ত ইরান তেল উৎপাদন ও বিক্রি করতে পারত। হোয়াইট হাউস জানায়, প্রণালীতে ইরানের পদক্ষেপ ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’ এবং এর পরিণতি ভোগ করতে হবে। 


ইরানের পাল্টা জবাব আসতে দেরি হয়নি। আইআরজিসি বুধবার দাবি করে, তারা বাহরাইনের বন্দর সালমান, পঞ্চম নৌ-অঞ্চল এবং কুয়েতের আলি আল সালেম বিমান ঘাঁটিতে অবস্থিত ৮৫টি মার্কিন সামরিক স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। কুয়েতি সেনাবাহিনী জানায়, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘শত্রু’ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মোকাবিলা করছে। বাহরাইন ও কুয়েতে বিমান হামলার সাইরেন বাজানো হয়। 


বিবিসি নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালীতে তিনটি কার্গো জাহাজে হামলার পর ইরানের প্রধান আলোচক বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতির ‘স্পষ্ট লঙ্ঘনের’ কারণে প্রণালীটি পুনরায় খুলে দেওয়া ‘সম্ভব নয়’। তিনি মার্কিন নৌ-অবরোধ ও ইসরায়েলের ‘যুদ্ধংদেহী’ আচরণকে ‘লঙ্ঘন’ হিসেবে উল্লেখ করেন। বিবিসি আরও জানায়, হামলার শিকার তিনটি জাহাজের মধ্যে দুটিকে ‘পরিদর্শনের’ জন্য আটক করেছে আইআরজিসি নৌবাহিনী। 


এই সংঘাতের সূত্রপাত হয় সোম ও মঙ্গলবার। ব্রিটিশ মেরিটাইম নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও জানায়, অজ্ঞাত প্রজেক্টাইলের আঘাতে একটি ট্যাংকারে আগুন ধরে যায়। এরপর আরও দুটি জাহাজে হামলা হয়, যার অন্তত একটিতে ড্রোন আঘাত হানে। কাতার জানায়, তাদের এলএনজি ট্যাংকার ‘আল-রেকাইয়াত’ হামলার শিকার হয়েছে এবং এ জন্য ইরানকে দায়ী করে দোহায় ইরানের উপ-রাষ্ট্রদূতকে তলব করে। 


ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটে বলেন, যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের পর ইরানের ওপর মার্কিন হামলা ‘একেবারেই প্রয়োজনীয়’ ছিল। ইরানের যৌথ সামরিক কমান্ড খাতাম আল-আনবিয়া যুক্তরাষ্ট্রের হামলাকে ‘স্পষ্ট আগ্রাসন’ আখ্যা দিয়ে ‘চূর্ণবিচূর্ণ জবাবের’ হুমকি দিয়েছে। 


বিশ্লেষকরা বলছেন, গত ফেব্রুয়ারি থেকে চলা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরান আক্রমণ এবং ইরানের পাল্টা হামলার পর গত মাসে যে অন্তর্বর্তী চুক্তি হয়েছিল, তা এই ঘটনায় গুরুতর ঝুঁকিতে পড়ল। বিশ্বের মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবহন হয়। নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম ইতিমধ্যে ৫% বেড়েছে। 


সম্পর্কিত খবর

;