ফরিদপুরে জ্বালানি সংকটে সেচ ব্যাহত,উৎপাদনে অনিশ্চয়তার ছায়া

প্রকাশ : 24 Apr 2026
ফরিদপুরে জ্বালানি সংকটে সেচ ব্যাহত,উৎপাদনে অনিশ্চয়তার ছায়া

অনিক রায়, ফরিদপুর অফিস: জ্বালানি অস্থিরতার অভিঘাত এবার প্রত্যক্ষভাবে এসে পড়েছে দেশের কৃষি উৎপাদনের অন্যতম ভরকেন্দ্র ফরিদপুরে। তীব্র ডিজেল সংকটে জেলার বিস্তীর্ণ কৃষিজমিতে নেমে এসেছে কার্যত স্থবিরতা। সময়মতো সেচ দিতে না পারায় ধান, পাটসহ মৌসুমি ফসলের উৎপাদন এখন গভীর অনিশ্চয়তার মুখে।

জেলার বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে জ্বালানির অপ্রতুলতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। কোথাও ‘তেল নেই’ লেখা বোর্ড, কোথাও আবার দীর্ঘ অপেক্ষার সারি—সব মিলিয়ে সৃষ্টি হয়েছে এক ধরনের অচলাবস্থা। কৃষক, পরিবহন শ্রমিক থেকে শুরু করে সাধারণ ভোক্তা—সকলেই পড়েছেন দুর্ভোগে। কৃষক কার্ডধারীরা যেমন লাইনে দাঁড়িয়ে ডিজেল সংগ্রহ করছেন, তেমনি কার্ডবিহীন অনেক কৃষক—এমনকি নারী কৃষাণীরাও—জ্বালানি সংগ্রহে নির্ভর করছেন অনিশ্চিত সরবরাহের ওপর।


দেশের অন্যতম প্রধান পাট উৎপাদনকারী জেলা হিসেবে ফরিদপুরের কৃষি অর্থনীতি এ সময়টিতে থাকে সর্বাধিক সক্রিয়। কিন্তু চলমান মৌসুমে জ্বালানি সংকট মাঠপর্যায়ের চাষিদের দিশেহারা করে তুলেছে। কৃষি বিভাগের বরাদ্দকৃত স্লিপ থাকলেও চাহিদা অনুযায়ী তেল না পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পরও পর্যাপ্ত ডিজেল না মেলায় সেচ কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।


কৃষকদের আশঙ্কা, নির্ধারিত সময়ে জমিতে পানি না পৌঁছালে ধান ও পাটের চারা নষ্ট হয়ে যেতে পারে, যার ফলে পুরো মৌসুমের উৎপাদনে বড় ধরনের ধস নামতে পারে।


সালথা উপজেলার সোনাপুর গ্রামের কৃষক করিমুদ্দি শেখ জানান, কয়েকদিন ধরে একাধিক পাম্প ঘুরেও পর্যাপ্ত তেল পাননি। একদিন অল্প কিছু ডিজেল পেলেও তা দিয়ে সেচ দেওয়া সম্ভব হয়নি। দীর্ঘ বিরতির পর পুনরায় ধান চাষ শুরু করলেও জ্বালানি সংকটে এখন সেই প্রচেষ্টা হুমকির মুখে। তার ভাষায়, “সময়ে পানি দিতে না পারলে ফসল বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়বে—আমরা কার্যত দিশেহারা।”


একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন বোয়ালমারী উপজেলার ময়েনদিয়া গ্রামের কৃষক সুবেদার হোসেন। তিনি বলেন, স্থানীয় একটি ফিলিং স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও তেল পাওয়া অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। টোকেন নেওয়ার পরও অনেক সময় জ্বালানি মেলে না। তার আশঙ্কা, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে চাষাবাদ চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।


শুধু কৃষকই নন, বিপাকে পড়েছেন ট্রাক্টর চালক ও পরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও। অভিযোগ রয়েছে, একজন চালককে সর্বোচ্চ ১০ লিটার পর্যন্ত ডিজেল দেওয়া হচ্ছে, যা দিয়ে দীর্ঘ সময় জমি চাষ বা পরিবহন কার্যক্রম চালানো সম্ভব নয়। ফলে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনেও বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে।


এদিকে, অনিয়মিত সরবরাহের কারণে অনেক পাম্পে টোকেন পদ্ধতি চালু করা হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়িয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পাম্প থেকে তেল নেওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগের অভিযোগও উঠেছে, যা বাজার ব্যবস্থাপনায় অসন্তোষ সৃষ্টি করছে।


জেলা পেট্রোল পাম্প মালিক অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা জানিয়েছেন, জেলায় দৈনিক প্রায় আড়াই লাখ লিটার জ্বালানির চাহিদা থাকলেও ডিপো থেকে নিয়মিত সরবরাহ না থাকায় সংকট ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরবরাহ ব্যবস্থায় সমন্বয়হীনতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।


এ অবস্থায় কৃষকদের একটাই দাবি—দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করা। অন্যথায় চলতি মৌসুমে ধান ও পাট উৎপাদনে বড় ধরনের বিপর্যয় অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।


সম্পর্কিত খবর

;