ফরিদপুরের টাউন থিয়েটার: গৌরবময় অতীত, অনিশ্চিত বর্তমান

প্রকাশ : 09 Jul 2026
ফরিদপুরের টাউন থিয়েটার: গৌরবময় অতীত, অনিশ্চিত বর্তমান


অনিক রায়, ফরিদপুর অফিস: একসময় ফরিদপুরের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অন্যতম কেন্দ্র ছিল ঐতিহ্যবাহী ‘টাউন থিয়েটার’। নাট্যচর্চার পাশাপাশি পরবর্তী সময়ে এটি সিনেমা প্রদর্শনের জন্যও পরিচিতি লাভ করে। তবে সময়ের পরিবর্তন, প্রশাসনিক জটিলতা, ব্যবস্থাপনাগত সংকট এবং বিভিন্ন সিদ্ধান্তের প্রভাবে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায়।


ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ১৯১৩ সালে ফরিদপুরে একটি স্থায়ী নাট্যমঞ্চ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। সে সময় স্থানীয় সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তি, আইনজীবী ও চিকিৎসকদের অংশগ্রহণে একটি নাট্যসংগঠন গঠিত হয়। তাদের উদ্যোগে স্থানীয় জমিদার দক্ষিণারঞ্জন রায় চৌধুরী ও রমেশ চৌধুরী থিয়েটার নির্মাণের জন্য জমি দান করেন। পরবর্তীতে সদস্যদের প্রচেষ্টায় থিয়েটারের অবকাঠামো নির্মাণ সম্পন্ন হয় এবং ১৯১৫ সালে তৎকালীন ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট কে. সি. দে আনুষ্ঠানিকভাবে এর উদ্বোধন করেন। ১৯১৬ সালে এখানে নিয়মিত নাট্য মঞ্চায়ন শুরু হয়। পরে ১৯৩২ সালে এর নাম পরিবর্তন করে ‘সুরেন্দ্র মেমোরিয়াল হল’ রাখা হয়।


দেশভাগের পর এই মঞ্চে চলচ্চিত্র প্রদর্শন শুরু হয়। বিভিন্ন সময়ে হলটির নাম পরিবর্তিত হয়ে ‘মায়াহল’, ‘অরোরা’ এবং পরে ‘ছায়াবাণী’ নামে পরিচিতি পায়। সে সময় নতুন বাংলা ও কলকাতার বিভিন্ন চলচ্চিত্র এখানে প্রদর্শিত হতো এবং দর্শকদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি ছিল বলে স্থানীয় প্রবীণদের স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে।


স্বাধীনতার পরও কিছু সময় প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম অব্যাহত থাকলেও পরবর্তী সময়ে লিজসংক্রান্ত বিরোধ, আইনি প্রক্রিয়া এবং ব্যবস্থাপনা পরিবর্তনের কারণে কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দেয়। একপর্যায়ে সিনেমা প্রদর্শনের জন্য ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি সরিয়ে নেওয়া হয় এবং নিয়মিত কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। পরে নতুন নামে সিনেমা হল চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ফলে ধীরে ধীরে ঐতিহ্যবাহী এই সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটি তার পূর্বের অবস্থান হারায়।


প্রবীণ নাগরিক সুবীর ভৌমিক বলেন, “এক সময় টাউন থিয়েটার ছিল ফরিদপুরের সাংস্কৃতিক প্রাণকেন্দ্র। এখানে নাটক, সিনেমা ও নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মানুষের ব্যাপক অংশগ্রহণ ছিল। বর্তমান প্রজন্ম হয়তো সেই পরিবেশ কল্পনাও করতে পারবে না। এই ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানটি সংরক্ষণ করে আবার সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা গেলে জেলার ঐতিহ্য অনেকটাই ফিরে আসবে।”


নতুন প্রজন্মের এক শিক্ষার্থী সুফিয়ান মোরশেদ বলেন, “আমরা টাউন থিয়েটারের ইতিহাস সম্পর্কে খুব বেশি জানি না। তবে শুনেছি যে, ফরিদপুরে সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসাবে এটি একটি ছিল। এ ধরনের ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণ করা হলে নতুন প্রজন্ম নিজেদের ইতিহাস ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে পারবে এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও আরও আগ্রহী হবে।”


বর্তমানে টাউন থিয়েটারের আগের সেই সাংস্কৃতিক পরিবেশ আর নেই। একসময় যে স্থানে নাটক, চলচ্চিত্র ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজন অনুষ্ঠিত হতো, সেখানে এখন কার্যক্রম অনেকটাই সীমিত। সংস্কৃতিবিষয়ক বিভিন্ন মহলের মতে, ফরিদপুরের এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি সংরক্ষণ ও এর ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে সচেতন সমাজ মনে করেন।

সম্পর্কিত খবর

;