সেলিনা আক্তার:
শীতে শিশুর শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া, ব্রঙ্কিওলাইটিসসহ বিভিন্ন ধরনের শ্বাসতন্ত্রের রোগ দেখা দিতে পারে। নিউমোনিয়া বা ফুসফুসের প্রদাহ মারাত্মক রোগ। এ রোগ যে কোনো বয়সেই হতে পারে। তবে শিশু ও বৃদ্ধদের মধ্যে বেশি দেখা দেয়।
মানবদেহের একটি অত্যাবশ্যকীয় অঙ্গ হচ্ছে ফুসফুস। আমরা শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ ও ত্যাগ করি ফুসফুসের সাহায্যে। ফুসফুসের এক ধরনের ইনফেকশনের নাম নিউমোনিয়া। এটি সাধারণত শ্বাসতন্ত্রের প্রদাহের জন্য হয়ে থাকে। এই প্রদাহ যখন জীবাণুঘটিত বা সংক্রমণজনিত কারণে দেখা দেয় , তখন এটিকে নিউমোনিয়া বলে। এ রোগের প্রধান কারণ ঠান্ডা এবং ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক ও ভাইরাসের সংক্রমণ। নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের ফুসফুসে পুঁজ ও তরল পদার্থ জমে তাদের শ্বাস নিতে বাধা দেয় । সব সর্দি-কাশিই নিউমোনিয়া নয় । জ্বরের সঙ্গে কফ ও শ্বাসকষ্ট থাকলে শ্বাসতন্ত্রে প্রদাহ হয়েছে বলে ধরা হয় । শীতে শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তিদের মৃত্যুর অন্যতম কারণ এই নিউমোনিয়া। যেসব শিশু পুষ্টিহীনতায় ভুগছে তারা নিউমোনিয়া ও শ্বাসতন্ত্রের রোগে বেশি আক্রান্ত হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, নিউমোনিয়া শিশুদের জন্য একটি মারাত্মক প্রাণঘাতী রোগ। নিউমোনিয়াকে বলা হয় শিশুমৃত্যুর নীরব ঘাতক। এ রোগ সম্পর্কে আমাদের এখনও সচেতনতা কম। নিউমোনিয়ায় শিশুমৃত্যু রোধে সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক শিশুর মৃত্যু ঘটে নিউমোনিয়া।
আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর’বি) তথ্যমতে, এখনো প্রতি হাজার নবজাতকের মধ্যে প্রায় ৭ দশমিক ৪ জন শিশু নিউমোনিয়ায় প্রাণ হারাচ্ছে। আক্রান্তদের মারাত্মক নিউমোনিয়ায় ভোগা ৪২ শতাংশের রক্তে অক্সিজেনের ঘাটতি (হাইপক্সেমিয়া) থাকে, যা এ রোগের মৃত্যুহার বেশি হওয়ায় অন্যতম বড়ো কারণ। এই রোগের ফলে প্রতিবছর প্রায় ৭ লাখ শিশুর মৃত্যু হয় , যা পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের ক্ষেত্রে মোট মৃত্যুর ১৪ শতাংশ। প্রতি ঘণ্টায় আনুমানিক দু-তিনটি শিশু নিউমোনিয়ায় মারা যায় এবং বছরে প্রায় ২৪ হাজার শিশুর মৃত্যু হয়। এটি পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের মধ্যে ২৪ শতাংশ মৃত্যুর জন্য দায়ী। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশের এ গড় বিশ্বব্যাপী হিসাবের চেয়ে বেশি। কারণ বাংলাদেশের শিশুদের নিউমোনিয়ার কারণগুলো বৈশ্বিক পরিস্থিতি থেকে অনেকটাই আলাদা।
নিউমোনিয়ার উপসর্গগুলোর মধ্যে রয়েছে স্বাভাবিক অবস্থার চেয়ে শিশুর ঘনঘন শ্বাস নেওয়া, শ্বাস নেওয়ার সময় বুকের নিচের অংশ দেবে যাওয়া, শ্বাস নেওয়ার সময় বাঁশির মতো সাঁই-সাঁই আওয়াজ হওয়া, কণ্ঠ পরিবর্তন হওয়া, কাশি বেশি হওয়া, শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়া ও খিঁচুনি হওয়া। শূন্য থেকে দুই মাস বয়সের শিশুর প্রতি মিনিটে ৬০ বা তার চেয়ে বেশিবার শ্বাস নেওয়া, দুই থেকে ১২ মাস বয়সি শিশুর প্রতি মিনিটে ৫০ বা তার চেয়ে বেশি শ্বাস নেওয়া এবং ১২ মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সি শিশু প্রতি মিনিটে ৪০ বা তার চেয়ে বেশিবার শ্বাস নেওয়াকে অস্বাভাবিক অবস্থা বোঝায় । এ-জাতীয় লক্ষণ শিশুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
পুষ্টিহীনতাও শিশুর নিউমোনিয়া আক্রান্ত হওয়ার অন্যতম কারণ। নিউমোনিয়া প্রতিরোধে ছয় মাস বয়স পর্যন্ত শিশুকে শুধু মায়ের বুকের দুধ খাওয়াতে হবে এবং প্রতিটি শিশুকে জন্মের প্রথম ঘণ্টায় মায়ের বুকের শালদুধ খেতে দিতে হবে। এতে নিউমোনিয়াসহ ঠাণ্ডাজনিত অনেক রোগ থেকে শিশুকে রক্ষা করা সম্ভব।
যে শিশুর বয়স ছয় মাসের বেশি, তাদের যদি বুকের দুধের পাশাপাশি বাড়তি খাবার হিসেবে দেশীয় খাবার, যেমন– খিচুড়ি, দেশি ফলমূল, শাকসবজি দেওয়া হয় , তবে খাবারের মাধ্যমে শিশুর পুষ্টি ঠিক রাখা যায় । নিউমোনিয়ার কিছু ভ্যাকসিন বের হয়েছে। ভ্যাকসিনগুলো যদি সময়মতো নেওয়া যায় , তাহলে ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাসজনিত নিউমোনিয়া প্রতিরোধ করা যায় । এ ক্ষেত্রে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।সুস্থ শিশুকে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশু থেকে দূরে রাখতে হবে। প্রয়োজনে শীতের সময়টিতে শিশুকে গরম কাপড়ের পাশাপাশি মুখে মাস্ক পরাতে হবে।ধুলাবালি থেকে শিশুকে দূরে রাখতে হবে।সব সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে হবে। বাইরে থেকে এসে হাত-মুখ সাবান দিয়ে ধুয়ে ফেলা। এ ছাড়া খাবার খাওয়ার আগে অবশ্যই হাত ধুতে হবে। শীতকালে শিশুকে নিয়ে শপিংমল, সিনেমা হল এবং বাস ভ্রমণ ইত্যাদি এড়িয়ে চলা উচিত।শীতে শিশুকে নিউমোনিয়ার হাত থেকে বাঁচাতে গোসলের সময় কুসুম গরম পানি ব্যবহার করতে হবে। গোসলের সময় স্যাভলন, ডেটল বা এ ধরনের জীবাণুনাশক দেওয়া উচিত নয় । শীতে শিশুকে গোসল করানোর পর কোমল টাওয়েল দিয়ে শরীর মোছার পর অলিভ অয়েল ও ভিটামিন-ই সমৃদ্ধ তেল গায়ে মাখা যেতে পারেন। তবে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে, শরীরে ব্যবহৃত তেল বা লোশন যেন সুগন্ধি, অ্যালকোহল এবং অন্যান্য কেমিক্যালমুক্ত হয় । শীতে শিশুর ডায়াপার ঘন ঘন পরিবর্তন করতে হবে। ভেজা ডায়াপার দীর্ঘক্ষণ পরে থাকলে শিশুর অ্যালার্জির সমস্যাও হতে পারে। ঠান্ডা লেগে অনেক সময় শিশুর নাক বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে ‘নরসল নাসাল’ ড্রপ দিনে চার থেকে ছয় বার খাবার ও ঘুমের আগে দেওয়া যেতে পারে। নভেম্বর, ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে শীত বেশি থাকে বলে এ সময় নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যা অনেক বেশি হয় । তবে বছরের অন্যান্য সময়েও শিশু নিউমোনিয়া আক্রান্ত হয়ে থাকে।
নিউমোনিয়া রোগ প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ করাই উত্তম। সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা পেলে শিশুর মৃত্যুঝুঁকি অর্ধেক কমানো সম্ভব। নিউমোনিয়া রোগের লক্ষণগুলো সম্পর্কে যদি বাবা-মায়ের ধারণা থাকে এবং সে অনুসারে চিকিৎসকের কাছে নেওয়া হয় , তাহলে শিশুকে সহজেই সুস্থ করে তোলা সম্ভব। এতে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুর মৃত্যুহারও দ্রুত কমিয়ে আনা সম্ভব।নিউমোনিয়ার চিকিৎসা নিতে দেরি করার পেছনে অন্তত তিনটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, শিশুর পরিচর্যাকারীরা নিউমোনিয়ার বিপদ চিহ্ন ও উপসর্গগুলো চিনতে পারেন না এবং যতক্ষণ পর্যন্ত না রোগটা পরবর্তী জটিল অবস্থায় পৌঁছে যায় ততক্ষণ চিকিৎসাসেবা নিতে যান না। উপরন্তু রোগটা চিনতে না পারলেও প্রাতিষ্ঠানিক চিকিৎসা নেয়ার আগ পর্যন্ত মায়েরা ঘরোয়া চিকিৎসা প্রয়োগ করতে থাকে। এগুলো যখন বিফল হয় তখন অপেশাদার স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শ নেয় , যারা আসলে নিউমোনিয়ার যথাযথ ব্যবস্থা দিতে অপারগ। এর বাইরে সামাজিক রীতিনীতি মায়েদের সেই স্বাধীনতাটুকু দেয় না যে তারা সংসারের সিদ্ধান্ত দেয়া ব্যক্তি যেমন স্বামী বা শাশুড়ি এদের অনুমতি না নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক চিকিৎসাসেবা নিতে যাবে।
সচেতনতা শিশুর রোগ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই মা-বাবাকেই শিশুর স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নবান হতে হবে। পরিবারের সচেতনতার মধ্যেই নিউমোনিয়া আক্রান্ত শিশুর মৃত্যু রোধ করা সম্ভব।
#
পিআইডি ফিচার
মো. মামুন হাসান:
ইলিশ আমাদের জাতীয় মাছ এবং দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। এটি শুধু আমাদের নদী ও সাগরের সম্পদই নয়, বরং দেশের কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়ি ...
ইমদাদ ইসলাম:
বিষাক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিচ্ছে দেশের মানুষ। প্রায় প্রতিটি গণমাধ্যমেই প্রতিদিনই দেশের বায়ু মান গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করা হয়।গত ৪ মার্চ বুধবার সকাল ১০টার দিকে রাজধানী ঢা ...
মানিক লাল ঘোষ: ইতিহাসের পাতায় কোনো কোনো দিন আসে যা কেবল একটি তারিখ নয়, বরং একটি জাতির ভাগ্যবদল ও আত্মপরিচয়ের চূড়ান্ত দলিল হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ ছিল তেমনই এক মাহেন্দ্রক্ষণ। সেদি ...
আতিকুল ইসলাম টিটু:
বাংলাদেশকে নয়া উপনিবেশিক আধাসামন্তবাদী রাষ্ট্র হিসেবে বোঝার জন্য কেবল রাষ্ট্র গঠনের পরবর্তী সময় নয়, বরং বিশ্ব ইতিহাসের বৃহত্তর শ্রেণি সংগ্রাম এবং সাম্রাজ্যবাদ ...
সব মন্তব্য
No Comments