দৌলতপুরে অবৈধ মাটি কাটা বন্ধে থানায় অভিযোগ, কার্যকর ব্যবস্থা নেই

প্রকাশ : 21 Jun 2026
দৌলতপুরে অবৈধ মাটি কাটা বন্ধে থানায় অভিযোগ, কার্যকর ব্যবস্থা নেই


দৌলতপুর (কুষ্টিয়া) প্রতিনিধি: কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিয়ন্ত্রণাধীন ক্যানাল, সরকারি খাল ও জমি এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন বিভিন্ন স্থান থেকে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে মাটি উত্তোলন ও বিক্রির অভিযোগ উঠেছে একটি প্রভাবশালী চক্রের বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বারবার জানানো হলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে ওই চক্রটি। ফলে সরকারি সম্পদ রক্ষা এবং প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।


স্থানীয় বিভিন্ন সূত্র জানায়, প্রতিদিন রাত ৯টার পর শুরু হয় অবৈধভাবে মাটি কাটার কার্যক্রম, যা চলে ভোররাত পর্যন্ত। বিশেষ করে সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে মাটি কাটার তৎপরতা আরও বেড়ে যায়। এক্সকাভেটর ও শ্যালো ইঞ্জিনচালিত ট্রলির মাধ্যমে দ্রুতগতিতে মাটি কেটে বিভিন্ন অবৈধ ইটভাটায় সরবরাহ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।


সম্প্রতি সরেজমিনে উপজেলার ফিলিপনগর ইউনিয়নের বাহিরমাদী টোলপাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্যানাল থেকে গভীর গর্ত করে মাটি উত্তোলন করা হচ্ছে। বর্ষা বা বন্যা মৌসুমে পদ্মা নদীর পানি প্রবেশকারী ওই ক্যানালটির পাশে রয়েছে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ এবং পাকা সংযোগ সড়ক। স্থানীয়দের আশঙ্কা, এভাবে মাটি কাটা অব্যাহত থাকলে বন্যা ও বর্ষা মৌসুমে বাঁধ ও সড়ক মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে এবং জননিরাপত্তা হুমকির সম্মুখীন হবে।


এলাকাবাসীর অভিযোগ, একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে সরকারি সম্পত্তি থেকে অবৈধভাবে মাটি কেটে তা বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করে আসছে। এ কাজে স্থানীয় কয়েকজন রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে দাবি তাদের। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতি রাতে প্রায় এক হাজার ট্রলি মাটি বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হচ্ছে।


নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি জানান, প্রশাসন ও পুলিশকে বিষয়টি একাধিকবার জানানো হলেও অজ্ঞাত কারণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। তাদের অভিযোগ, প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়া এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়েই সরকারি সম্পদ এভাবে অবাধে লুটপাট করা হচ্ছে।


অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বানাত ব্যাপারী প্রথমে দাবি করেন, তিনি নিজের জমির মাটি কাটছেন। তবে রাতের বেলায় মাটি কাটার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমি না, অন্যরা কাটছে।” জমি তার হলে অন্যরা কীভাবে মাটি কাটছে, এ প্রশ্নের সন্তোষজনক কোনো উত্তর দিতে পারেননি তিনি।


ফিলিপনগর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান একরামুল হক বলেন, “স্থানীয় একটি প্রভাবশালী চক্র ক্যানালের মাটি কেটে বিক্রি করছে বলে শুনেছি। তারা প্রভাবশালী হওয়ায় অনেকে প্রকাশ্যে কথা বলতে ভয় পায়। বিষয়টি প্রশাসনকে জানানো হবে।”


এদিকে সরকারি ক্যানাল, খাল ও বাঁধ রক্ষায় দ্রুত অভিযান পরিচালনা এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।


অন্যদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানিয়েছে, সরকারি সম্পত্তি রক্ষার স্বার্থে গত বৃহস্পতিবার দৌলতপুর থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কার্যসহকারী শফিকুল ইসলাম বাদী হয়ে অভিযোগটি দাখিল করেন। তবে অভিযোগ দায়েরের পরও শনিবার এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন পাউবো কর্তৃপক্ষ ও ভুক্তভোগী স্থানীয়রা। তাদের দাবি, থানায় অভিযোগ দেওয়ার পরও অবাধে মাটি কাটার উৎসব চলছে।


এ বিষয়ে দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আরিফুর রহমান বলেন, “অভিযোগটি তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”


অবৈধ মাটি কাটা বন্ধে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অনিন্দ্য গুহ বলেন, “আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। কিন্তু মাটি কাটা চক্রগুলো বেশিরভাগ সময় রাতের বেলায় কাজ করে। অনেক সময় অভিযানে গিয়ে তাদের পাওয়া যায় না। পুরোপুরি মাটি কাটা বন্ধ করতে হলে বৃষ্টিরও প্রয়োজন রয়েছে।”


তবে ইউএনওর এমন বক্তব্যে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। তাদের প্রশ্ন, প্রশাসনের আইন প্রয়োগের ক্ষমতা যদি বৃষ্টির ওপর নির্ভর করতে হয়, তাহলে সরকারি সম্পদ রক্ষা করবে কে? দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে চলতে থাকা অবৈধ মাটি কাটা বন্ধ করতে না পারা প্রশাসনের ব্যর্থতা নাকি অন্য কোনো প্রভাবশালীর হাতছানি রয়েছে, সে প্রশ্ন এখন স্থানীয়দের মুখে ঘুরপাক খাচ্ছে।


স্থানীয় সচেতন মহল মনে করে, পানি উন্নয়ন বোর্ডের ক্যানাল, খাল ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা থেকে অবৈধভাবে মাটি উত্তোলনের বিষয়টি শুধু পরিবেশগত ক্ষতিই নয়, বরং জননিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি। তাই অবৈধ মাটি কাটা বন্ধ, জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা খতিয়ে দেখতে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগী মহল।

সম্পর্কিত খবর

;