চুক্তির বাধ্যবাধকতা

বেশি দামে মার্কিন গম কিনছে বাংলাদেশ, বাড়তি খরচ ৬৭২ কোটি টাকা

প্রকাশ : 17 Sep 2026
বেশি দামে মার্কিন গম কিনছে বাংলাদেশ, বাড়তি খরচ ৬৭২ কোটি টাকা

স্টাফ রিপোর্টার: মধ্যপ্রাচ্যের সংকট ও বিশ্ববাজারে অনিশ্চয়তার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তির আওতায় চড়া দামে গম আমদানি করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। খোলাবাজার বা বিকল্প উৎসের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম কিনতে টনপ্রতি ৬৫ থেকে ৭০ ডলার বেশি খরচ পড়ছে। ফলে চলতি অর্থবছর আট লাখ টন গম আমদানিতে বাড়তি ব্যয় হতে পারে অন্তত ৫ কোটি ২০ লাখ থেকে ৫ কোটি ৬০ লাখ ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৬২৪ থেকে ৬৭২ কোটি টাকা।


সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উন্মুক্ত দরপত্রে কম দামে গম কেনার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও চুক্তির বাধ্যবাধকতার কারণে বেশি দামের মার্কিন গম কিনতে হচ্ছে। সাম্প্রতিক উন্মুক্ত দরপত্রের সর্বনিম্ন প্রস্তাবিত দরের সঙ্গে তুলনা করলেও আট লাখ টনে বাড়তি ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় কমপক্ষে ৩২৭ কোটি টাকা।


প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ প্রতি টন আমেরিকান গম ৩০৮ ডলার দরে কিনছে, যেখানে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি টন রাশিয়ান গম বিক্রি হচ্ছে ২২৬ থেকে ২৩০ ডলারে। 


চুক্তির পটভূমি ঘেঁটে দেখা যায়, গত বছর ২০ জুলাই খাদ্য মন্ত্রণালয় ও যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি দপ্তরের মধ্যে স্বাক্ষরিত এক সমঝোতা স্মারকের আওতায় এই গম কেনা হচ্ছে। ইউএসডিএ-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০ জুলাই ২০২৫ তারিখে বাংলাদেশ সরকার ইউএস উইট অ্যাসোসিয়েটসের সঙ্গে প্রতি বছর ৭ লাখ মেট্রিক টন পর্যন্ত মার্কিন গম আমদানির জন্য পাঁচ বছরের এমওইউ স্বাক্ষর করে। 


এই চুক্তির আওতায় ৪ লাখ ৪০ হাজার টন গম আমদানির কথা রয়েছে, যার প্রথম চালানে ৫৬ হাজার ৯৫৯ মেট্রিক টন গম গত ২৫ অক্টোবর চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছেছে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, শনিবার চট্টগ্রাম বন্দরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কেনা ৫৭ হাজার টন গমের প্রথম চালান এসে পৌঁছেছে। এটি ৪ লাখ ৪০ হাজার টন গম কেনার চুক্তির অংশ। 


আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স ও এজেওটি-এর তথ্য অনুযায়ী, এই গমের দাম টনপ্রতি ৩০৮ ডলার এবং এটি সরবরাহ করছে সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান অ্যাগ্রোকর্প ইন্টারন্যাশনাল, যা ইউএস উইট অ্যাসোসিয়েটস কর্তৃক অনুমোদিত। সরকার টু সরকার (জিটুজি) ভিত্তিতে এই আমদানি কার্যক্রম চলছে এবং এর অংশ হিসেবে মোংলা বন্দরে মোট চার লাখ ৫০ হাজার টন গম আমদানি করা হবে। 


বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাশিয়া ও কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চল থেকে গমের ফ্রি-অন-বোর্ড (এফওবি) মূল্য বর্তমানে টনপ্রতি ২২০ থেকে ২৪০ ডলারের মধ্যে। পরিবহনসহ বাংলাদেশে পৌঁছাতে এর দাম দাঁড়ায় প্রায় ২৭০ থেকে ২৯০ ডলার। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের বেঞ্চমার্ক হার্ড রেড উইন্টার গমের দাম টনপ্রতি ২৭০ থেকে ৩১০ ডলারের বেশি। দূরত্বের কারণে চড়া জাহাজভাড়া, বীমা ও দীর্ঘ পরিবহন ব্যয় যোগ হয়ে বাংলাদেশে পৌঁছানোর পর মার্কিন গমের দাম দাঁড়ায় প্রায় ৩৩০ থেকে ৩৬০ ডলার।


পরিবহন সময়ের ব্যবধানও বড়। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, রাশিয়া বা কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চল থেকে বাংলাদেশে গম পৌঁছাতে যেখানে প্রায় ১৫ দিন লাগে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে চালান আসতে সময় লাগে প্রায় ৫৫ দিন। ফলে পরিবহন ব্যয়ও বাড়ছে এবং খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।


যদিও খাদ্য মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম আমদানিতে কোনো ধরনের অনিয়ম, অতিরিক্ত দাম বা বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়নি। মন্ত্রণালয় জানায়, সম্প্রতি এক জাতীয় দৈনিকে ‘চুক্তির কারণে বেশি দামে যুক্তরাষ্ট্রের গম কিনছে বাংলাদেশ’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিভ্রান্তিকর তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির তথ্য বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) চুক্তির আওতায় প্রতি টন গম আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের তুলনায় ২৪ ডলার বেশি দামে আমদানি করবে বাংলাদেশ। 


কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেছেন, ‘এই চুক্তির মাধ্যমে মূলত আমরা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে জিম্মি হয়ে গেছি। এখানে গমের মূল্য নিয়ে কোনো ধরনের প্রশ্ন করার সুযোগ নেই; তারা যে দাম নির্ধারণ করে দেবে, বাংলাদেশকে বাধ্য হয়ে সেই দামেই কিনতে হবে। এটি কোনো বাণিজ্যিক সুবিধার চুক্তি নয়, বরং একটি বড় রাজনৈতিক বোঝা। বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিকভাবে চাপে রাখাই ছিল এই চুক্তির মূল উদ্দেশ্য। এটি একটি দুর্বল দেশের ওপর চাপিয়ে দেওয়া চরম অসমান চুক্তি, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।’


সম্পর্কিত খবর

;