রাজশাহী–১

জয়-পরাজয়ে 'ফ্যাক্টর' হতে পারে আওয়ামী লীগের ভোটার

প্রকাশ : 27 Jan 2026
জয়-পরাজয়ে 'ফ্যাক্টর' হতে পারে আওয়ামী লীগের ভোটার

সৈয়দ মাহামুদ শাওন, রাজশাহী অফিস  : আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজশাহী–১ (তানোর ও গোদাগাড়ী) আসনে জমে উঠেছে বহুমাত্রিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাজনৈতিক লড়াই। কৃষিনির্ভর বরেন্দ্র অঞ্চল নিয়ে গঠিত এই আসনটি রাজশাহী জেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় এলাকা, যা জাতীয় সংসদের ৫২ নম্বর আসন হিসেবে পরিচিত। রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল ও কৌশলগত গুরুত্বের কারণে শুরু থেকেই এই আসনের নির্বাচন ঘিরে বাড়তি আগ্রহ ও আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।


বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই আসনে এবারের নির্বাচনী মাঠে রয়েছেন চারজন প্রার্থী। প্রত্যেকের রয়েছে আলাদা রাজনৈতিক পরিচিতি, সাংগঠনিক ভিত্তি ও ভোটব্যাংক, যা পুরো নির্বাচনী সমীকরণকে করে তুলেছে জটিল, বহুমাত্রিক ও অনিশ্চিত।


রাজশাহী–১ আসনে অন্তর্ভুক্ত তানোর উপজেলায় রয়েছে ২টি পৌরসভা ও ৭টি ইউনিয়ন এবং গোদাগাড়ী উপজেলায় রয়েছে ২টি পৌরসভা ও ৯টি ইউনিয়ন। আয়তনের দিক থেকে তানোর উপজেলার আয়তন ২৯৫.৪০ বর্গ কিলোমিটার এবং গোদাগাড়ী উপজেলার আয়তন ৪৭৫.২৬ বর্গ কিলোমিটার। ফলে পুরো আসনের মোট আয়তন দাঁড়ায় ৭৭০.৬৬ বর্গ কিলোমিটার।


নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৬৮ হাজার ৭৮০ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৩৪ হাজার ৭৮ জন, নারী ভোটার ২ লাখ ৩৪ হাজার ৬৯৯ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ৩ জন। মোট ভোটকেন্দ্র রয়েছে ১৫৯টি। বিপুল ভোটারসংখ্যা ও বিস্তৃত ভৌগোলিক এলাকার কারণে এখানে ভোটের হিসাব বরাবরই জটিল এবং ফলাফল পূর্বানুমান করা কঠিন হয়ে পড়ে।


এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে আলোচিত প্রার্থী হিসেবে মাঠে নেমেছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মেজর জেনারেল (অব.) শরিফ উদ্দিন। ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে তিনি নির্বাচনী লড়াইয়ে অংশ নিচ্ছেন। তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সামরিক সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সামরিক ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার পাশাপাশি তাঁর পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য এই অঞ্চলে তাঁকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।


মেজর শরিফ উদ্দিনের বড় ভাই ছিলেন রাজশাহী–১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এবং ২০০১ সালে বিএনপি সরকারের মন্ত্রিসভায় ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী। তাঁর আরেক ভাই এনামুল হক বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজি) এবং অপর ভাই আসাদুজ্জামান বর্তমানে বরেন্দ্র উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান। রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক ক্ষেত্রে এই পরিবারের দীর্ঘদিনের অবদানের কারণে তানোর ও গোদাগাড়ীর মানুষজন তাঁদের ‘রত্নগর্ভা পরিবার’ হিসেবে সম্মান করে থাকেন। নির্বাচনী মাঠে এই সামাজিক পুঁজি বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা।


অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী অধ্যাপক মুজিবুর রহমান দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে শক্ত অবস্থান গড়ে তুলেছেন। তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির। এর আগে ১৯৮৬ সালের তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজশাহী–১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন। দীর্ঘ সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা ও মাঠপর্যায়ে সরাসরি সম্পৃক্ততার কারণে তাঁকে এই আসনের অন্যতম হেভিওয়েট প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।


এ ছাড়া এবি পার্টি মনোনীত প্রার্থী আব্দুর রহমান ঈগল প্রতীক নিয়ে এবং গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী মো. শাহজাহান ট্রাক প্রতীক নিয়ে নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন। যদিও এই দুই প্রার্থীর সাংগঠনিক শক্তি তুলনামূলকভাবে সীমিত, তবে ভোট ভাগাভাগির ক্ষেত্রে তাঁদের ভূমিকা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।


নির্বাচনী মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, বিএনপি ও জামায়াত উভয় দলই তৃণমূল পর্যায়ে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে। বিএনপি উপজেলা, ইউনিয়ন এমনকি গ্রাম পর্যায়ে কমিটি গঠন করে সাংগঠনিকভাবে নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনা করছে। দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই আসনে দলটি এবার আরও সংগঠিত ও কৌশলী অবস্থান নিয়েছে।


অন্যদিকে জামায়াত প্রার্থী অধ্যাপক মুজিবুর রহমান নিজে মাঠে নেমে নেতাকর্মীদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন। বাড়ি বাড়ি ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ, ধর্মীয় ও সামাজিক নেটওয়ার্ক ব্যবহারের মাধ্যমে সংগঠিত ভোটব্যাংক আরও সংহত করার কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে।


তবে রাজশাহী–১ আসনের নির্বাচনী সমীকরণে সবচেয়ে বড় ও নির্ধারক ফ্যাক্টর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক। এই আসনে আওয়ামী লীগের সরাসরি কোনো প্রার্থী না থাকলেও তানোর ও গোদাগাড়ীতে দলটির একটি উল্লেখযোগ্য ভোটভিত্তি রয়েছে। 


স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ভোটাররা যেদিকে ঝুঁকবেন, শেষ পর্যন্ত সেই প্রার্থীই এই আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। ফলে বিএনপি ও জামায়াত উভয় পক্ষই প্রকাশ্যে না হলেও নীরবে এই ভোটব্যাংককে নিজেদের দিকে টানার কৌশল অবলম্বন করছে বলে জানা গেছে।


সম্পর্কিত খবর

;