স্টাফ রিপোর্টার: আগামীকাল যে জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষর হতে চলেছে সেই জুলাই জাতীয় সনদে সিপিবি, বাসদ, বাসদ (মার্কসবাদী), বাংলাদেশ জাসদ স্বাক্ষর করবে না সে বিষয়ে চারটি দলের বক্তব্য দেশবাসীর কাছে পরিষ্কার করে তুলে ধরতে আজ ১৬ অক্টোবর ২০২৫, বৃহস্পতিবার, বিকেল ৩টায় ঢাকার মণি সিংহ সড়কের মুক্তিভবনের মৈত্রী মিলনায়তনে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বাম গণতান্ত্রিক জোটের সমন্বয়ক ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) এর সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ। সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন বাংলাদেশ জাসদের স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. মুশতাক হোসেন, সিপিবির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন, বাসদ (মার্কসবাদী) সমন্বয়ক মাসুদ রানা। সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন সিপিবির সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন, সিপিবির সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ শাহ আলম, সিপিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স, বাসদের সহকারী সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন, বাসদের সম্পাদক নিখিল দাস, বাংলাদেশ জাসদের স্থায়ী কমিটির সদস্য আনোয়ারুল ইসলাম বাবু, বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল কবীর জাহিদ প্রমুখ।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, সনদের পটভূমিতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সঠিকভাবে উপস্থাপিত না হওয়া, রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতির পরিবর্তন, ১৫০ (২) অনুচ্ছেদ বাতিলের যে প্রস্তাব সনদে উল্লেখ রয়েছে তা সংশোধন না হলে এই চার দলের পক্ষে সনদে স্বাক্ষর করা সম্ভব না।
নেতৃবৃন্দ সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, আগামীকাল সনদ স্বাক্ষরের পূর্বে বিকেল ৩টার মধ্যে যদি কমিশনের পক্ষ থেকে উপরোক্ত বিষয়সমূহ সংশোধন করা হয় এবং নোট অব ডিসেন্ট পদে সর্বসম্মত বিষয় নিয়ে সনদ চূড়ান্ত করা হয় তাহল চারটি দল সনদে স্বাক্ষর করতে প্রস্তুত রয়েছে।
নেতৃবৃন্দ আরও উল্লেখ করেন, যে সকল বিষয়ে দলগুলো কমিশনের প্রস্তাবে একমত হয়েছে সেগুলো বাস্তবায়নে জাতির কাছে তারা অঙ্গীকারবদ্ধ।
নেতৃবৃন্দ জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে নির্বাচন পিছানোর যে কোন ষড়যন্ত্র মোকাবেলায় দেশবাসীকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
সংবাদ সম্মেলনের লিখিত বক্তব্যটি হুবহু তুলে ধরা হলো-
প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ
আমাদের শুভেচ্ছা গ্রহণ করুন।
আগামীকাল বিকেলে জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজাতে জুলাই সনদে স্বাক্ষর প্রদান অনুষ্ঠান হতে যাচ্ছে। আমরা এখানে উপস্থিত দলসমূহ এতে আমন্ত্রিত হয়েও কেন অংশ নিতে পারছি না, সে বিষয়ে আপনাদের মাধ্যমে দেশবাসীকে অবহিত করার জন্য আজকের এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেছি। আমাদের আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে উপস্থিত হওয়ার জন্য আপনাদেরকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
সাংবাদিক বন্ধুগণ
আপনারা জানেন, গত বছর ৫ আগস্ট দেশে ছাত্র-শ্রমিক-জনতার এক অভুতপূর্ব গণঅভ্যুত্থান সংগঠিত হয়েছে। ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনার সরকার দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। দেশবাসীর প্রত্যাশা ছিল অন্তর্বর্তী সরকার দেশে গণতন্ত্রের পথে উত্তরণের জন্য রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক সংস্কার, গণঅভ্যুত্থানে হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ীদের বিচার এবং একটি সুষ্ঠু অংশ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা, যাতে ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থান রোধ করা যায়। সরকার সংস্কারের জন্য ১১টি কমিশন গঠন করে। প্রথমে গঠিত ৬টি সংস্কার কমিশনের সুপারিশ নিয়ে ৩০/৩৭টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে পর্যায়ক্রমে আলোচনা ও মতামত গ্রহণ শেষে প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্বে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করে, দ্বিতীয় পর্যায়ে আলোচনা ৩ জুন শুরু হয়ে ৩০ জুলাই সমাপ্ত হয়। কয়েকটি দলের দাবির প্রেক্ষিতে তৃতীয় পর্যায়ে জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়ন নিয়ে ৫ দিন আলোচনা হয়ে ৮ অক্টোবর শেষ হয়।
গতকাল বিকেলে ঐকমত্য কমিশনের এক আকস্মিক আমন্ত্রণে আমরা ৩০+টি রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে উপস্থিত হই। মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা সেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। জুলাই সনদে স্বাক্ষর ও এর বাস্তবায়ন বিষয়ে বক্তব্য দেবার জন্য ঐকমত্য কমিশন কর্তৃক অনেক নেতাকে আহ্বান করা হলেও আমাদের দলসমূহের কাউকে বক্তব্য দিতে আহ্বান জানানো হয়নি। আমরা মনে করি, ইচ্ছাকৃতভাবেই জাতীয় ঐকমত্য কমিশন এ কাজটি করেছে। মাননীয় প্রধান উপদেষ্টার সামনে ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ বন্ধ করতেই এ ধরনের অন্যায্য আচরণ করা হয়েছে। এতে আমরা বিস্মিত হয়েছি।
সম্মানিত সাংবাদিকবৃন্দ
আমরা আপনাদের মাধ্যমে দেশবাসীকে জানাতে চাই, মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা ঐকমত্য কমিশনের যাত্রার উদ্বোধনী অনুষ্ঠান বলেছিলেন, সব দল যেসব বিষয়ে একমত হবে শুধু সেগুলোই ঐক্যমত্য হিসেবে বিবেচিত হবে। আমরাও প্রধান উপদেষ্টার সাথে একমত পোষণ করেছিলাম এবং ঐক্যমত্য কমিশনের সব সভায় উপস্থিত থেকে আমাদের মতামত ব্যক্ত করেছি। কিন্তু জুলাই সনদের যে, চূড়ান্ত কপি গত ১৪ অক্টোবর আমাদের কাছে পাঠিয়েছে সেখানে দেখলাম সর্বসম্মত বিষয় ছাড়াও নোট অব ডিসেন্ট দেয়া প্রস্তাবগুলো সনদে যুক্ত করেছে। আমাদের দেয়া নোট অব ডিসেন্টগুলোর কারণও যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ হয়নি।
১. আমরা জুলাই সনদ নিয়ে আলোচনাকালেই বারবার বলেছি, যেসব বিষয়ে সবার ঐকমত্য রয়েছে কেবলমাত্র সেসব বিষয়েই সবার স্বাক্ষর নেয়া যেতে পারে। ভিন্নমতগুলো অতিরিক্ত (এনেক্স) প্রতিবেদন হিসেবে সনদে সংযুক্ত থাকতে পারে।
২. সনদের প্রথম অংশে পটভূমিতে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ইতিহাস এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক আন্দোলনের ইতিহাস সঠিকভাবে উপস্থাপিত হয়নি। আমরা বারবার সংশোধনী দিলেও সেগুলো সন্নিবেশিত করা হয়নি।
৩. শেষ অংশে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে অঙ্গীকার করতে বলা হয়েছে। সেখানে পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ভিন্নমত থাকলে তা বাস্তবায়নের অঙ্গীকার কিভাবে সম্ভব তা আমাদের কাছে বোধগম্য নয়।
৪. অঙ্গীকারনামার ২নং-এ জুলাই সনদ সংবিধানের তফসিলে বা যথোপযুক্ত স্থানে যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। আমরাও সর্বসম্মত জুলাই সনদ সংবিধানে যুক্ত করার পক্ষে। কিন্তু নোট অব ডিসেন্টসহ কীভাবে সংবিধানে যুক্ত হবে, তা আমাদের বোধগম্য নয়।
৫. অঙ্গীকারনামার ৩নং-এ “জুলাই সনদ নিয়ে কেউ আদালতের শরণাপন্ন হতে পারবে না” এটি নাগরিকের মৌলিক ও গণতান্ত্রিক অধিকারের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
৬. এছাড়াও সংবিধানের ১৫০(২) অনুচ্ছেদে ক্রান্তিকালীন বিধানে ৬ষ্ঠ তফসিলে থাকা স্বাধীনতার ঘোষণা ডিক্লারেশন অব ইনডিপেন্ডেন্সে এবং ৭ম তফসিলে থাকা প্রক্লেমেশন অব ইনডিপেন্ডেন্স বাদ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। যা আমাদের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তি সেটা বাদ দিলে তো বাংলাদেশের অস্তিত্বই থাকে না। অথচ জুলাই সনদ সংবিধানের তফসিলে যুক্ত করার কথা বলা হচ্ছে।
৭. পটভূমিতে অভ্যুত্থান পরবর্তী সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের রেফারেন্স নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হওয়ার কথা পূর্বে পাঠানো খসড়া সনদে উল্লেখ থাকলেও চূড়ান্ত সনদে ১০৬ অনুচ্ছেদের কথা বাদ দেয়া হয়েছে।
উপরোক্ত বিষয়গুলোর নিষ্পত্তি না হওয়াতে আমাদের পক্ষে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করা সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে সংবিধানে বিদ্যমান চার মূলনীতিÑ গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদ এবং ১৫০(২) অনুচ্ছেদের ক্রান্তিকালীন বিধানের তফসিল পরিবর্তনে সম্মতি প্রদান ও আদালতে প্রশ্ন করা যাবে না এমন বিষয়ে অঙ্গীকার করতে হয় এমন কোনো সনদে ভিন্নমত দিয়ে আমরা স্বাক্ষর করতে পারি না।
প্রিয় বন্ধুগণ
জুলাই সনদে বিধৃত যেসব বিষয়ে আমরা সম্মত হয়েছি সেগুলো বাস্তবায়িত করতে আমরা জাতির কাছে অঙ্গীকারবদ্ধ। জাতীয় সংসদের ভেতর ও বাইরে সেসব বিষয়ে বাস্তবায়িত করতে আপনাদের মাধ্যমে আমরা জাতির কাছে দৃঢ় সংকল্প ঘোষণা করছি।
ধন্যবাদসহ-
কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন, সভাপতি, সিপিবি
আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন, সাধারণ সম্পাদক সিপিবি
বজলুর রশীদ ফিরোজ, সাধারণ সম্পাদক, বাসদ
মাসুদ রানা, সমন্বয়ক, বাসদ (মার্কসবাদী)
ডা. মুশতাক হোসেন, সদস্য, স্থায়ী কমিটি, বাংলাদেশ জাসদ
স্টাফ রিপোর্টার: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনকে সামনে রেখে দলীয় কার্যক্রম জোরদার করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। তফশিল ঘোষণার পরই রাজধানীর নয়াপল্টনে দলটির কেন্দ্রীয় কা ...
স্টাফ রিপোর্টার: দেশের ১৩টি বামপন্থী, প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে ‘সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী জোট’-এর আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। আজ বৃহস্পতিবার বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপ ...
স্টাফ রিপোর্টার: জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ একটি সংশোধনী আইন, যার ফলে ভবিষ্যতে পৌরসভা নির্বাচনে আর দলীয় প্রতীক ব্যবহার করা হবে না।
বৃহস্পতিবার (৯ এ ...
স্টাফ রিপোর্টার: বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, একটি নির্বাচিত সরকারের অধীনে বগুড়া এবং শেরপুর দুটি আসনে আজ যে উপনির্বাচন অনুষ্ঠ ...
সব মন্তব্য
No Comments