উপকূলের জেলেদের জীবন-জীবিকা রক্ষায় সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে ॥ নাগরিক সমাজ

প্রকাশ : 02 May 2026
উপকূলের জেলেদের জীবন-জীবিকা রক্ষায় সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে ॥ নাগরিক সমাজ

বরিশাল অফিস: উপকূলের জেলেদের জীবন-জীবিকা রক্ষায় সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। তারা বলেছেন, নদীতে মাছ কমে যাওয়ায় নদীনির্ভর জেলেদের জীবন-জীবিকা হুমকির মূখে। নিজস্ব ছোট নৌকা ও জালের মালিক থেকে সাগরে গিয়ে মাছ ধরা ট্রলারের শ্রমিক হতে বাধ্য হচ্ছেন। সেখানে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন ট্রলার মালিক, জালের মালিক ও আড়ৎদার; জেলে একজন শ্রমিক মাত্র।

আজ শনিবার বরগুনা সদর উপজেলার লতাকাটা খেয়াঘাটে এক নাগরিক সংলাপে এ সব কথা বলেন তারা। ড্রিম রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন এবং সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলন আয়োজিত সংলাপে সভাপতিত্ব করেন সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক নিখিল চন্দ্র ভদ্র। ‘অবৈধ জাল বন্ধ কর, মৎস্যসম্পদ রক্ষা কর’- এই স্লোগানকে সামনে রেখে মূল বক্তব্য উত্থাপন করেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স অনুষদের শিক্ষক ও গবেষক মীর মোহাম্মদ আলী। সংলাপে বক্তৃতা করেন সচেতন সংস্থার সাধারণ সম্পাদক সাকিলা পারভীন, সাংবাদিক ও পরিবেশকর্মী মুশফিক আরিফ,  স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য মো. আব্দুল জব্বার, পরিবেশকর্মী আরিফুর রহমান, নাগরিক নেতা সুলতান হাওলাদার, জেলে সমিতির নেতা মো. মিজানুর রহমান ও ইয়াসিন আলীসহ বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা।

মূল প্রবন্ধে সহকারি অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, দেশের নদ-নদী, খাল-বিল, হাওড়-বাঁওড় ও উপকূলীয় জলাশয়গুলো জাতীয় মৎস্যসম্পদের অন্যতম প্রধান উৎস। দেশের প্রায় ১২ শতাংশ মানুষের জীবন ও জীবিকা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মৎস্যসম্পদের ওপর নির্ভরশীল এবং এ খাত দেশের দৈনন্দিন প্রাণিজ আমিষের প্রায় ৬০ শতাংশ সরবরাহ করে। এছাড়া জাতীয় জিডিপিতে ১.৫৩ শতাংশ এবং কৃষিজ জিডিপিতে ২২.২৬ শতাংশ অবদান রাখে। সম্প্রতি কারেন্ট জাল, চায়না দুয়ারি, বেহুন্দি, খুঁটা ও মশারি জালসহ বিভিন্ন অবৈধ ও বিধ্বংসী জালের নির্বিচার ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় পোনা ও মা মাছ ধ্বংস হচ্ছে, নষ্ট হচ্ছে প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্র এবং ধ্বংসের মুখে পড়ছে জলজ জীববৈচিত্র্য। 

অবৈধ জালের ব্যবহার বন্ধের সুপারিশ তুলে ধরে মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় ৭ লাখ জেলে সরাসরি এবং ২৫ লাখ মানুষ পরোাক্ষভাবে ইলিশের উপর নির্ভরশীল। সরকারি হিসেবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ইলিশ উৎপাদন ৭.৩৩ শতাংশ কমেছে। যার অন্যতম কারণ অবৈধ জালের অবাধ ব্যবহার। এসব জালের বেষ্টনীর কারণে ডিম ছাড়তে আসা মা ইলিশ নদীতে আটকা পড়ে, ডিম দেওয়ার পরও ইলিশসহ অন্যান্য মাছ নষ্ট হয়। জলজ জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়। অথচ অবরোধসহ নানা কর্মসূচি গ্রহণ করলেও বাস্তবে অবৈধ জালের ব্যবহার বন্ধ হয়নি। ফলে মা ইলিশ ও জাটকা নিধন থামছে না। তাই প্রশাসনিক ব্যবস্থার পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা ও নাগরিক উদ্যোগভিত্তিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক নিখিল চন্দ্র ভদ্র বলেন, সরকারের নানা কর্মসূচি থাকলেও জনগণের অংশগ্রহণ না থাকায় অনেক উদ্যোগ সফল হয় না। জেলেদের জীবন-জীবিকা রক্ষায় সামাজিক আন্দোলনে গড়ে তুলতে হবে। জাতীয় বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ রাখতে হবে। সেটা সম্ভব হলে জলজ জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও নদ-খাল-বিলের প্রাকৃতিক ভারসাম্য পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে। 

সংলাপে উত্থাপিত ১০দফা কর্মসূচিতে বলা হয়, জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও অভিযান, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারণা, জেলেদের বিকল্প জীবিকার সুযোগ সৃষ্টি, কঠোর আইন প্রয়োগ ও নজরদারি জোরদার, জাল প্রস্তুতকারক ও বিক্রেতাদের নিয়ন্ত্রণ, গবেষণা ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানভিত্তিক সচেতনতা কর্মসূচি, উপজেলা পর্যায়ে নদী ও মৎস্য রক্ষা কমিটি গঠন, সরকার ও নাগনিক সমাজের প্রতিনিধিদের যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ এবং অবৈধ জাল বিরোধী অভিযান জোরদার। 


সম্পর্কিত খবর

;