সীতাকুণ্ডে শিপইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাসে নিহত ৭, আহত অন্তত ১০

প্রকাশ : 14 Aug 2026
সীতাকুণ্ডে শিপইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাসে নিহত ৭, আহত অন্তত ১০

চট্টগ্রাম অফিস: চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীতে ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজের একটি স্ক্র্যাপ জাহাজের ট্যাংক থেকে বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে সাত শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় অন্তত ১০ জন অসুস্থ ও আহত হয়েছেন। তাঁদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।


শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকাল ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে ভাটিয়ারী স্টেশন রোডসংলগ্ন সাগর উপকূলে অবস্থিত ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে এ দুর্ঘটনা ঘটে। সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঘটনাস্থলে তিনজনের মৃত্যু হয়। পরে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া শ্রমিকদের মধ্যে আরও চারজন মারা যান।


সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফখরুল ইসলাম এবং চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মাহমুদা বেগম সাতজনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। পুলিশ জানিয়েছে, এটি বিস্ফোরণের ঘটনা নয়; প্রাথমিকভাবে বিষাক্ত গ্যাস লিকেজকেই দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।


ইয়ার্ড সূত্র ও সংশ্লিষ্টদের বরাত দিয়ে জানা গেছে, শুক্রবার সকালে একটি স্ক্র্যাপ জাহাজে শ্রমিকরা হাউসকিপিংয়ের কাজ করছিলেন। এ সময় জাহাজটির একটি ট্যাংক থেকে গ্যাস বের হতে দেখা যায়। গ্যাসের বিষয়টি দেখতে সেফটি টিমের কয়েকজন সদস্য এগিয়ে গেলে তাঁরা গ্যাসের সংস্পর্শে অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে ঘটনাস্থলে থাকা আরও কয়েকজন শ্রমিক আক্রান্ত হন।


আক্রান্ত শ্রমিকদের দ্রুত উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। কুমিরা ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল থেকে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করেন। অন্যদের মুমূর্ষু অবস্থায় হাসপাতালে পাঠানো হয়।


চমেক হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ নুরুল আলম আশেক জানান, ভাটিয়ারীর ওই ইয়ার্ড থেকে ছয়জন শ্রমিককে হাসপাতালে নেওয়া হয়। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তাঁদের মধ্যে পাঁচজনকে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। একজনকে হাসপাতালে ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।



দুর্ঘটনার পর প্রথম দিকে ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ তিনজনের মৃত্যুর তথ্য দেয়। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আরও দুজনের মৃত্যু হলে সংখ্যা পাঁচজনে দাঁড়ায়। এরপর সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী নিহতের সংখ্যা বেড়ে সাতজনে পৌঁছেছে।


প্রাথমিকভাবে নিহতদের মধ্যে সানি দাস, পলাশ দাস ও মোহাম্মদ হাবিবের পরিচয় পাওয়া গিয়েছিল। তবে নিহত সাতজনের পূর্ণাঙ্গ পরিচয় ও বাড়ির ঠিকানা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।



দুর্ঘটনার পর ইয়ার্ডে বিস্ফোরণ হয়েছে—এমন তথ্য ছড়িয়ে পড়লেও চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ তা নাকচ করেছে।


চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মাহমুদা বেগম জানিয়েছেন, বিস্ফোরণের খবর সঠিক নয়। বিষাক্ত গ্যাস লিকেজের কারণেই হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন।


তবে ইয়ার্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফেরদৌস ওয়াহিদ প্রাথমিকভাবে বিস্ফোরণের কথা জানিয়েছিলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। পরে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও পুলিশের বক্তব্যে গ্যাস লিকেজের বিষয়টি সামনে আসে। ফলে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণে তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।



কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক মোহাম্মদ মাহবুবুল হাসান জানিয়েছেন, জাহাজে বিষাক্ত গ্যাস নির্গমনের ঘটনায় হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। গ্যাস কীভাবে নির্গত হলো এবং ওই সময় শ্রমিকদের নিরাপত্তার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।


বিশেষ করে জাহাজের ট্যাংকে কাজ করার আগে গ্যাস পরীক্ষা, ট্যাংক নিরাপদ ঘোষণা, পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা এবং শ্রমিকদের প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম ছিল কি না—এসব বিষয় তদন্তে গুরুত্ব পাবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য থেকে জানা গেছে।



দুর্ঘটনায় আহত ও অসুস্থ শ্রমিকদের কয়েকজনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে আহতের সংখ্যা অন্তত ১০ জন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।


চমেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, হাসপাতালে নেওয়া কয়েকজনকে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেছেন এবং অন্যদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়ে কি না, সেটিও নজরে রয়েছে।



শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে জাহাজের ট্যাংকের ভেতরে কাজ করার আগে সেখানে কী ধরনের গ্যাস ছিল, ট্যাংকটি যথাযথভাবে গ্যাসমুক্ত করা হয়েছিল কি না, গ্যাস শনাক্ত করার যন্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল কি না এবং শ্রমিকদের সুরক্ষা সরঞ্জাম দেওয়া হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে।


সংশ্লিষ্ট দপ্তর জানিয়েছে, দুর্ঘটনার কারণ ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষ হলে গ্যাস নির্গমনের প্রকৃত কারণ এবং দায়িত্বে কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তা স্পষ্ট হবে।

সম্পর্কিত খবর

;