দৌলতপুরে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে পদ্মায় চলছে অবাঁধে বালু উত্তোলন : হুমকিতে বাঁধ-ফসল-জনপদ

প্রকাশ : 11 May 2026
দৌলতপুরে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে পদ্মায় চলছে অবাঁধে বালু উত্তোলন : হুমকিতে বাঁধ-ফসল-জনপদ

দৌলতপুর (কুষ্টিয়া) প্রতিনিধি : কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে সরকারি নিষেধাজ্ঞা ও উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অমান্য করে পদ্মা নদী থেকে অবাঁধে চলছে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী ও সন্ত্রাসী চক্রের প্রত্যক্ষ মদদে ড্রেজার মেশিন দিয়ে নদী থেকে অবাঁধে বালু তোলা হলেও প্রশাসনের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই। অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী বাহিনীর পাহারায় বালু উত্তোলন করার কারণে হুমকির মুখে পড়েছে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ, বি¯Íীর্ণ ফসলি জমি ও নদী তীরবর্তী বসতবাড়ি।

জানা গেছে, পদ্মা নদীর দৌলতপুর অংশে বালু উত্তোলনে উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তা প্রকাশ্যে অমান্য করা হচ্ছে। উপজেলার মরিচা, ফিলিপনগর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় রাত-দিন সমানে চলছে বালু কাটার মহোৎসব। প্রতিবাদ বা নিষেধ করলে সাধারণ মানুষকে হুমকি-ধামকি ও প্রাণনাশের ভয়ভীতি দেখানো হয়। এমনকি মারধর ও গুলি বর্ষণের ঘটনাও ঘটেছে পদ্মা নদীতে। ফলে আতঙ্কে ও প্রাণ হারানোর ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস করে না বলে চরাঞ্চলের সাধারণ মানুষের অভিযোগ।

সরজমিনে পদ্মার চরাঞ্চলে গিয়ে দেখা গেছে, উপজেলার মরিচা ও ফিলিপনগর ইউনিয়নের পদ্মারচরে একাধিক স্থানে ড্রেজার মেশিন বসিয়ে নদীর তলদেশ থেকে অবাঁধে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে পদ্মার স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে নদী ভাঙনের আশঙ্কা দেখা  দিয়েছে। স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, বালু উত্তোলনের ফলে ইতোমধ্যে বহু ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। কোথাও কোথাও অবৈধভাবে বালু ফেলায় আবাদি জমিও নষ্ট হচ্ছে।

ভূক্তভোগী স্থানীয়দের অভিযোগ, মরিচা ইউনিয়নের বৈরাগীরচর ভাদু শাহ মাজারসংলগ্ন এলাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ঘেঁষে সাবেক চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান, মরিচা ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বাদল হোসেন ভেগু ও টগর মোল্লার নেতৃত্বে বিজয়, শামীম রেজা, লতিফ ও হাবিবের তত্ত্বাবধানে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে রাইটা-মহিষকুন্ডি বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ হুমকির মুখে পড়েছে বলে চরম আতঙ্কে রয়েছেন ওই এলাকার সাধারণ মানুষ।

এছাড়াও মরিচা ইউনিয়নের ভুরকিরচর এলাকাতেও অবাঁধে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়রা জানান, সেখানে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী একটি চক্র নদী থেকে অবৈধভাবে বালু তুলে বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করছে। এরফলে নদীভাঙন আরও তীব্র আকার ধারণ করায় চরম উদ্বেগ উৎকন্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন তারা।

মাজদিয়াড় গ্রাম সংলগ্ন পদ্মার চরে রবিউল ইসলাম ও সাবেক ইউপি সদস্য লিয়াকত সরদারের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। এনিয়ে তাদের মধ্যে বিরোধও রয়েছে। বিরোধের জের ধরে রবিউল ইসলাম তার লোকজন প্রতিপÿ লিয়াকত সরদারের বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর চালায়। পরে তারা সশস্ত্র পাল্টা হামলা চালায় গত ২০ এপ্রিল রাতে। হামলায় মরিচা ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক রবিউল ইসলামকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি করে আহত করে। এসময় তাদের এলোপাতাড়ি গুলিতে মাজদিয়াড় এলাকার নারী-পুরুষসহ অন্তত ১১ জন গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হোন। তারা এখনও চিকিৎসাধীন রয়েছে।

এদিকে বৈরাগীরচর ঠান্টিতলা ও ভুরকিরচর এলাকায় টুকু ও রাসেলের নেতৃত্বেও অবৈধ বালু উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। শুধু নদী থেকেই বালু উত্তোলন করে ক্ষান্ত নয় ওইসব চক্র, পদ্মায় জেগে উঠা চরের ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি থেকেও জোরপূর্বক বালু উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। জমির মালিকদের ভয়ভীতি দেখিয়ে রাতের আঁধারে জেগে উঠা পদ্মার চর ও ফসলি জমি থেকে শত শত ট্রলি বালু উত্তোলন করে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হচ্ছে। প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই এভাবে অবৈধ বালু ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে একটি প্রভাবশালী মহল এমন অভিযোগ ভূক্তভোগী ও স্থানীয়দের। অভিযোগ রয়েছে প্রতিদিন শত শত ট্রলি বালু বিক্রি করে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে লক্ষ লক্ষ টাকা। প্রতি স্টিয়ারিং গাড়ি বালু ১৪০০ টাকা থেকে ১৬০০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে।

উপজেলার মথুরাপুর, হোসেনাবাদ, তারাগুনিয়া ও আলøাদর্গা এলাকা থেকে আসা স্যালো ইঞ্জিনচালিত শত শত ট্রলি দিন-রাত পদ্মা থেকে বালু উত্তোলন করে সরবরাহ করা হচ্ছে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায়। আর বালুভর্তি এসব ট্রলি থেকে অতিরিক্ত ২০০ টাকা করে চাঁদা আদায় করে থাকেন বিজয় নামে এক যুবক। আদায় হওয়া চাঁদার টাকা ভাগ-বাটোয়ারা হয়ে থাকে বিভিন্ন মহলে।

জানা গেছে, মেসার্স সরকার ট্রেডার্স নামে একটি প্রতিষ্ঠান এ অবৈধ বালু ব্যবসার অন্যতম নিয়ন্ত্রক। প্রতিষ্ঠানটি রাজশাহীর বাঘা উপজেলায় বৈধভাবে ২৪ একর জমিতে বালু উত্তোলনের ইজারা পেলেও সেখানে পর্যাপ্ত বালু না থাকায় কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার মরিচা ও ফিলিপনগর এলাকার চৌদ্দহাজার মৌজায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে নিয়মিত।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে চরের একাধিক ভূক্তভোগী জানান, তারা চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। প্রতিবাদ করলে হামলা, নির্যাতন ও ফসল কেটে নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। তাই জীবনের নিরাপত্তার কথা ভেবে কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পান না। প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করে কোন কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না হওয়ায় তারা নিরাপদে ও প্রকাশ্যেই চালাচ্ছে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন।

বালু উত্তোলনের সাথে জড়িত বাদল হোসেন ভেগুর সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, এলাকার একটি স্থানীয় ঈদগাহ নদীগর্ভে বিলীন হওয়ায় সবাই মিলে নতুন করে একটি ঈদগাহ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সেই উদ্দেশ্যেই পদ্মা নদী থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।

অপর বালু উত্তোলনকারী সাবেক ইউপি সদস্য লিয়াকত সরদারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করলেও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। পরে তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

অভিযোগের বিষয়ে মরিচা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান বলেন, আমি কিছু জানি না। বিষয়টি জেনে পরে জানাব।

পদ্মায় অবাঁধে বালু উত্তোলনের বিষয়ে দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার অনিন্দ্য গুহ বলেন, পদ্মা নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলনের বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। যারা এসব কর্মকান্ডে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বালু ও মাটি কাটা বন্ধে প্রশাসনের অভিযান চলমান রয়েছে। খুব শিগগিরই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

তবে ভূক্তভোগী চরবাসীর দাবি আশ্বাসে নয়, তারা চাই বালু খেকোদের বিরুদ্ধে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহলণ করে পদ্মার ভাঙন থেকে ফসলি জমি, বসত ঘর-বাড়ি ও বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধ রক্ষা করা হোক।

 


সম্পর্কিত খবর

;