কোরবানির আয়োজনেও বাধা, এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ

প্রকাশ : 30 May 2026
কোরবানির আয়োজনেও বাধা, এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ


যশোর অফিস: নড়াইলের কালিয়া উপজেলার সালামাবাদ ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা শামীম আহমেদের পারিবারিক কোরবানির আয়োজনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বিএনপি নেতাদের পুলিশি হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি ঘিরে এলাকায় ব্যাপক প্রতিক্রিয়া ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে একটি ধর্মীয় ও সামাজিক আয়োজনকে বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে, যা শুধু একটি পরিবারের নয়, বরং সামাজিক সম্প্রীতি ও সহনশীলতার উপরও আঘাত হেনেছে।


জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে শামীম আহমেদের পরিবার ঈদের পরদিন কোরবানি দিয়ে এলাকার এতিম শিশু, অসহায় নারী, প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনদের নিয়ে একটি পারিবারিক ও সামাজিক মিলনমেলার আয়োজন করে আসছে। স্থানীয়দের মতে, এটি ছিল রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে মানবিক ও সামাজিক বন্ধনকে শক্তিশালী করার একটি উদ্যোগ। কিন্তু বিগত বছরগুলোর মতো এবার সেই আয়োজন নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হতে পারেনি বলে অভিযোগ উঠেছে।


শামীম আহমেদ বলেন, "আমি বুঝতে পারছি না আমরা কোন সমাজে বাস করছি। রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে যদি একজন মানুষের ধর্মীয় অধিকার, সামাজিক অনুষ্ঠান করার অধিকার পর্যন্ত কেড়ে নেওয়া হয়, তাহলে এটি শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, পুরো সমাজের জন্য অশনিসংকেত। আমাদের গ্রামীণ সমাজে এমন ঘটনা আগে কখনও ঘটেনি।"


স্থানীয় অনেকেই মনে করছেন, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা কখনোই মানুষের ধর্মীয় ও সামাজিক অধিকারকে প্রভাবিত করতে পারে না। তাদের মতে, মতের অমিল থাকতেই পারে, কিন্তু ঈদ, কোরবানি বা সামাজিক ভোজের মতো মানবিক আয়োজনে বাধা দেওয়া কোনো সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হতে পারে না।


এদিকে, শামীম আহমেদের ভাই, জাগরণ টিভির সম্পাদক, লেখক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা এফ এম শাহীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে লেখেন,


"নড়াইল-১ আসনের সাংসদ ( বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলম) ও বিএনপির নেতারা আমাদের বাড়িতে পুলিশ পাঠিয়ে কোরবানির আয়োজনকে বাধাগ্রস্ত করে এক ভয়ঙ্কর অসভ্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন। নারী ও এতিম শিশুদের মুখের খাবার কেড়ে নেওয়ার যে নজির তৈরি হলো, তার ক্ষত দীর্ঘদিন মানুষ মনে রাখবে। তবুও আপনাদের জন্য শুভকামনা রইল।"


তিনি আরও বলেন, "দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে আমরা মিথ্যা মামলা, রাজনৈতিক হয়রানি ও ভয়ভীতির সংস্কৃতি দেখতে পাচ্ছি। আমাদের পরিবারের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে সাধারণ মানুষ ও শিশুদের জন্য আয়োজিত একটি সামাজিক অনুষ্ঠানও রেহাই পেল না।"


অন্যদিকে, অনলাইন পত্রিকা বিবার্তার সম্পাদক ও কলামিস্ট বাণী ইয়াসমিন হাসি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন,


"গ্রামের নারীরা সাধারণত সামাজিক আয়োজনে খুব কমই অংশ নেওয়ার সুযোগ পান। আমাদের মা বহু বছর ধরে গ্রামের নারীদের নিয়ে ইফতার করেন, ঈদের সময় একসঙ্গে ভাত খান। এবারও নারী ও শিশুদের জন্য মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন ছিল। কিন্তু পুলিশি হস্তক্ষেপের কারণে সেই খাবারও তাদের খেতে দেওয়া হয়নি। তাদের একমাত্র অপরাধ—তারা এমন একটি পরিবারের অতিথি, যার সদস্যরা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।"


হাড়িডাঙ্গা গ্রামের ইমন ফকির বলেন, এটি কোন রাজনৈতিক অনুষ্ঠান না। আমরা সবাই ঈদের পরের দিন শামিম চাচার বাড়িতে আরেকটা ঈদ করি। সবাই দলমত ভুলে একসাথে হই।  এখানে রাজনীতি আনা খুব খারাপ হয়েছে। আমরা মানতে পারছি না।


ঘটনাটি নিয়ে এলাকায় নানা আলোচনা চলছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা যদি মানুষের ধর্মীয় চর্চা, সামাজিক সম্পর্ক ও মানবিক উদ্যোগ পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তবে সমাজে সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের জায়গা কোথায় থাকবে?


স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, গণতান্ত্রিক সমাজে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু ধর্মীয় অধিকার, সামাজিক অনুষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রগুলোকে রাজনৈতিক সংঘাতের বাইরে রাখা জরুরি। অন্যথায় সামাজিক বিভাজন আরও গভীর হবে এবং পারস্পরিক আস্থার সংকট তৈরি হবে।

সম্পর্কিত খবর

;