ভাই ডেকেও নিজের জীবন বাঁচাতে পারেনি সোনিয়া
মোঃ সাইফুল্লাহ: সাভারের পৌর কমিউনিটি সেন্টারটি দিনের বেলায় যেমন নিরীহ, রাত নামলেই তেমনই হয়ে উঠত বিভীষিকার ঠিকানা। আলো-আঁধারির ভেতর সেখানে ঘুরে বেড়াত এক বিকৃত মানসিকতার মানুষ-যার চোখে ভিকটিমরা মানুষ ছিল না, ছিল শুধু শিকার। তার নাম মশিউর রহমান খান সম্রাট, পুলিশের খাতায় এখন পরিচিত ‘সাইকো সম্রাট’ নামে।
পরপর পাঁচটি লাশ উদ্ধারের ঘটনায় পুরো সাভার জুড়ে প্রথমে ছড়িয়ে পড়ে গুজব, সংশয় আর অবিশ্বাস। অনেকেই বিশ্বাস করতে চাননি-একই জায়গায় ধারাবাহিকভাবে হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে আর এসব হত্যাকাণ্ডের পিছনে সম্রাট জড়িত থাকতে পারে। ভবঘুরে মানুষদের মৃত্যু বলে ঘটনাগুলোকে হালকাভাবে নেওয়ার প্রবণতাও ছিল। কিন্তু পুলিশের চোখ এড়ায়নি একটি বিষয়-মৃত্যুগুলো ছিল অস্বাভাবিক, পরিকল্পিত এবং নৃশংস।
তদন্তের শুরুতেই পুলিশ বুঝতে পারে-এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি একটি সিরিয়াল প্যাটার্ন।
সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণে বেরিয়ে আসে ভয়ংকর সত্য। প্রতিটি ঘটনার আগে ও পরে একই ব্যক্তির উপস্থিতি, গভীর রাতে কমিউনিটি সেন্টারে ঢোকা, ভোরের আগে বেরিয়ে যাওয়া-সবকিছু মিলিয়ে একটাই নাম ঘুরে ফিরে আসে: মশিউর রহমান খান সম্রাট।
পুলিশ সূত্র জানায়, সম্রাট ছিল চরম বিকৃত মানসিকতার অধিকারী। সে ইচ্ছাকৃতভাবে ভবঘুরে নারী ও পুরুষদের টার্গেট করত। কারণ তারা সমাজের কাছে অদৃশ্য-নিখোঁজ হলেও কেউ খোঁজ নেয় না, মারা গেলেও কেউ দাবি করে না। এই সুযোগটাই ছিল তার অপরাধের সবচেয়ে বড় ঢাল।
তার বিকৃত মানসিকতার ভয়াবহতা সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে তানিয়া ওরফে সোনিয়ার ঘটনায়।
শুক্রবার দিবাগত গভীর রাতে বাসায় ফেরার পথে দৈনিক মানবজমিনের সাংবাদিক সোহেল রানা কমিউনিটি সেন্টারের ভেতর থেকে এক নারীর চিৎকার শুনে সাহসিকতার সঙ্গে ভেতরে প্রবেশ করেন, তিনি দেখতে পান সেখানে একাধিক লোকজনের উপস্থিতি। পরবর্তীতে পুলিশসহ ভেতরে প্রবেশ করে দেখা যায় এক অটিস্টিক প্রতিবন্ধী নারী-তানিয়া ওরফে সোনিয়াকে। পাশে শুয়ে ছিলেন সম্রাট। জিজ্ঞাসাবাদে সোনিয়া জানায়, সম্রাট তার ভাই।
সেখানে থাকা পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, ওই মুহূর্তে সম্রাট অত্যন্ত স্বাভাবিক আচরণ করছিল। যেন কিছুই ঘটেনি। তাকে ঘটনাস্থল থেকে সরে যেতে বললেও, সে সরে যায়নি। এই স্বাভাবিক মুখোশটাই ছিল তার সবচেয়ে ভয়ংকর দিক।
কিন্তু এর একদিন পর রোববার (১৮ জানুয়ারি) দুপুরে যখন কমিউনিটি সেন্টার থেকে উদ্ধার হওয়া দুটি লাশের পরিচয় প্রাথমিক শনাক্ত হয়, তখন সবাই স্তব্ধ। একটি লাশ ছিল সোনিয়ার।
যে নারী অটিজমের কারণে বাস্তবতা পুরোপুরি বুঝতে না পেরে “ভাই” সম্বোধন করে বাঁচতে চেয়েছিল, তাকেও নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। এই ঘটনাই স্পষ্ট করে দেয়-সম্রাটের কাছে কোনো সম্পর্কের মূল্য ছিল না। মানবিকতার শেষ চিহ্নটুকুও তার ভেতরে অবশিষ্ট ছিল না।
পুলিশের তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন,“সে শুধু মানুষ হত্যা করেনি, সে মানুষের বিশ্বাস, দুর্বলতা আর অসহায়ত্বকে ব্যবহার করেছে অস্ত্র হিসেবে।”
তদন্তে আরও জানা যায়, নিহতদের মধ্যে কেউ ছিলেন মানসিক ভারসাম্যহীন, কেউ প্রতিবন্ধী, কেউ দীর্ঘদিন পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন। তারা প্রত্যেকেই একসময় কারও সন্তান ছিল, কারও বোন, কারও ভাই। কিন্তু জীবনের কঠিন বাস্তবতায় তারা ছিটকে পড়েছিল ফুটপাথে।
একজন নারী ভিকটিম-যার পরিচয় আজও অজানা-কয়েক বছর আগে হয়তো স্বামী হারিয়ে রাস্তায় নেমেছিলেন। আরেকজন পুরুষ ভিকটিম হয়তো ছিলেন একসময় রিকশাচালক। অসুস্থতার পর কাজ হারিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন ভবঘুরে জীবনে। এই মানুষগুলোর মৃত্যুতে কেউ চোখের পানি ফেলেনি-এই সুযোগটাই নিয়েছিল ‘সাইকো সম্রাট’।
রোববার দুপুরে দুটি লাশ উদ্ধারের পর সাভার মডেল থানা পুলিশের তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যে সিসিটিভি ফুটেজ, স্থানীয় ভিডিও, প্রত্যক্ষদর্শীর তথ্য ও পারিপার্শ্বিক আলামত বিশ্লেষণ করে সম্রাটকে গ্রেপ্তার করা হয়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক টিম একযোগে কাজ করেছে। কেউ ফুটেজ বিশ্লেষণ করেছে, কেউ ভিকটিমদের গতিবিধি ট্র্যাক করেছে, কেউ আশপাশের মানুষের বক্তব্য সংগ্রহ করেছে। হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে থানা পুলিশের সঙ্গে যোগ দেয় ডিবি পুলিশ, সিআইডি, পিবিআই, র্যাব ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটে কর্মরত গোয়েন্দারা। সার্বক্ষণিক খোঁজ খবর রাখছিলেন ঢাকা জেলা পুলিশসহ পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এই সমন্বিত তদন্তই দ্রুত গ্রেপ্তারের পথ তৈরি করে।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সম্রাট পরপর পাঁচটি হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করেছে বলে নিশ্চিত করেছেন তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তবে পুলিশ আশঙ্কা করছে-সংখ্যাটি আরও বাড়তে পারে। তদন্ত এখনও চলমান।
প্রশ্ন উঠছে-এই সমাজে আর কত সোনিয়া হারিয়ে যাবে, আর কত ভবঘুরে মানুষ নিঃশব্দে খুন হবে, আর কতদিন আমরা অবহেলিতদের জীবনকে তুচ্ছ করে দেখব?
আজ সাভারের সেই কমিউনিটি সেন্টার শুধু একটি ভবন নয়। এটি একেকটি নিঃশব্দ আর্তনাদের সাক্ষী। আর ‘সাইকো সম্রাট’-সে শুধু একজন ঘাতক নয়, সে আমাদের সমাজের অদেখা ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।
এ ব্যাপারে সাভার মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আরমান আলী মানবজমিনকে বলেন, “প্রাথমিক তদন্তে আমরা নিশ্চিত হয়েছি, এটি পরিকল্পিত সিরিয়াল হত্যাকাণ্ড। অভিযুক্ত সম্রাটের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। তাকে সোমবার আদালতে তোলা হবে। আমরা নিশ্চিত করতে চাই-আর কোনো ভিকটিম যেন অন্ধকারে হারিয়ে না যায়।”
তদন্ত এখনও চলমান। পুলিশ খতিয়ে দেখছে-এই পাঁচটি জীবনই কি শেষ সংখ্যা, নাকি অন্ধকারে চাপা পড়ে আছে আরও কিছু নিঃশব্দ আর্তনাদ।
স্টাফ রিপোর্টার: ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) এর তেজগাঁও বিভাগের অভিযানে গত ২৪ ঘণ্টায় বিভিন্ন অপরাধে জড়িত মোট ৫১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
ডিএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) এন এম নাসিরুদ্দ ...
পিরোজপুর অফিস: পিরোজপুরের জিয়ানগর উপজেলার চণ্ডিপুর ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের বারান্দায় তিন শিশু সন্তানকে রেখে এক মা নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। নিখোঁজ ওই নারীর নাম মুক্তা বেগম (২৭)। বুধবার (৮ এপ্রিল) সকাল আন ...
উজিরপুর (বরিশাল) প্রতিনিধি: বরিশালের উজিরপুর উপজেলায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়ন ও প্রশাসনিক কার্যক্রম আরও গতিশীল করার লক্ষ্যে মাসিক আইনশৃঙ্খলা ও সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
৯ এ ...
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি: সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আশরাফুল আলমের স্বাক্ষর জালিয়াত করে ভূয়া প্রত্যায়ন তৈরির অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় ঠিকাদার শফিউর রহমানের বিরুদ্ধে।
সব মন্তব্য
No Comments