আহাছানুল মতিন নান্নু:
তেভাগা আন্দোলনের জনক ও উত্তরবঙ্গের কৃষক সমাজের অবিসংবাদিত নেতা হাজী মোহাম্মদ দানেশ ছিলেন অবিভক্ত বাংলার কৃষক আন্দোলনের এক শ্রদ্ধা ও সংগ্রামের নাম। ১৯৮৬ সালের ২৮ জুন ভোর ৪টা ২৫ মিনিটে ঢাকার তৎকালীন পিজি হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর পর দিনাজপুরের গোর-এ শহীদ বড় ময়দানে তাকে দাফন করা হয়। তার নামেই ১৯৯৯ সালে দিনাজপুরের কৃষি কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত করে প্রতিষ্ঠা করা হয় উত্তরবঙ্গের প্রথম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
হাজী মোহাম্মদ দানেশ ১৯০০ সালের ২৭ জুন দিনাজপুর জেলার বোচাগঞ্জ উপজেলার সুলতানপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত জোতদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মৌলভী সালামত উদ্দীন ছিলেন এলাকার ছোট জোতদার। গ্রামে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে সেতাবগঞ্জ থেকে প্রবেশিকা এবং রাজশাহী কলেজ থেকে আইএ ও বিএ পাস করেন। পরবর্তীতে ভারতের আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে এমএ এবং আইনে বিএল ডিগ্রি অর্জন করেন। কর্মজীবনের শুরুতে ঠাকুরগাঁও আদালতে আইন পেশা শুরু করেন এবং দিনাজপুর এসএন কলেজে ইতিহাসের অধ্যাপক হিসেবে শিক্ষকতা করেন। পরে দিনাজপুর জেলা আদালতে আইন ব্যবসা চালিয়ে যান। মাত্র ৩২ বছর বয়সে হজ পালন করায় অল্প বয়সেই তিনি ‘হাজী’ উপাধিতে পরিচিতি পান।
ছাত্রজীবনেই জমিদার ও জোতদারদের অত্যাচার দেখে তার মনে বিপ্লবের বীজ অঙ্কুরিত হয়। ১৯৩৮ সালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কমিউনিস্ট পার্টির অঙ্গসংগঠন কৃষক সমিতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে দিনাজপুরে টোল আদায় বন্ধ ও জমিদারি উচ্ছেদের দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলেন। এ আন্দোলনের সময় তিনি কারাবরণও করেন। ১৯৪২ সালে নীলফামারীর ডোমারে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় কৃষক সম্মেলনের অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন তিনি। চল্লিশের দশকে উত্তরবঙ্গই হয়ে ওঠে তেভাগা আন্দোলনের সূতিকাগার। কারণ এই অঞ্চল ছিল জোতদার প্রধান এলাকা। বর্গাচাষিদের অধিকার আদায়ে তার নেতৃত্বে দিনাজপুর, রংপুর, জলপাইগুড়ি, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন অঞ্চলে তেভাগা আন্দোলন সংগঠিত হয়।
তেভাগা আন্দোলনের মূল দাবি ছিল উৎপন্ন ফসলের তিন ভাগের দুই ভাগ চাষির জন্য নিশ্চিত করা। ‘নিজ খোলানে ধান তোলো’, ‘আধি নয় তেভাগা চাই’ ও ‘কর্জ ধানে সুদ নাই’ এই তিন দফা স্লোগানে তিনি রাজবংশী, সাঁওতাল, মুসলিম, হিন্দু সব সম্প্রদায়ের বর্গাচাষিকে এক কাতারে আনেন। জোতদারের খামারের পরিবর্তে কৃষকরা নিজেদের উঠানে ধান তুলতে শুরু করলে জোতদার শ্রেণি আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। সরকার তখন দমননীতি গ্রহণ করে। রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের নির্দেশে ত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশ হাজারের মতো উত্তেজিত কৃষক জনতার ওপর গুলি চালানো হয়। এতে কমপক্ষে পঁয়ত্রিশ জন নিহত এবং বহু মানুষ আহত হন। ১৯৫০ সালে নাচোলের দ্বিতীয় পর্যায়ের আন্দোলনে সরকার ১২টি গ্রাম পুড়িয়ে দেয়, বহু নারী নির্যাতনের শিকার হন এবং ইলা মিত্র গ্রেফতার হয়ে অমানুষিক নির্যাতন সহ্য করেন। তেভাগা আন্দোলনের সরাসরি প্রভাবেই ১৯৫০ সালে পূর্ববঙ্গ জমিদারি অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন প্রণীত হয়, যা কৃষকের জমির অধিকার প্রতিষ্ঠায় যুগান্তকারী ভূমিকা রাখে।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পূর্ববাংলার স্বাধিকার ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনেও হাজী দানেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৫২ সালে তিনি ‘গণতন্ত্রী দল’ নামে একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেন এবং দলের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৫৭ সালে গণতন্ত্রী দল বিলোপ করে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে গঠিত ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে যোগ দেন এবং দলের সহসভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৫৮ সালে দেশে সামরিক শাসন জারি হলে তিনি কারারুদ্ধ হন। ১৯৬৪ সালে ন্যাপের পূর্ব পাকিস্তান শাখার সাধারণ সম্পাদক এবং ১৯৬৫ সালে কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি হন। ১৯৭১ সালে ন্যাপ থেকে পদত্যাগ করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে মুজিবনগর সরকারের সঙ্গে কাজ করেন।
স্বাধীনতার পর ১৯৭৬ সালে তিনি জাতীয় গণমুক্তি ইউনিয়ন পুনরুজ্জীবিত করেন। ১৯৮০ সালে এই দল বিলোপ করে ‘হাজী দানেশ গণতান্ত্রিক পার্টি’ নামে নতুন দল গঠন করেন এবং সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৮৬ সালে তার দল জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টির সঙ্গে একীভূত হয় এবং তিনি জাতীয় কৃষক পার্টির প্রধান উপদেষ্টা নিযুক্ত হন। একই বছর দিনাজপুর থেকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে পরাজিত হন।
হাজী মোহাম্মদ দানেশের মৃত্যুর পর তার পরিবারের সদস্যরা এখন আর দিনাজপুরে থাকেন না। তার নিজ এলাকা বোচাগঞ্জের সুলতানপুরের হাজী দানেশ কলেজ ও হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়েও তার মৃত্যুবার্ষিকীতে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো কর্মসূচি পালিত হয় না বলে জানা গেছে। তবুও কৃষকের অধিকার, জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ এবং পূর্ববাংলার স্বাধিকার আন্দোলনের ইতিহাসে হাজী মোহাম্মদ দানেশ এক প্রবাদ পুরুষের নাম। কমিউনিস্ট আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত তার রাজনৈতিক জীবন ছিল আপসহীন। আজও উত্তরবঙ্গের কৃষক সমাজ তাকে স্মরণ করে ‘তেভাগার জনক’ হিসেবে।
লেখক: একজন সাংবাদিক ও যুগবার্তা ডটকমের বোচাগঞ্জ প্রতিনিধি , দিনাজপুর।
সামসুল আলম সজ্জনপৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা—ফুটবল বর্তমান সময়ে সারাবিশ্বকে মাতিয়ে রেখেছে। বিশ্বব্যাপী প্রায় ৩.৫ থেকে ৪ বিলিয়ন (৩৫০ থেকে ৪০০ কোটি) অনুসারী বা ভক্ত এই খেলাকে ভালোবাসে, সমর্থন করে এবং ন ...
মানিক লাল ঘোষ:বাঙালি জাতির ইতিহাসে এমন কিছু ব্যক্তিত্ব থাকেন, যারা ব্যক্তিগত শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে একটি জাতির বিবেককে জাগ্রত করেন। শহীদ জননী জাহানারা ইমাম তেমনই এক বিরল নাম। ১৯২৯ সালের ৩ মে অবিভ ...
নিকোলাস বিশ্বাস:খেলাধূলা যুগে যুগে মানুষের সবচেয়ে জনপ্রিয় বিনোদন মাধ্যম এবং সামাজিক সংযোগের অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে গণ্য হয়েছে। খেলার মাঠের রোমাঞ্চ শুধুমাত্র শারীরিক সক্ষমতার প্রদর্শনী নয় ...
এ এম ইমদাদুল ইসলাম: বাংলাদেশ আজ বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। ভৌগোলিক অবস্থান, নদীবাহিত ভূ-প্রকৃতি এবং ঘনবসতির কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব এখানে দ্রুত দৃশ্যমান হচ্ছে। সমুদ্রপৃ ...
সব মন্তব্য
No Comments