আতিকুল ইসলাম টিটু:
জাতীয় সংসদ ভবন শুধু একটি প্রশাসনিক স্থাপনা নয়; এটি জাতীয় সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র এবং জনগণের রাজনৈতিক ইচ্ছার সাংবিধানিক প্রতীক। সেই সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম স্বাধীনতা দিবস উদযাপন এবং একই সময়ে সংসদ সদস্যদের নিয়ে ‘Caucus of America in National Parliament of Bangladesh’ গঠনের উদ্যোগ স্বাভাবিকভাবেই জনপরিসরে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ঘটনাটিকে কেউ কূটনৈতিক সৌজন্য ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের স্বাভাবিক বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন, আবার সমালোচকদের একটি অংশ এটিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও ভূরাজনৈতিক অবস্থানের পরিবর্তিত বাস্তবতার প্রতীক হিসেবে মূল্যায়ন করছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী, এই ককাসের নেতৃত্বে রয়েছেন কিশোরগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ড. মো. ওসমান ফারুক এবং ময়মনসিংহ-৭ আসনের সংসদ সদস্য ড. মাহবুবুর রহমান। সদস্য হিসেবে রয়েছেন ব্যারিস্টার নওশাদ জামির, ব্যারিস্টার আন্দালীব রহমান, হুমাম কাদের চৌধুরী, আখতার হোসেন, মীর আহমেদ বিন কাসেম, নিপুণ রায় চৌধুরী, সানজিদা ইসলাম এবং মারদিয়া মমতাজ। এই তালিকার আনুষ্ঠানিক সংসদীয় প্রকাশনা ও সাংগঠনিক কাঠামো সম্পর্কে আরও সরকারি ব্যাখ্যা প্রয়োজন হলেও, এর রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে।
ঘটনাটির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক সম্ভবত এই যে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভিন্ন মতাদর্শের প্রতিনিধিরা একই প্ল্যাটফর্মে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের প্রশ্নে একত্রিত হতে দেখা যাচ্ছে। সমর্থকদের মতে, এটি বাংলাদেশের বৃহত্তম রপ্তানি বাজারগুলোর একটি এবং গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন অংশীদারের সঙ্গে সংসদীয় পর্যায়ে সম্পর্ক উন্নয়নের একটি স্বাভাবিক উদ্যোগ। কিন্তু সমালোচকদের প্রশ্ন ভিন্ন। তাঁদের মতে, কেন একটি নির্দিষ্ট রাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে সংসদে একটি বিশেষ ককাস গঠন করা হলো? কেন এই সময়েই হলো? এবং এটি কি কেবল সাংসদদের মধ্যে বন্ধুত্ব বাড়ানোর উদ্যোগ, নাকি বৃহত্তর কৌশলগত সম্পর্কের একটি অংশ?
আন্তর্জাতিক রাজনীতির ইতিহাস বলে, কোনো পরাশক্তি কেবল সামরিক উপস্থিতির মাধ্যমে তার প্রভাব বিস্তার করে না। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ থেকে যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং পরবর্তীকালে চীন—সবাই অর্থনীতি, সংস্কৃতি, শিক্ষা, উন্নয়ন সহযোগিতা, সংসদীয় কূটনীতি এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করেছে। আধুনিক আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষায় একে বলা হয় সফট পাওয়ার; আর সমালোচনামূলক রাজনৈতিক অর্থনীতির ভাষায় এটি প্রভাব, সম্মতি ও নীতিগত অভিমুখ গঠনের দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া।
সাম্রাজ্যবাদের ইতিহাসে কোনো ভূখণ্ডের গুরুত্ব তার তথাকথিত 'গণতন্ত্রের বিকাশ' বা 'মানবাধিকার রক্ষার' জন্য নির্ধারিত হয় না; বরং নির্ধারিত হয় তার ভৌগোলিক অবস্থান, সস্তা শ্রমের জোগান এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার তীব্র পুঁজিতান্ত্রিক তাগিদে। বঙ্গোপসাগরের উত্তর উপকূলে অবস্থিত বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্য পথ এবং বিশেষ করে মালাক্কা প্রণালীর বিকল্প সমুদ্রপথের অত্যন্ত কৌশলগত অবস্থানে রয়েছে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ‘ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল’ এবং চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ’—উভয় পুঁজিতান্ত্রিক ও সাম্রাজ্যবাদী প্রকল্পের ভূ-কৌশলগত সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে আজ বাংলাদেশের অবস্থান। দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের দৃষ্টিতে, এই ভৌগোলিক অবস্থানই বাংলাদেশের মেহনতি মানুষের জন্য এক বড় সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে পরাশক্তির নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ থাকবে, সে মূলত ভারত মহাসাগর ও সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক করিডোরকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে। পরাশক্তিগুলোর কাছে বাংলাদেশ কোনো স্বাধীন মানবিক সত্তা নয়, বরং একটি কৌশলগত অঞ্চল বা লুণ্ঠনের ভূখণ্ড। ফলে, বাংলাদেশের মেহনতি মানুষের সস্তা শ্রমের বাজার, নতুন উপভোক্তা শ্রেণী এবং এই কৌশলগত জলসীমার ওপর একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করতেই বৈশ্বিক পুঁজিপতিরা আজ এদেশীয় নীতিনির্ধারণী কাঠামোকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ আজ এমন এক ভূরাজনৈতিক অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে তাকে ঘিরে একাধিক বৈশ্বিক শক্তির আগ্রহ ক্রমশ বাড়ছে। বঙ্গোপসাগর, ভারত মহাসাগরের সামুদ্রিক যোগাযোগ, মিয়ানমারের চলমান সংকট, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের নিরাপত্তা, বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল এবং দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষমতার ভারসাম্য—সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশ আর কেবল একটি উন্নয়নশীল দেশ নয়; বরং বৃহৎ শক্তিগুলোর কৌশলগত প্রতিযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, চীন, রাশিয়া, জাপান এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন—প্রত্যেকেই ভিন্ন ভিন্ন স্বার্থে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করতে আগ্রহী।
এই প্রেক্ষাপটে সংসদ প্লাজায় মার্কিন স্বাধীনতা দিবস উদযাপনকে শুধুমাত্র একটি আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠান হিসেবে দেখা কঠিন। এটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হলো, যখন বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শ্রম, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল নিয়ে আলোচনা আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। একই সঙ্গে মিয়ানমার সংকট, রাখাইন অঞ্চলের অস্থিতিশীলতা এবং বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত গুরুত্ব আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
তবে এখানেই একটি বিষয় স্পষ্ট রাখা জরুরি। কোনো কূটনৈতিক অনুষ্ঠান বা সংসদীয় ককাসের অস্তিত্ব নিজেই প্রমাণ করে না যে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে কোনো নির্দিষ্ট সামরিক বা নিরাপত্তা চুক্তিতে যুক্ত হবে। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে প্রশ্ন তোলা বৈধ যে, এই ধরনের উদ্যোগ কি ভবিষ্যতের আরও ঘনিষ্ঠ কৌশলগত সহযোগিতার জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে নয়, বরং সামগ্রিক প্রেক্ষাপটকে দেখতে হবে।
গত ৪ঠা জুলাই জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ কূটনৈতিক অনুষ্ঠান উদযাপন এবং এর সমান্তরালে ‘পার্লামেন্টারি ককাস অন আমেরিকা’ গঠনের ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন সাংস্কৃতিক সৌহার্দ্য বা নিছক প্রটোকলের অংশ নয়। ঐতিহাসিক ও দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের (Historical and Dialectical Materialism) কষ্টিপাথরে বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট দেখা যায়, এটি আসলে বৈশ্বিক লগ্নিপঁজি বা লুণ্ঠনমূলক পুঁজির ধারক-বাহক মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের এক আগ্রাসী সাংস্কৃতিক হেজেমনি (Hegemony) এবং এদেশের দালাল বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলগুলোর নতজানু আপসকামিতার এক চরম বহিঃপ্রকাশ। একবিংশ শতাব্দীর এই পর্বে এসে পুঁজি সঞ্চয়ন এবং পুনরুৎপাদনের সংকটে পড়া মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও তার প্রধান প্রতিপক্ষ—উদীয়মান অর্থনৈতিক পরাশক্তি চীন ও রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ—বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে এক তীব্র মরণপণ দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়েছে। এই দ্বন্দ্বে বাংলাদেশকে একটি ভূ-রাজনৈতিক প্রক্সি বা রণক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহারের বস্তুগত হাতিয়ার হিসেবে হাজির করা হয়েছে মার্কিন ‘বার্মা আইন’ (BURMA Act)। যা মূলত তাদের জাতীয় প্রতিরক্ষা অনুমোদন আইনের অংশ—তা কেবল মিয়ানমারের জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে কোনো মানবিক পদক্ষেপ নয়। এটি আসলে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সীমান্তে মার্কিন সামরিক ও রাজনৈতিক গোয়েন্দা তৎপরতা বৈধ করার একটি আইনি ঢাল। এই আইনের মাধ্যমে আমেরিকা মিয়ানমারের জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে এবং জাতীয় ঐক্য সরকারকে অর্থ ও অ-মারাত্মক সামরিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে, যার আসল লক্ষ্য হলো বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত অঞ্চলে (বিশেষ করে সেন্ট মার্টিন, কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম সংলগ্ন এলাকায়) একটি দীর্ঘমেয়াদী অস্থিরতা জিয়ন্ত রাখা। এই আইনের মোড়কে আমেরিকা যেকোনো সময় মানবিক বিপর্যয় বা সন্ত্রাসবাদের দোহাই দিয়ে বাংলাদেশ সীমান্ত অঞ্চলে সরাসরি হস্তক্ষেপের অজুহাত তৈরি করছে। সেন্ট মার্টিনে একটি লজিস্টিক বা সামরিক উপস্থিতি নিশ্চিত করতে পারলে আমেরিকা সরাসরি চীনের মালবাহী জাহাজের পথ এবং মিয়ানমারের গ্যাস পাইপলাইনের ওপর নজরদারি করতে পারবে। একই সাথে, এই আইনটি রোহিঙ্গা সংকটকে সমাধানের পরিবর্তে এটিকে চিরস্থায়ী ভূ-রাজনৈতিক কার্ডে পরিণত করার বস্তুগত ভিত্তি তৈরি করে, যাতে বাংলাদেশকে সবসময় মার্কিন সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল থাকতে হয় এবং মার্কিন সামরিক শর্ত মেনে নিতে বাধ্য করা যায়।
মার্ক্সীয় তত্ত্ব আমাদের শেখায়, সমাজের উপরিউক্ত কাঠামো (Superstructure)—যেমন রাজনীতি, আইন, দ্বিপাক্ষিক চুক্তি, সংস্কৃতি বা উৎসব—সব সময়ই তার অর্থনৈতিক ভিত্তি (Economic Base)-র শ্রেণীস্বার্থ রক্ষা ও তাকে বৈধতা দেওয়ার জন্য কাজ করে। কাগজের পাতায় সার্বভৌমত্বকে যতই উচ্চকিত করা হোক না কেন, দেশের নীতিনির্ধারকেরা যখন নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে বা ভূ-রাজনৈতিক চাপে আপস করতে মরিয়া হয়, তখন সার্বভৌমত্ব পরিণত হয় একটি ফাঁপা মরীচিকায়। উৎপাদন পদ্ধতি ও উৎপাদন সম্পর্কের ওপর যতক্ষণ না মেহনতি জনগণের প্রকৃত মালিকানা প্রতিষ্ঠা হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত রাষ্ট্র কাঠামো মূলত মুষ্টিমেয় শোষক শ্রেণীর অভ্যন্তরীণ স্বার্থ রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক পুঁজির দাসত্ব নিশ্চিত করার যান্ত্রিক হাতিয়ার হিসেবেই কাজ করে।
এদেশের রাজনীতিতে যারা মাঠের লড়াইয়ে পরস্পরকে নিশ্চিহ্ন করতে মরিয়া—সেই প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর বাঘা বাঘা নেতারা সেদিন সংসদ প্লাজার মার্কিন সানাইয়ের সুরে সুর মিলিয়ে এক কাতারে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। এই যৌথ তোষণের মহড়ায় উপস্থিত ছিলেন সংসদের প্রধান রাজনৈতিক দলসমূহের শীর্ষস্থানীয় নেতা, সাবেক ও বর্তমান সংসদ সদস্য এবং পররাষ্ট্র বিষয়ক কূটনৈতিক প্রতিনিধিবৃন্দ। ক্ষমতার কামড়াকামড়িতে লিপ্ত এই দালাল বুর্জোয়া দলগুলো ওয়াশিংটনের ডেরায় হাজিরা দেওয়ার প্রতিযোগিতায় সেদিন যেন এক পরম ও অভূতপূর্ব ঐক্যে বিলীন হয়ে গিয়েছিল। উৎসবের মঞ্চে ও প্যান্ডেলে দাঁড়িয়ে তারা আমেরিকার শাসনতান্ত্রিক ইতিহাসকে "গণতন্ত্র, ব্যক্তি স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের বৈশ্বিক বাতিঘর" হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে (বিশেষ করে ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজির অধীনে) বাংলাদেশ আমেরিকার সবচেয়ে "নির্ভরযোগ্য এবং বিশ্বস্ত কৌশলগত অংশীদার" হিসেবে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে আশ্বস্ত করেন।
এই যৌথ স্তুতিগীতি কেবল উৎসবের প্যান্ডেলেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এর প্রাতিষ্ঠানিক সিলমোহর পড়েছে খোদ সংসদ ভবনের ভেতরে—একটি বিশেষ 'পার্লামেন্টারি ককাস অন আমেরিকা' গঠনের মধ্য দিয়ে। রাজনৈতিক ও সংসদীয় পরিভাষায় 'ককাস' (Caucus) বলতে এমন একটি সুনির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা ফোরামকে বোঝায়, যেখানে অভিন্ন রাজনৈতিক দল, আদর্শ, অথবা কোনো বিশেষ স্বার্থ বা এজেন্ডা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আইনপ্রণেতারা একত্রিত হন; যার মূল উদ্দেশ্য হলো সংসদের ভেতরে বা বাইরে কোনো নির্দিষ্ট আইন, দ্বিপাক্ষিক নীতি কিংবা কোনো বিশেষ দেশের বা কর্পোরেট গোষ্ঠীর স্বার্থের পক্ষে যৌথভাবে লবিং করা ও কৌশল নির্ধারণ করা। দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের পরিভাষায়, এই নবগঠিত মার্কিন ককাসটি আসলে আর কিছুই নয়; বরং মার্কিন লবিস্ট, কূটনীতিক ও বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলোর মাধ্যমে এদেশের আইনপ্রণেতাদের সরাসরি 'পলিসি ক্যাপচার' বা নীতি অপচরণের এক চতুর বন্দোবস্ত। যখন একটি রাষ্ট্রের আইনপ্রণেতারাই স্বপ্রণোদিত হয়ে সাম্রাজ্যবাদের পক্ষে ওকালতি করার জন্য সংসদের ভেতরে এই ধরনের বিশেষ গোষ্ঠী তৈরি করেন, তখন বুঝতে বাকি থাকে না যে, এদেশের নীতিনির্ধারণী কাঠামো সাধারণ মেহনতি মানুষের স্বার্থ থেকে কতটা দূরে সরে গেছে।
মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ কেবল সামরিক জোটে বিশ্বাসী নয়; বরং তাদের নয়া-উপনিবেশবাদী শোষণের সবচেয়ে ধারালো অস্ত্র হলো বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক পরিকাঠামো, যা মূলত এদেশের সার্বভৌমত্বকে মার্কিন বহুজাতিক কর্পোরেশনের অনুকূলে নিয়ে যাওয়ার আইনি দলিল। ২০১৩ সালে বাংলাদেশের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ‘টিকফা’ চুক্তি এবং ‘ওপিক’ ফ্রেমওয়ার্কের ধারাবাহিকতায় এর সবচেয়ে বড় রূপরেখাটি চূড়ান্ত রূপ পায় গত ৯ই ফেব্রুয়ারি ওয়াশিংটনে স্বাক্ষরিত 'Agreement on Reciprocal Trade' (ART) বা পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে। শুল্ক সমতা ও অবাধ বাণিজ্যের চটকদার বিজ্ঞাপনের আড়ালে এই চুক্তিটি মূলত এদেশের বাজারকে মার্কিন একচেটিয়া পুঁজির কাছে ইজারা দেওয়ার প্রাতিষ্ঠানিক রূপরেখা। এই 'Agreement on Reciprocal Trade' (ART) চুক্তির অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল পণ্যের জন্য একটি শুল্কমুক্ত (Zero Reciprocal Tariff) মেকানিজম তৈরি করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সেই পোশাক আমদানির ভলিউম বা পরিমাণ নির্ধারিত হবে বাংলাদেশ কর্তৃক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিকৃত টেক্সটাইল ইনপুট এবং ইউএস-প্রডিউসড কটনের (U.S. produced cotton) পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে। অর্থাৎ, মার্কিন তুলা ব্যবসায়ীদের বাজার গ্যারান্টির সাথে আমাদের তৈরি পোশাকের বাজারকে বেঁধে দেওয়া হয়েছে।
একই সাথে, এই চুক্তির অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি মনে করে বাংলাদেশ এই চুক্তির কোনো শর্ত মানছে না, তবে তারা দ্বিপাক্ষিক আলোচনার চেষ্টা করবে এবং তা ব্যর্থ হলে তারা একতরফাভাবে এক্সিকিউটিভ অর্ডার ১৪২৫৭ (Executive Order 14257)-এর অধীনে নির্ধারিত রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ রেট পুনরায় আরোপ করতে পারবে। অন্যদিকে অনুচ্ছেদ -এর শর্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশ যদি আমেরিকার স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করে এমন কোনো তৃতীয় দেশের সাথে নতুন কোনো ডিজিটাল বাণিজ্য চুক্তি করে, তবে আমেরিকা এই চুক্তি সম্পূর্ণ বাতিল বা টার্মিনেট করার একক অধিকার রাখে। এই চুক্তির সমান্তরালে সংযুক্তি III (Annex III)-এর বিভাগ ৩-এর ২ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বাংলাদেশ আগামী ১৫ বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের মার্কিন জ্বালানি (বিশেষ করে মার্কিন এলএনজি) এবং ৩.৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের মার্কিন কৃষিপণ্য (যার মধ্যে প্রতি বছর অন্তত ৭ লাখ মেট্রিক টন গম এবং ১.২৫ বিলিয়ন ডলারের সয়াবিন অন্তর্ভুক্ত) ক্রয়ের জন্য "সর্বাত্মক প্রচেষ্টা বা এন্ডেভার" করার আইনি প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ হয়েছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে মার্কিন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার (USAID) সাথে ২০০ মিলিয়ন ডলারের নতুন অনুদান চুক্তি, যার নেপথ্যে রয়েছে মার্কিন করপোরেট সুশাসনের মডেলে এদেশের রাজস্ব ও কর খাতকে ঢেলে সাজানোর শর্ত। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের শর্ত মেনে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি পুরোপুরি প্রত্যাহার করা এবং বাজারভিত্তিক সংস্কারের যে চাপ সরকারের ওপর রয়েছে, তা সরাসরি মেহনতি ও নিম্নবিত্ত মানুষের ওপর চরম মূল্যস্ফীতির বোঝা চাপিয়ে দেয়; পক্ষান্তরে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর জন্য এদেশের বাজারকে অবাধ মুনাফা লুণ্ঠনের জন্য উন্মুক্ত করে।
এই সামগ্রিক ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যখন তড়িঘড়ি করে বাংলাদেশের সংসদ সদস্যদের নিয়ে ‘আমেরিকা বিষয়ক সংসদীয় বিশেষ গোষ্ঠী’ বা ককাস গঠন করা হয়, তখন বুঝতে বাকি থাকে না যে, মার্কিন লবিস্ট, কূটনীতিক ও কর্পোরেট গ্রুপগুলো বাংলাদেশের আইনপ্রণেতাদের সরাসরি 'নীতিগতভাবে করায়ত্ত' বা নীতি অপচরণের বন্দোবস্ত করেছে। পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির ফাঁদ, নব্য-উদারতাবাদী সংস্কারের শর্ত, ‘ব্রেভ বার্মা অ্যাক্ট’-এর চাপ এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার জুজু দেখিয়ে বাংলাদেশের ধনী শ্রেণীকে সম্পূর্ণ কোণঠাসা করে ফেলা হয়েছে। লুই কানের স্থাপত্যশৈলী কিংবা ফজলুর রহমান খানের অবদানের মতো অতীত ঐতিহাসিক প্রাঙ্গণের দোহাই দিয়ে সংসদ চত্বরে মার্কিন উৎসবের যে নান্দনিক ন্যায্যতা দেওয়া হচ্ছে, তা আসলে জনগণের রাজনৈতিক ও বিপ্লবী চেতনাকে অবশ করার একটি ‘সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদ’ বা সাংস্কৃতিক আধিপত্য মাত্র। নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা, লুণ্ঠিত পুঁজি রক্ষা করা এবং পশ্চিমা অর্থবাজারে পাচার করা ধনসম্পদকে সুরক্ষিত রাখতে এদেশের শাসক ও ধনিক শ্রেণী আজ মার্কিন থাবার সামনে সম্পূর্ণ নতজানু হয়ে আত্মসমর্পণ করেছে।
সদ্য গঠিত ‘পার্লামেন্টারি ককাস অন আমেরিকা’ মূলত এদেশের সংসদকে ব্যবহার করে মার্কিন লগ্নিপুঁজির এই এজেন্ডা ও শর্তসমূহ তদারকি করার একটি নয়া-উপনিবেশবাদী ওয়াচডগ (Watchdog) হিসেবেই কাজ করবে।
বাংলাদেশে আজ আমরা সেই আন্তঃ-সাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্বের (Inter-Imperialist Rivalry) এক নগ্ন রূপ দেখছি, যার দুই প্রান্তে রয়েছে ভিন্ন অর্থনৈতিক চরিত্রের দুই পুঁজিতান্ত্রিক ব্লক। মার্কিন একচেটিয়া পুঁজি যখন তার বৈশ্বিক একাধিপত্য ধরে রাখতে এদেশের বাজারকে নব্য-উদারতাবাদী আইনি ফ্রেমওয়ার্কে বাঁধছে, তখন চীন-রাশিয়ার প্রতিপক্ষ শিবিরের অভ্যন্তরীণ পুঁজিতান্ত্রিক চরিত্রটিও গভীর মার্ক্সীয় ব্যবচ্ছেদের দাবি রাখে। চীনে বর্তমানে ক্রিয়াশীল রয়েছে রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তি পুঁজির এক দ্বান্দ্বিক সংমিশ্রণ (State Monopoly Capitalism)। সেখানে উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর সাধারণ শ্রমিকের বা প্রলেতারিয়েতের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ নেই; শ্রমিকেরা নির্দিষ্ট মজুরির বিনিময়ে তাদের শ্রমশক্তি বিক্রি করে এবং এই শ্রম থেকে যে বিপুল উদ্বৃত্ত মূল্য (Surplus Value) তৈরি হয়, তা রাষ্ট্র ও পার্টির তহবিলে জমা হয়। এই বিপুল পরিমাণ উদ্বৃত্ত পুঁজি খাটানোর জন্য তারা বাংলাদেশের মেগা প্রজেক্ট ও যোগাযোগ খাতকে ঋণের ফাঁদে গ্রাস করতে চায়। অন্যদিকে, রাশিয়ার অর্থনৈতিক চরিত্রটি ১৯৯০-৯১ সালে সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ সোভিয়েত ইউনিয়নের আনুষ্ঠানিক বিলুপ্তির পর পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের প্রেসক্রিপশনে (আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংক) চাপিয়ে দেওয়া "আকস্মিক রূপান্তর প্রক্রিয়া" বা শক থেরাপির মধ্য দিয়ে গেছে, যা রাষ্ট্রায়ত্ত একচেটিয়া পুঁজিবাদের এক ঝটকায় পতন ঘটিয়ে চরম ও অবাধ ব্যক্তি পুঁজিবাদের রাজত্ব কায়েম করে। লুণ্ঠনমূলক বেসরকারীকরণের মাধ্যমে রাতারাতি জন্ম হয় রাশিয়ার একচেটিয়া ব্যক্তি পুঁজিপতি শ্রেণী বা প্রভাবশালীদের। কিন্তু ঐতিহাসিক দ্বান্দ্বিকতার নিয়মে, ২০০০ সালের পর ভ্লাদিমির পুতিনের নেতৃত্বে রাশিয়ার সামরিক-আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রশক্তি পুনরায় ব্যক্তি পুঁজিপতিদের ওপর চড়াও হয় এবং অবাধ্য ধনকুবেরদের সম্পদ রাষ্ট্র বাজেয়াপ্ত করে নেয়। বর্তমান রাশিয়া তাই রূপান্তরিত হয়েছে একটি "ক্রোনি বা প্রভাবশালী-নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ"-এ, যেখানে প্রধান প্রধান অর্থনৈতিক ভিত্তিগুলো হয় সরাসরি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন, অথবা ক্রেমলিনের অনুগত ও পকেটস্থ ধনাঢ্য ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত। রাশিয়া রূপপুরের মতো দীর্ঘমেয়াদী ও ব্যয়বহুল পারমাণবিক প্রকল্পের মাধ্যমে এদেশের প্রযুক্তিবিদ ও আমলাতন্ত্রের ওপর এই রাষ্ট্রীয় পুঁজিরই আধিপত্য ও কাঠামোগত নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখছে।
ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'সাম্রাজ্যবাদ: পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ স্তর'-এ দেখিয়েছিলেন কীভাবে একচেটিয়া পুঁজিবাদের বিকাশের পর পরাশক্তিগুলোর মধ্যে বিশ্ব পুনর্বণ্টনের তীব্র প্রতিযোগিতা শুরু হয়। বাংলাদেশে আজ আমরা সেই আন্তঃ-সাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্বের এক নগ্ন রূপ দেখছি। একদিকে মার্কিন একচেটিয়া পুঁজি তার ক্ষীয়মাণ বৈশ্বিক আধিপত্য ধরে রাখতে বাংলাদেশকে সম্পূর্ণভাবে নিজেদের রাজনৈতিক ও সামরিক বলয়ে যুক্ত করতে মরিয়া। সংসদ ভবনের দক্ষিণ চত্বরে উৎসবের মাধ্যমে তারা এদেশীয় ধনী শ্রেণীকে এই বার্তাই দিয়েছে যে, নীতি নির্ধারণের চাবিকাঠি এখন ওয়াশিংটনের পকেটে। অন্যদিকে, চীন তার বিপুল উদ্বৃত্ত পুঁজি খাটানোর জন্য বাংলাদেশের পরিকাঠামো খাত এবং গভীর সমুদ্রের নীল অর্থনীতি গ্রাস করতে চায়। পাশাপাশি রাশিয়া রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি প্রকল্পের মাধ্যমে এদেশের কারিগরি ও আমলাতন্ত্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখছে। এই দুই পরাশক্তি শিবিরের দ্বন্দ্বের মাঝে পড়ে বাংলাদেশের শাসক শ্রেণী মূলত একটি দুই নৌকায় পা দিয়ে চলার নীতি গ্রহণ করেছে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের কথিত সার্বভৌমত্বকে এক গভীর অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এদেশের অর্থনীতিকে ক্রমান্বয়ে বৈদেশিক ঋণের জালে জর্জরিত এবং দেউলিয়াত্বের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
ঐতিহাসিক বস্তুবাদের অর্থনৈতিক সূত্র অনুযায়ী, পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থায় কোনো রাষ্ট্রই বিচ্ছিন্ন কোনো দ্বীপ নয়। বাংলাদেশ আজ বৈস্মিক উদ্বৃত্ত মূল্য শোষণের এক বিশাল আন্তর্জাতিক চারণভূমি। এদেশের তৈরি পোশাক খাতের সস্তা শ্রম, যা মূলত লাখ লাখ নারী ও পুরুষ শ্রমিকের হাড়ভাঙা খাটুনি এবং চরম মজুরি-শোষণের বিনিময়ে অর্জিত হয়, তা পশ্চিমা পুঁজিপতিদের সস্তা পণ্যের জোগান দেয় এবং তাদের একচেটিয়া পুঁজির সর্বোচ্চ মুনাফা নিশ্চিত করে। সংসদ ভবনের দক্ষিণ চত্বরে যে মার্কিন পতাকা উড়েছে এবং প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর যে সুরের ঝংকার উঠেছে, তা নির্দেশ করে—এদেশের নীতিনির্ধারকেরা এখন আর নিজেদের দেশের শোষিত জনগণের প্রতি বিন্দুমাত্র দায়বদ্ধ নন, অথচ তারা আন্তর্জাতিক পুঁজিতান্ত্রিক কাঠামোর বিশ্বস্ত ও আজ্ঞাবহ আঞ্চলিক ব্যবস্থাপকে পরিণত হয়েছেন। এই ব্যবস্থা দেশের মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের জন্য এক ধরনের চটকদার ভোগবাদী সংস্কৃতির জন্ম দেয়, যা আসল শ্রেণী বৈষম্য, আকাশচুম্বী মূল্যস্ফীতি, শ্রমের লুণ্ঠন ও চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয়কে সুনিপুণভাবে আড়াল করে রাখে।
ঐতিহাসিক ও দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের অপরিবর্তনীয় নিয়মানুযায়ী, বাংলাদেশের তথাকথিত স্বাধীনতা বা সার্বভৌমত্ব ও বুর্জোয়া গণতন্ত্রের চটকদার মুখোশ আজ বিশ্ব পুঁজির বাজারে সম্পূর্ণ উন্মোচিত ও চূর্ণ-বিচূর্ণ। বাংলাদেশ আজও কোনো প্রকৃত স্বাধীন বা স্বয়ংসম্পূর্ণ রাষ্ট্র নয়, বরং বৈশ্বিক পুঁজিপতিদের লুণ্ঠনের চারণভূমি এবং আন্তঃ-সাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্বের শিকার এক আধুনিক নয়া-উপনিবেশ। তবে সাম্রাজ্যবাদের এই তীব্র আন্তর্জাতিক চাপ, নব্য-উদারতাবাদী দাসত্বের অর্থনৈতিক ফ্রেমওয়ার্ক এবং দেশীয় ধনী ও আমলাদের নতজানু তোষণনীতি এদেশের মেহনতি মানুষ, কৃষক, শ্রমিক শ্রেণী ও সচেতন তরুণ সমাজের মনে এক তীব্র বিপরীতমুখী ঐতিহাসিক দ্বন্দ্বের জন্ম দিচ্ছে। মার্ক্সীয় দ্বান্দ্বিকতা আমাদের শেখায়—যেখানে চরম শোষণ থাকে, সেখানেই তার গর্ভে বিপরীত শক্তির বিকাশ ঘটে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, পশ্চিমা আর্থিক পুঁজি কিংবা চীন-রাশিয়ার লুণ্ঠনমূলক রাষ্ট্রীয় ও একচেটিয়া পুঁজি—কোনো পক্ষই বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের প্রকৃত মুক্তি এনে দেবে না। এই বিদ্যমান পুঁজিতান্ত্রিক, শোষক ও নতজানু ব্যবস্থার আমূল উচ্ছেদ ঘটিয়ে উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর জনগণের প্রকৃত যৌথ মালিকানা এবং একটি সত্যিকার বৈপ্লবিক সমাজকাঠামো ও সর্বহারার রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত—এই ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দাসত্ব থেকে বাংলাদেশের মেহনতি মানুষের মুক্তি সম্পূর্ণ অসম্ভব।
।। মুক্তার হোসেন নাহিদ ।।হাইটিনা, জাপান্টিনা কিংবা নরওয়েন্টিনা—যে নামেই ট্রল করা হোক না কেন, আর্জেন্টিনার কট্টর সমর্থক হওয়ার পরেও আমি সবসময় ব্রাজিলের বিজয় কামনা করেছি। কারণ বিশ্ব ফুটবল উন্মাদনার ...
বিল্লাল বিন কাশেম:একটি দেশের উন্নয়নের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি তার মানবসম্পদ। প্রাকৃতিক সম্পদ, অবকাঠামো কিংবা প্রযুক্তিগত অগ্রগতি যতই থাকুক না কেন, দক্ষ, সৃজনশীল ও কর্মমুখী জনগোষ্ঠী ছাড়া টেকসই উন্নয়ন স ...
আফসানা আরেফিন:আমরা এক অদ্ভুত প্যারাডক্স বা আপাত-বিরোধিতার গোলকধাঁধায় দাঁড়িয়ে আছি। পুঁজিবাদী উৎপাদনব্যবস্থা, সোশ্যাল মিডিয়ার কৃত্রিম কিউরেট করা জীবন এবং করপোরেট সংস্কৃতির পারফরম্যান্স রিভিউ সবকিছু মিলে ...
মুক্তার হোসেন নাহিদ:মায়ামির রাতের আকাশে নীল-সাদার সমারোহ। হার্ড রক স্টেডিয়ামে "আর্জেন্টিনা! আর্জেন্টিনা" প্রতিধ্বনি। দুনিয়াজুড়ে পর্দার সামনে কোটি কোটি মানুষের কণ্ঠেও একই আওয়াজ। ফিফা র্যাংকিংয়ে ১ম স্থ ...
সব মন্তব্য
No Comments