# দল ছেড়ে অন্য দলে, জোট ভেঙে নতুন জোটে—এক অদ্ভুত নির্বাচনী চিত্র!

নির্বাচনী ট্রেনে ভূতুরে কাণ্ড

প্রকাশ : 31 Dec 2025
নির্বাচনী ট্রেনে ভূতুরে কাণ্ড


# হাসিনা-খালেদা বিহীন প্রথম ভোট

# উজ্জ্বীবিত-হতাশায় বিএনপি’র নির্বাচনী যাত্রা

# এনসিপিতে ভাঙনের সুর: জামায়াত-মিত্রতায় স্বপ্নভঙ্গ তারুণ্যের!৩০০ আসনে হুঙ্কার থেকে জামায়াত জোটে এনসিপি-র নাটকীয় ভোলবদল।


এম এইচ নাহিদ ।। দেশজুড়ে হাড়কাঁপানো শীত। প্রকৃতিতে শীতের তীব্রতা থাকলেও রাজনৈতিক অঙ্গনে বইছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনী উত্তাপ। তবে এবারের নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নজিরবিহীন অধ্যায়। গত কয়েক দশকের চেনা দৃশ্যপট পাল্টে দিয়ে এই প্রথম দেশের মানুষ এমন এক নির্বাচনের মুখোমুখি, যেখানে নেই দীর্ঘদিনের দুই প্রধান নেত্রী-বেগম খালেদা জিয়া এবং শেখ হাসিনা।

বেগম জিয়ার চিরবিদায় আর শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি ও রাজনৈতিক অনুপস্থিতি-দেশের রাজনীতির এই ‘দ্বৈত শূন্যতা’র মাঝেই নির্বাচনী ট্রেন ছুটে চলছে দুর্বার গতিতে। আর এই যাত্রাপথেই প্রতিদিন ঘটছে নানা ‘ভূতুরে কাণ্ড’। জোট ভাঙা, দল বিলুপ্তি আর রাতারাতি ভোলবদলের এই সমীকরণে শেষ পর্যন্ত এ ট্রেন কোথায় গিয়ে থামবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা।

নির্বাচনী সমীকরণ ও বড় দলগুলোর অবস্থান: নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ  ও নিবন্ধন স্থগিত থাকায় এবারের নির্বাচনী ট্রেনে উঠতে পারেনি ক্ষমতা থেকে ছিটকে পড়া দল পারেনি আওয়ামী লীগ। অন্যদিকে, সুষ্ঠু পরিবেশ ও ইনক্লুসিভ নির্বাচন না হওয়ার অভিযোগ তুলে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) সহ ১৪ দলীয় জোটভুক্ত দলগুলো। বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর কৃষক শ্রমিক জনতা লীগও নির্বাচন থেকে দূরে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

ফলে এবারের নির্বাচনী লড়াই হবে মূলত বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় পার্টির একাংশ এবং বাম দলগুলোর মধ্যে। লন্ডন প্রবাসী তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনে বিএনপি এখন অনেক বেশি উজ্জীবিত। দলটির প্রধান কাণ্ডারি খালেদা জিয়ার প্রয়াণ পরবর্তী এই প্রথম নির্বাচনে নেতা-কর্মীদের মাঝে যেমন শোকের ছায়া, তেমনি সহানুভূতির ভোট পাওয়ার এক বড় সম্ভাবনাও দেখছেন অনেকে।

তবে বিএনপি-জামাতের প্রভাব বিস্তারকারী এ ট্রেনে ঘটছে নানা ‘ভূতুরে কাণ্ড’। কেউ জোট ভেঙে জোট করছে, আবার কেউ দল বিলুপ্ত করে অন্য দলে যোগ দিচ্ছে। কেউ বা বিজয়ের নেশায় দল ত্যাগ করে অন্য দলে ভিড়ছে। ক্ষোভ-বিক্ষোভে দল ছেড়ে স্বতন্ত্র নির্বান কিংবা নিষ্ক্রিয় থাকার ঘটনাও ঘটছে। সব মিলিয়ে ভূতুরে কাণ্ডে’র এই নির্বাচনী ট্রেন শেষ পর্যন্ত  রাজনৈতিক বৈতরণী পার হতে পারবে কিনা তা নিয়েও রয়েছে নানা শংসয়।

নির্বাচন কমিশন সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ২৯ নভেম্বর মনোনয়নপত্র জমাদানের শেষ দিন পর্যন্ত ৩০০ আসনে মনোনয়ন তুলেছিলেন ২ হাজার ৫৭০ জন। মনোয়নপত্র দাখিল করেছেন ২ হাজার ৫৬৯ জন।

জামায়াত ও এনসিপি’র চাঞ্চল্যকর মোড়ঃ রাজনীতির মাঠে বিএনপি-জামায়াত দীর্ঘদিনের মিত্র হলেও এবার তারা হাঁটছে আলাদা পথে। ৫ আগস্টের পর তাদের সে মিত্রতা ধীরে ধীরে কমতে থাকে। চার দলীয় জোট থেকে ২০ দলীয় জোট হয়েছিল। সেই জোট ত্যাগ করে জামাত গঠন করেছিল ৮ দলীয় জোট। শেষ পর্যন্ত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), বাংলাদেশ লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) ও আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি যুক্ত হওয়ায় জামাত নির্বাচনী ট্রেনে উঠেছে ১১ দলীয় জোটে।

এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত ঘটনাটি ঘটেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-কে ঘিরে। কোটা আন্দোলন থেকে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন হয়ে নাগরিক কমিটি গঠনের পর জুলাই আন্দোলনের নেতারা গঠন করেছিল এনসিপি। নির্বাচনের আগে গত ৭ ডিসেম্বর দলটি এবি পার্টি ও রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সাথে গঠন করেছিল গণতান্ত্রিক সংস্কার জোট। কিন্তু ক্ষমতা ও ভোটের হিসাব মেলাতে গিয়ে মাত্র ২০ দিনের মাথায় এনসিপি যুক্ত হয় জামায়াত নেতৃত্ত্বাধীন জোটে। জোটের এবি পার্টিও শেষ সময়ে জামায়াত জোটে এসেছে। এ জোটের রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন গোস্বা করে বসে আছে। এনসিপি শুরুতে ৩০০ আসনে একক লড়াইয়ের হুঙ্কার দিলেও শেষ মুহূর্তে তারা জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটেই তরী ভেড়ালো।

তবে এই সিদ্ধান্ত এনসিপির ভেতরে এক বিশাল বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। জামায়াতের সাথে জোট করাকে ‘আত্মঘাতী’ আখ্যা দিয়ে দল ছেড়েছেন জ্যেষ্ঠ যুগ্মআহ্বায়ক তাসনিম জারা, তাজনুভা জাবিন ও আজাদ খান ভাসানিসহ অনেক শীর্ষ নেতা। নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন মনিরা শারমিন এবং নিষ্ক্রিয় থাকার ঘোষণা দিয়েছেন নুসরাত তাবাসসুম। প্রতিদিনই এ দল থেকে কেউ না কেউ চলে যাচ্ছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তারুণ্যের নতুন বাংলাদেশ গড়ার যে স্বপ্ন এনসিপি দেখিয়েছিল, জামায়াতের সাথে জোট গঠন করায় তাতে বড় ধরনের ছেদ পড়েছে।

জামায়াত জোটের চমক: নির্বাচনে জামায়াত একের পর এক চমক দেখিয়ে যাচ্ছে। জামায়াতের রাজনীতির বিরোধীতা করা দল ইসলামি আন্দোলনও এ জোটে ভিড়েছে। জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটে এসেছে দল থেকে বেরিয়ে দল গঠন করা এবি পার্টির নেতারা। কর্ণেল অলি আহম্মেদ এর এলডিপি দীর্ঘদিন বিএনপি জোটে ছিল। শেষ পর্যন্ত আসন বনিবনা না হওয়ায় তিনিও জামায়াত জোটে এসেছেন। তবে সে জন্য তাকে হারাতে হয়েছে দলের নেতা রেদওয়ান আহম্মেদকে। তিনি বিএনপি যোগ দিয়ে ধানের শীষে ভোট করছেন। এছাড়া এ জোটে নির্বাচনী ট্রেনে উঠেছে খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, নেজামে ইসলামি পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা), বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি ও বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন। এ জোট নির্বাচনে শতভাগ জয়ের স্বপ্নে লড়ছে।

উজ্জ্বীবিত ও হতাশায় বিএনপি জোটের নির্বাচনী যাত্রা: দীর্ঘদিন পর লন্ডন প্রবাসী তারেক রহমান দেশে আসার পর বিএনপি যেমন  উজ্জ্বীবিত হয়েছে, তেমনি দলের নেত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে গভীর শোকাহত। শেষ পর্যন্ত নেত্রী হারানোর শোক নিয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় আছে বিএনপি। এ জোটেও ভিড়েছে বেশ নুরুল হক নুরের গণঅধিকার পরিষদ। তবে দলটির সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান শেষ পর্যন্ত বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। এছাড়া বিএনপি জোটে রয়েছে সাইফুল হকের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, জুনায়েদ সাকির গণসংহতি আন্দোলন এবং মাহমুদুর রহমান মান্নার নাগরিক ঐক্য। এই দলগুলো মিলে গঠন করেছিল গণতন্ত্রমঞ্চ।

এছাড়া সেই জোট ভেঙে তারা নতুন জোটে নির্বাচন করছে। বিএনপি জোটে নির্বাচন করছে বাংলাদেশ জাতীয় পাটি (বিজেপি)-র আন্দালিব রহমান পার্থ, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি, ইসলামি ঐক্যজোট, এনপিপি, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, বাংলাদেশ এলডিপি ও বাংলাদেশ জাতীয় দল।

ভোটের হিসাব কষে এনডিএম চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ দল বিলুপ্ত করে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। এলডিপি’র একাশ বিলুপ্ত করে বিএনপিতে মিশে গেছেন দলটির চেয়ারম্যান ফরিদুজ্জামান। বাংলাদেশ জাতীয় দলের চেয়ারম্যান এহসানুল হুদা।

তবে বিএনপি’র মনোয়নবঞ্চিত ৭১ নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন।

নির্বাচনী ট্রেনে বামদের গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট: নির্বাচনী ট্রেনে অংশ নিয়েছে সিপিবি, বাসদ নেতৃত্বাধীন বামগণতান্ত্রিক জোট। বাংলাদেশ জাসদ, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টি, বাসদ (মার্কসবাদী), বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগ, ফ্যাসিবাদবিরোধী বামমোর্চ মিলে গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট নামে নির্বাচনী ট্রেনে লড়াইয়ের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তারাও জোট রেখে জোট করেছে।

এ ট্রেনে নির্জিব জাতীয় পার্টি: নির্বাচনে জাতীয় পার্টি জিএম কাদের অংশ একাই লড়তে যাচ্ছেন। তবে তাদের দৌড়ঝাঁপ খুব বেশি দেখা যাচ্ছে না। প্রস্তুতির অংশ হিসেবে তারা মনোনয়ন জমা দিয়েছে বলে জানিয়েছেন দলটির একাধিক সূত্র।

অন্যদিকে দলটির অন্য অংশগুলো নির্বাচনী ট্রেনে উঠেছে। আনোয়ার হোসেন মঞ্জু নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি (জেপি) ও জাতীয় পার্টি (আনিসুল-হাওলাদার) এনডিএফ গঠন করে মনোনয়ন দাখিল করে। তবে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করলেও জমা দেননি জাতীয় পার্টির (একাংশ) মহাসচিব ও জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের মুখপাত্র এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার, জাতীয় পার্টির (একাংশ) সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান কাজী ফিরোজ রশীদ ও জেপির আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। ফলে তারাও খুব বেশি সক্রিয় নয়।

এছাড়া সৈয়দ সাইফুদ্দিন আল হাসানীর সুপ্রিম পার্টি, সুন্নি ইসলামি-মাজারপন্থী দল ও প্রগতিশীল ইসলামি জোটেও এ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। রয়েছে আমজনতা দল।

ফলে জোট ভাঙা, জোট গড়া, দল ত্যাগ, দল বিলুপ্তির এই ভূতুরে নির্বাচনী ট্রেন শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে যাত্রা সমাপ্ত করে সেটাই এখন দেখার বিষয়। তাছাড়া হাসিনা-খালেদা বিহীন এই প্রথম নির্বাচনে ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩ ভোটারের উপস্থিতি কেমন হবে এবং শেষ মুহূর্তে কোনো রাজনৈতিক নাটকীয়তা তৈরি হয় কি না, তা দেখতে সারা দেশ এখন ১২ ফেব্রুয়ারির অপেক্ষায়।

সম্পর্কিত খবর

;