খুঁটির জোরে ৭ বছর পিডি, রাকাব এসইসিপিতে অচলাবস্থা

প্রকাশ : 27 Jun 2026
খুঁটির জোরে ৭ বছর পিডি, রাকাব এসইসিপিতে অচলাবস্থা

পাভেল ইসলাম মিমুল, রাজশাহী ব্যুরো: রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের (রাকাব) ‘স্মল এন্টারপ্রাইজ ক্রেডিট প্রোগ্রাম’ (এসইসিপি) প্রকল্পে তীব্র অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘ দুই যুগেও চাকরি স্থায়ী না হওয়া এবং প্রজেক্ট ডাইরেক্টর (পিডি) আব্দুল্লাহ সালাহ উদ্দিন গাজির চরম গাফিলতি, উদাসীনতা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে গত ১৬ জুন থেকে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি শুরু করেছেন প্রকল্পের ৪২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী।


ফলে উত্তরবঙ্গের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ঋণদানসহ প্রকল্পের সমস্ত প্রশাসনিক ও মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়েছে।


আন্দোলনরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল অভিযোগ প্রকল্পের পিডি আব্দুল্লাহ সালাহ উদ্দিন গাজির বিরুদ্ধে। সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী ডেপুটেশনে (প্রেষণে) চাকরির মেয়াদ সর্বোচ্চ তিন বছর হলেও, তিনি দীর্ঘ সাত বছর ধরে একই পদে বহাল আছেন। অভিযোগ উঠেছে, বিগত সরকারের আমলে স্থানীয় এক প্রভাবশালী প্রতিমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ ও আশীর্বাদপুষ্ট হওয়ার সুবাদে তিনি এই লাভজনক পদটি বাগিয়ে নেন এবং নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে নিজের ইচ্ছামতো কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন।


কর্মচারীদের দাবি, পিডি মুখে চাকরি স্থায়ী করার আশ্বাস দিলেও বাস্তবে মন্ত্রণালয়ে ফাইল ছাড়ানোর বিষয়ে তার চরম গাফিলতি রয়েছে। গত বছরের ১০ জুলাই রাকাবের পূর্ববর্তী ব্যবস্থাপনা পরিচালক জনবলসহ এই প্রকল্পটিকে ব্যাংকের মূল কাঠামোতে আত্মীকরণের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু দীর্ঘ এক বছর পার হতে চললেও বর্তমান পিডি ও রাকাব ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ সেই ফাইল পাসের বিষয়ে কোনো কার্যকর বা দৃশ্যমান ভূমিকা পালন করেনি।


২০০২ সালে রাজকীয় নরওয়ে সরকারের অফেরতযোগ্য আর্থিক অনুদানে শুরু হওয়া এই প্রকল্পটি ৫ বছর মেয়াদে ২০০৭ সালে শেষ হওয়ার কথা ছিল। প্রকল্পের অভাবনীয় সাফল্য দেখে ২০০৭ সালেই একে রাকাবের সঙ্গে একীভূত করার প্রস্তাব করা হয়। কিন্তু ব্যাংক কর্তৃপক্ষ অজ্ঞাত কারণে একে একীভূত না করে ‘রাকাব এসএমই ফাইন্যান্সিং কোম্পানি’ নামে একটি সাবসিডিয়ারি কোম্পানি করার পথে হাঁটে, যা রাকাবের সংবিধান বহির্ভূত হওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক পরপর চারবার তাদের লাইসেন্সের আবেদন নাকচ করে দেয়।


বিক্ষোভকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানান, প্রকল্পের নিজস্ব আয় থেকে কর্মচারীদের বেতন এবং রাকাব থেকে প্রেষণে আসা এক ডজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার উচ্চ বেতন-ভাতা, বোনাস, পিএফ, গ্র্যাচুইটি দেওয়ার পরও প্রতি বছর এই প্রকল্প রাকাবকে প্রায় ৮ থেকে ১০ কোটি টাকা নিট মুনাফা এনে দেয়। অথচ যারা এই লাভ নিশ্চিত করছেন, সেই অস্থায়ী ৪২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী চাকরির শুরু থেকে আজ পর্যন্ত একই গ্রেড ও স্কেলে বেতন পাচ্ছেন।


“দীর্ঘ ২৪ বছরে আমাদের কোনো বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট, সরকার ঘোষিত ২০২৩ সাল থেকে ৫% এবং ২০২৪ সাল থেকে ১০%/১৫% অতিরিক্ত বিশেষ সুবিধা, পিএফ, কিংবা সরকারি প্রণোদনা দেওয়া হয়নি। আমাদের অনেকেরই চাকরির বয়স এখন অবসরের দ্বারপ্রান্তে। এই অবস্থায় পরিবার-পরিজন নিয়ে আমরা চরম মানবেতর জীবন যাপন করছি,” বলেন আন্দোলনরত এক কর্মচারী।


সার্বিক অচলাবস্থা ও গাফিলতির অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে প্রজেক্ট ডাইরেক্টর আব্দুল্লাহ সালাহ উদ্দিন গাজি বলেন: “আমি আমার সাধ্যের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে এই প্রকল্পের ৪২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে আত্মীকরণের চেষ্টা করেছি এবং এ বিষয়ে বারবার সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করেছি। সর্বশেষ আমি কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও আশ্বস্ত করেছি যে—আপনারা এবং আমি, সবাই মিলে এই অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাব, যেন আপনারা চাকরি আত্মীকরণসহ অন্যান্য সকল সুযোগ-সুবিধা ফিরে পান।”


তবে আন্দোলনরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পিডির এই বক্তব্যকে ‘চাতুর্যপূর্ণ ফাঁকা আশ্বাস’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাদের স্পষ্ট হুঁশিয়ারি—চাকরি স্থায়ী করার সুনির্দিষ্ট ও লিখিত সরকারি প্রজ্ঞাপন বা সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত এই কর্মবিরতি ও অচলাবস্থা চলবে। ঊর্ধ্বতন আমলাদের স্বার্থরক্ষা বন্ধ করে অবিলম্বে ৪২ জন কর্মচারীর ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে দিতে তারা অর্থ মন্ত্রণালয় ও বর্তমান কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।


প্রকল্পের এই সার্বিক অচলাবস্থা ও মূল সমস্যা সম্পর্কে জানতে রাকাবের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং এসইসিপি প্রকল্পের চেয়ারম্যান গোলাম মোর্তুজার কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হলে জানানো হয়, তিনি বর্তমানে ঢাকায় অবস্থান করছেন। পরদিন তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের জন্য পুনরায় কার্যালয়ে গিয়ে ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) এবং জনসংযোগ কর্মকর্তার কাছে সাক্ষাতের অনুরোধ জানান সাংবাদিকরা। তবে তারা সাফ জানিয়ে দেন, এমডি মহোদয় সাংবাদিকদের সঙ্গে কোনো প্রকার সাক্ষাৎ বা কথা বলবেন না। বক্তব্য নেওয়ার সুবিধার্থে পরবর্তীতে তাঁর ব্যক্তিগত মুঠোফোন নম্বর চাওয়া হলে, “স্যারের কঠোর নিষেধ আছে” উল্লেখ করে নম্বর দিতেও অস্বীকৃতি জানান ওই দুই কর্মকর্তা। ফলে এই সংকট নিরসনে ব্যাংকের শীর্ষ কর্তৃপক্ষের সুনির্দিষ্ট কোনো বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।


সম্পর্কিত খবর

;