বহুমাত্রিক চাপে দেশের অর্থনীতি

প্রকাশ : 05 Jun 2026
বহুমাত্রিক চাপে দেশের অর্থনীতি

স্টাফ রিপোর্টার: বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) বলছে, দেশের অর্থনীতি এখন বহুমাত্রিক চাপের মুখে রয়েছে। সামষ্টিক অর্থনীতি, আর্থিক পরিস্থিতি, বিভিন্ন খাত ও সামাজিক চাপ একসঙ্গে তৈরি হয়েছে। অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতা এবং বৈশ্বিক নানা ধাক্কা এর প্রধান কারণ। ‘২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি: উত্তরণকালীন সময়ে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ’ শিরোনামে গত বৃহস্পতিবার ঢাকায় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা জানায় সংস্থাটি।


সিপিডি বলেছে, শুধু অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নয়, বরং দুর্বল সুশাসন, নীতি বাস্তবায়নে ঘাটতি ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাই মূল চ্যালেঞ্জ। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, গত কয়েক বছরে দেশের অর্থনীতি বিভিন্ন অস্থিরতার মুখোমুখি হয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সীমিত রাজস্ব সক্ষমতা, বেসরকারি বিনিয়োগের ধীরগতি, মুদ্রানীতি খাতে দুর্বলতা, বাড়তে থাকা সরকারি ঋণ, জ্বালানি খাতে চাপ এবং রাজনৈতিক রূপান্তরকালীন অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। 


সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপিত প্রবন্ধে বলা হয়, ২০২৫ অর্থবছরে বাস্তব জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশে, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৪ দশমিক ২ শতাংশ। প্রবৃদ্ধির এই নিম্নমুখী ধারা অর্থনীতির ভেতরের গতি কমে যাওয়ার প্রতিফলন। রপ্তানি প্রবৃদ্ধি দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রপ্তানি আয়ে প্রায় ৩ দশমিক ২ শতাংশ নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। তবে প্রবাসী আয় বৃদ্ধি এবং বিদেশে কর্মসংস্থান বাড়ার কারণে বৈদেশিক লেনদেন পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী হয়েছে এবং প্রায় সাড়ে পাঁচ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। কিন্তু প্রবাসী আয়ের ওপর অতিনির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে কাঠামোগত দুর্বলতাকে আড়াল করতে পারে বলে সতর্ক করেছে সিপিডি। 


রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে অর্থবছরের বাকি সময়ে কর আদায় প্রায় ৫৯ শতাংশ বাড়াতে হবে, যা বাস্তবে অর্জন করা কঠিন। উন্নয়ন ব্যয় বাস্তবায়নেও ধীরগতি দেখা গেছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার মাত্র ২০ দশমিক ৩ শতাংশ, যা গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা, প্রশাসনিক জটিলতা এবং কিছু বড় প্রকল্পের ব্যয় সীমিত করার সরকারি সিদ্ধান্তের কারণে এডিপি বাস্তবায়নের গতি কমেছে। 


বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর সময়ে সরকার ব্যাংক থেকে প্রায় ৫৯ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যাংক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বেসরকারি বিনিয়োগের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত কমে যাওয়ায় উন্নয়ন ব্যয় চালাতে সরকারকে ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। মোট ঋণ-জিডিপি অনুপাত বেড়ে ৩৮ দশমিক ৬১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, দেশি-বিদেশি ঋণের বোঝা বাড়ছে এবং জাতীয় বাজেটের বড় অংশ ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় হচ্ছে। এর ফলে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের ফাঁদে পড়ার ঝুঁকির মুখে রয়েছে। 


মূল্যস্ফীতির চাপ কমছে না। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৮ থেকে ৯ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। বিশেষ করে খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, মূল্যস্ফীতি এখন একটি কাঠামোগত সমস্যা হিসাবে দাঁড়িয়ে গেছে। শুধু সুদের হার বাড়িয়ে এটি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। খাদ্য সরবরাহব্যবস্থা সংস্কার, মজুতদারি বন্ধ, পরিবহন ও সংরক্ষণ অবকাঠামোয় বিনিয়োগ এবং সময়মতো খাদ্য আমদানির সিদ্ধান্ত নিতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা করা হয়েছে। 


ব্যাংক খাতের অবস্থাও উদ্বেগজনক। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ঋণ শ্রেণিকরণ চালুর পর খেলাপি ঋণের হার দ্রুত বেড়ে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশে উঠেছে। হাওরাঞ্চলের বন্যা এবং হাম রোগের প্রাদুর্ভাব দেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্য খাতের সক্ষমতা ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির দুর্বলতা প্রকাশ করেছে। এটি সামগ্রিকভাবে শাসন ব্যবস্থা ও নীতি বাস্তবায়নের সীমাবদ্ধতা সামনে এনেছে বলে সিপিডি মনে করে। 


সিপিডি বলছে, অর্থনীতি এখন ভাঙনের মুখে নয়, কিন্তু চাপের বৃত্তে আটকে আছে। সঠিক সময়ে সঠিক সংস্কার হলে পুনরুদ্ধারের যে আভাস দেখা যাচ্ছে, তা শক্ত ভিত্তিতে দাঁড়াতে পারে। অন্যথায় প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও সামাজিক স্থিতিশীলতা— সব ক্ষেত্রেই চাপ আরও বাড়তে পারে। নতুন সরকারের সামনে তাই সময় কম, কাজ বেশি। সংস্থাটি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাস্তব পদক্ষেপ, রাজস্ব ব্যবস্থায় সংস্কার, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে জোর দেওয়ার সুপারিশ করেছে। 


সম্পর্কিত খবর

;