বাণিজ্য বা রাজনীতির হাতিয়ার নয়, ফুটবল হোক গণমানুষের

প্রকাশ : 26 Jun 2026
বাণিজ্য বা রাজনীতির হাতিয়ার নয়, ফুটবল হোক গণমানুষের

সামসুল আলম সজ্জন


পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা—ফুটবল বর্তমান সময়ে সারাবিশ্বকে মাতিয়ে রেখেছে। বিশ্বব্যাপী প্রায় ৩.৫ থেকে ৪ বিলিয়ন (৩৫০ থেকে ৪০০ কোটি) অনুসারী বা ভক্ত এই খেলাকে ভালোবাসে, সমর্থন করে এবং নিজেদের আবেগের অংশ হিসেবে গণ্য করে। একদিকে এটি যেমন বিশাল বাণিজ্যিক শিল্প, অন্যদিকে এটি মানুষের আবেগ, পরিচয়, সংস্কৃতি ও সামাজিক সম্পর্কেরও বাহক। তাই ফুটবলকে পুরোপুরি বুঝতে হলে শুধু খেলার দৃষ্টিকোণ নয়, অর্থনীতি, সমাজতত্ত্ব ও রাজনৈতিক বাস্তবতার দৃষ্টিকোণ থেকেও বিশ্লেষণ করতে হয়। সারাবছর আমরা বেশকিছু ক্লাবের দাপট, কিছু আঞ্চলিক টুর্নামেন্টের খবর সংগ্রাহক বা ক্ষেত্রবিশেষে দর্শক হিসেবে থাকলেও প্রতি চার বছর পর পর আমরা মুখোমুখি হই পৃথিবীর সেরা প্রদর্শনী তথা ‘Greatest show on earth’-এর।


সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে ফুটবলকে কখনও কখনও ‘ব্যাপক জনসমাগমপূর্ণ দৃশ্য’ (mass spectacle) বলা হয়, কারণ এটি বিশাল সংখ্যক মানুষকে একটি সাধারণ বিনোদন এবং আবেগীয় বৃত্তের মধ্যে একত্রিত করে। এটি মানুষের অবসর, পরিচয়বোধ ও আবেগকে সংগঠিত করে। অনেক সমালোচক মনে করেন, পুঁজিবাদী সমাজে ফুটবল জনগণের মনোযোগকে অর্থনৈতিক বৈষম্য বা রাজনৈতিক সংকট থেকে সরিয়ে রাখার একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবেও কাজ করতে পারে।


আবার অন্যদিকে এই ফুটবল-ই হয়ে উঠতে পারে শ্রমজীবী মানুষের সাংস্কৃতিক প্রকাশ, সামাজিক সংহতি এবং প্রতিরোধের ক্ষেত্র!


পুঁজিবাদী সমাজবাস্তবতায় সবকিছুই বাজারে বিক্রয়যোগ্য পণ্য। এমনকি ফুটবলও আজ নিছক খেলা নয়। একই সঙ্গে এটি বিনোদন, ব্যবসা, সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক শক্তির ক্ষেত্রও বটে! ফুটবল আজ বিশ্বব্যাপী একটি বিশাল বিলিয়ন ডলারের বিনোদন শিল্প, যা বিপুল মুনাফা উৎপাদন করে এবং বৈশ্বিক বাজারের অংশ হিসেবে কাজ করে। ক্লাব, খেলোয়াড়, জার্সি, সম্প্রচার অধিকার, এমনকি সমর্থকদের আবেগও আজ অর্থনৈতিক মূল্যে নির্ধারিত হয়। ভক্তরা তখন নিছক দর্শক হওয়ার পরিবর্তে বরং এই বিশাল অর্থনৈতিক চক্রে পরিণত হন এক একজন ভোক্তা বা গ্রাহকে।


২০২৬ বিশ্বকাপের টিকিট মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে ফুটবলের বিশ্ব মোড়ল ফেডারেশন অফ ইন্টারন্যাশনাল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (ফিফা) প্রথমবারের মতো 'ডায়নামিক প্রাইসিং' (চাহিদার ওপর ভিত্তি করে দাম পরিবর্তন) পদ্ধতি প্রবর্তন করেছে। ৪৮ দলের এই বিশাল টুর্নামেন্টে চাহিদার আধিক্যের 'ধোঁয়া তুলে', ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো খেলার প্রাণ দর্শকদের সুবিধা-অসুবিধাকে থোড়াই কেয়ার করে নিজেই টিকিটের চড়া মূল্যের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। এই নিয়মের অধীনে আসন বিন্যাস বা ক্যাটাগরি অর্থাৎ স্টেডিয়ামের কোন আসনে বসে খেলা দেখছেন—ক্যাটাগরি-১ (সবচেয়ে ভালো ভিউ) থেকে ক্যাটাগরি-৩ বা ৪ (তুলনামূলক দূরবর্তী স্থান)-এর টিকিটের দামে বড় পার্থক্য রয়েছে। ম্যাচের গুরুত্ব তথা গ্রুপ পর্বের চেয়ে নকআউট পর্ব, সেমিফাইনাল এবং ফাইনাল ম্যাচের টিকিটের মূল্য ক্রমান্বয়ে আরও বেশি। এর পাশাপাশি আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর ভৌগোলিক অবস্থান এবং সংশ্লিষ্ট স্টেডিয়ামগুলোর অর্থনীতিও টিকিটের দামের ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাচগুলোর তুলনায় মেক্সিকো ও কানাডার ভেন্যুতে টিকিটের দাম তুলনামূলক কম রাখা হয়েছে।


অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক ও আইনি তদন্তের চাপে ফিফা প্রতিটি ম্যাচের জন্য ৬০ ডলারের কিছু নির্দিষ্ট টিকিট উন্মুক্ত রাখলেও তা টিকিটের সামগ্রিক সংখ্যা বিবেচনায় খুবই নগণ্য।


টুর্নামেন্টের অফিসিয়াল মূল্য নির্ধারণ করা হলেও, টিকিটের তুমুল চাহিদার কথা বলে 'রিসেল' মার্কেটে সেই দাম আকাশচুম্বী আকার ধারণ করেছে। উদাহরণস্বরূপ, শেষ ধাপের টিকিট বিক্রির সময় ফাইনাল ম্যাচের সর্বোচ্চ অফিশিয়াল মূল্য ১০,৯৯০ ডলার নির্ধারণ করা হলেও রিসেল সাইটগুলোতে তা বহুগুণ বেশি দামে তালিকাভুক্ত হতে দেখা গেছে।


ফুটবলের রাজনীতি-রাজনীতির ফুটবল


ফুটবলে রাজনীতি রয়েছে বলেই ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে এবারের বিশ্বকাপের বাছাইপর্বেও অংশ নিতে পারেনি ২০১৮ সালে ২১তম ফিফা বিশ্বকাপ আয়োজক দেশ রাশিয়া। আবার যুক্তরাষ্ট্রের কোপানলে পড়ে ইরানের খেলোয়াড়রা নানারকম অমানবিক হয়রানির শিকার। মেক্সিকো সীমান্তে অধিনায়ক মেহেদী তারেমি ও সহকারী কোচসহ দেশটির বেশ কয়েকজন খেলোয়াড়কে মার্কিন কর্তৃপক্ষ অযৌক্তিক ও দীর্ঘক্ষণ আটকে রেখে হয়রানি করেছে। এছাড়াও, ম্যাচ শেষেই তাদের বাধ্য করা হচ্ছে মার্কিন ভূখণ্ড ত্যাগ করে মেক্সিকোতে ফিরে যেতে। ২০২৫ সালে 'আফ্রিকার সেরা রেফারি' সোমালিয়ার ওমর আব্দুলকাদির আরতান (Omar Abdulkadir Artan) ফিফা-২০২৬ বিশ্বকাপে ম্যাচ পরিচালনার জন্য মনোনীত হয়েও আয়োজক দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অভিবাসন নীতি ও ভিসা জটিলতার কারণে তিনি দেশটিতে প্রবেশ করতে পারেননি।


ল্যাটিন আমেরিকার বহু দেশে—যেমন আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, উরুগুয়ে, চিলি—ফুটবল শ্রমজীবী ও নিম্নবিত্ত জনগণের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে ফুটবল স্টেডিয়াম ও ক্লাবগুলো সামাজিক ও রাজনৈতিক মতপ্রকাশের ক্ষেত্রেও পরিণত হয়।


ফুটবল, ল্যাটিন আমেরিকা এবং বিপ্লবী রাজনীতির সম্পর্ক একটি আকর্ষণীয় ও জটিল বিষয়। ল্যাটিন আমেরিকায় ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়; এটি জাতীয় পরিচয়, শ্রেণিসংগ্রাম, গণসংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।


বিশ্বখ্যাত মহান বিপ্লবী চে গুয়েভারা নিজেই ফুটবলপ্রেমী ছিলেন। যদিও তিনি পেশাদার খেলোয়াড় ছিলেন না, তিনি ফুটবলকে জনগণের সংস্কৃতির অংশ হিসেবে দেখতেন। ল্যাটিন আমেরিকার দেশ কিউবার বিপ্লবের পর খেলাধুলাকে সামাজিক উন্নয়নের অংশ হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয়।


১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে ল্যাটিন আমেরিকার বিভিন্ন সামরিক সরকার ফুটবলকে রাজনৈতিক বৈধতা অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। উদাহরণস্বরূপ, আর্জেন্টিনা সামরিক শাসনের অধীনে থাকাকালে ‘ফিফা বিশ্বকাপ ১৯৭৮’ আয়োজন করে। সমালোচকদের মতে, সরকার মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ থেকে আন্তর্জাতিক মনোযোগ সরাতে টুর্নামেন্টটিকে কাজে লাগিয়েছিল।


ল্যাটিন আমেরিকার কিছু ক্লাব ও সমর্থকগোষ্ঠী সরাসরি বামপন্থী বা বিপ্লবী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার উদাহরণও রয়েছে। বিশেষ করে শ্রমিকশ্রেণির এলাকাভিত্তিক ক্লাবগুলো প্রায়ই সামাজিক ন্যায়বিচার, শ্রমিক অধিকার ও গণতন্ত্রের দাবিতে সক্রিয় ছিল।


১৯৮০-এর দশকে ব্রাজিলের সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সেই দেশের কিংবদন্তি মিডফিল্ডার সক্রেটিস-এর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা 'করিন্থিয়ান্স ডেমোক্রেসি' আন্দোলন ফুটবল ও গণতান্ত্রিক রাজনীতির এক ঐতিহাসিক উদাহরণ। এই আন্দোলন সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের দাবিকে সমর্থন করেছিল।


ফুটবলের ঈশ্বর দিয়েগো ম্যারাডোনা কেবল একজন ফুটবল তারকা ছিলেন না; তিনি বিভিন্ন সময়ে প্রকাশ্যে বামপন্থী রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েছেন। ল্যাটিন আমেরিকায় সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিপরীতে কিউবার বিপ্লবের মহানায়ক ফিদেল ক্যাস্ত্রো এবং ভেনেজুয়েলার মহান বিপ্লবী হুগো শ্যাভেজ-এর প্রতি তাঁর সমর্থন ছিল প্রকাশ্যেই।


ড্রাগ, মাফিয়াতন্ত্র ও ফুটবল


মাঠের সবুজ ঘাসের আড়ালে কখনো কখনো এমন এক অন্ধকার জগতের অস্তিত্ব দেখা যায়, যেখানে ড্রাগ ব্যবসা, মাফিয়াতন্ত্র এবং অর্থপাচারের মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ফুটবলের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।


বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সংগঠিত অপরাধচক্র বহু বছর ধরেই ফুটবলকে ব্যবহার করে আসছে নিজেদের প্রভাব বিস্তার এবং অবৈধ অর্থ বৈধ করার মাধ্যম হিসেবে। বিশেষ করে যেখানে ফুটবল সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে অপরাধী গোষ্ঠীগুলো ক্লাব পরিচালনা, খেলোয়াড় কেনাবেচা কিংবা ম্যাচ-সংক্রান্ত ব্যবসায় নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করে।


ড্রাগ কার্টেল ও মাফিয়া গোষ্ঠীগুলোর জন্য ফুটবল একটি আকর্ষণীয় ক্ষেত্র। কারণ ফুটবলে বিপুল পরিমাণ অর্থের লেনদেন হয় এবং সেই অর্থের উৎস সব সময় সহজে যাচাই করা যায় না। অনেক ক্ষেত্রে অবৈধ অর্থ বিনিয়োগ করে ক্লাব কিনে নেওয়া, স্পন্সরশিপের নামে অর্থ প্রবাহ ঘটানো অথবা খেলোয়াড় ট্রান্সফারের মাধ্যমে অর্থপাচারের অভিযোগ উঠেছে।


মাফিয়াতন্ত্রের আরেকটি বড় ক্ষেত্র হলো ম্যাচ ফিক্সিং ও অবৈধ জুয়া। সংগঠিত অপরাধচক্র কখনো কখনো খেলোয়াড়, কোচ বা কর্মকর্তাদের প্রভাবিত করে ম্যাচের ফলাফল নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। এর মাধ্যমে অবৈধ বেটিং বাজারে বিপুল মুনাফা অর্জন করা সম্ভব হয়। ফুটবলের প্রতি মানুষের অগাধ বিশ্বাসকে পুঁজি করে এসব চক্র নিজেদের ব্যবসা সম্প্রসারণ করে।


তবে এই অন্ধকার বাস্তবতার মধ্যেও ফুটবল নিজেই কোনো অপরাধের প্রতীক নয়। বরং ফুটবল সমাজকে একত্রিত করে, তরুণদের সুস্থ বিনোদন দেয় এবং সামাজিক পরিবর্তনের শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। সমস্যা সৃষ্টি হয় তখনই, যখন অপরাধী গোষ্ঠীগুলো এই জনপ্রিয়তাকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে চায়।


ফুটবলকে অপরাধচক্রের প্রভাবমুক্ত রাখতে প্রয়োজন স্বচ্ছ প্রশাসন, কঠোর আর্থিক নজরদারি, কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা। খেলাটির সৌন্দর্য ও সততা রক্ষা করা শুধু ফুটবল সংস্থাগুলোর দায়িত্ব নয়; সমর্থক, গণমাধ্যম এবং রাষ্ট্রকেও এ ব্যাপারে সচেতন ভূমিকা পালন করতে হবে।


ফুটবল মানুষের স্বপ্নের খেলা। সেই স্বপ্নকে মানুষের মাঝে টিকিয়ে রাখতে বিশ্ব মোড়ল ও মাফিয়াতন্ত্রের হাত থেকে ফুটবল মুক্ত থাকুক। বাণিজ্য কিংবা রাজনীতির হাতিয়ার নয়, ফুটবল হোক গণমানুষের—বিশ্বকাপের বাস্তবতায় এই হোক আমাদের একান্ত চাওয়া।




-লেখক: একজন সাংবাদিক ও সমাজ বিশ্লেষক।


সম্পর্কিত খবর

;