জুলাই যোদ্ধাদের দায়মুক্তি দিয়ে সংসদে আইন পাস

প্রকাশ : 08 Apr 2026
জুলাই যোদ্ধাদের দায়মুক্তি দিয়ে সংসদে আইন পাস

স্টাফ রিপোর্টার: জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকারীদের দায়মুক্তি দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা অধ্যাদেশ অনুমোদন করেছে জাতীয় সংসদ। সংসদ অধিবেশনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ উত্থাপিত এ-সংক্রান্ত ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) বিল-২০২৬’ কণ্ঠভোটে পাস হয়েছে। এরআগে সংসদে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য তুলে ধরেন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)’র সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ ও স্বরাষ্টমন্ত্রী।

গতকাল বুধবার স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশনে পাস হওয়া বিলে বলা হয়েছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণের কারণে গণ-অভ্যুত্থানকারীদের বিরুদ্ধে করা সব দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা, অভিযোগ বা কার্যধারা নির্ধারিত বিধান অনুসরণ করে প্রত্যাহার করা হবে। এছাড়া নতুন কোনো মামলা, অভিযোগ বা কার্যধারা গণঅভ্যুত্থানকারীদের বিরুদ্ধে করা আইনত বারিত (নিষিদ্ধ) হবে। আরো বলা হয়েছে, কোনো গণঅভ্যুত্থানকারীর বিরুদ্ধে কোনো মামলা, অভিযোগ বা কার্যধারা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণ করার কারণে করা হয়ে থাকলে পাবলিক প্রসিকিউটর বা সরকার নিযুক্ত কোনো আইনজীবী এই প্রত্যয়নের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট আদালতে আবেদন করবেন। এই আবেদনের পর আদালত ওই মামলা বা কার্যধারা সম্পর্কে আর কোনো কার্যক্রম নেবেন না। তা প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে গণ্য হবে এবং অভিযুক্ত ব্যক্তি অবিলম্বে অব্যাহতিপ্রাপ্ত বা ক্ষেত্রমতে খালাসপ্রাপ্ত হবেন।

বিলে বলা হয়, এই বিধান সত্ত্বেও কোনো গণ-অভ্যুত্থানকারীর বিরুদ্ধে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকালে হত্যাকাণ্ড সংঘটনের অভিযোগ থাকলে তা জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে দাখিল করা যাবে এবং কমিশন এই অভিযোগ তদন্তের ব্যবস্থা নেবে। তবে যে ক্ষেত্রে হত্যাকাণ্ডের শিকার ব্যক্তি কোনো প্রতিষ্ঠান বা বাহিনীতে কর্মরত ছিলেন, সে ক্ষেত্রে কমিশন ওই প্রতিষ্ঠান বা বাহিনীর বর্তমান বা পূর্বে কর্মরত কোনো কর্মকর্তাকে তদন্তের দায়িত্ব দিতে পারবেন না। তদন্ত চলাকালে আসামিকে গ্রেপ্তার বা হেফাজতে নেওয়ার প্রয়োজন হলে তদন্ত কর্মকর্তা যুক্তিসংগত কারণ উল্লেখ করে আগে কমিশনের অনুমোদন নেবেন। আরো বলা হয়, যদি কমিশনের তদন্তে প্রতীয়মান হয় যে, অভিযোগে উল্লিখিত কার্য বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির অপরাধমূলক অপব্যবহার ছিল, তাহলে কমিশন সংশ্লিষ্ট এখতিয়ারসম্পন্ন আদালতে প্রতিবেদন জমা দেবে। এরপর আদালত ওই প্রতিবেদনকে পুলিশ প্রতিবেদন সমতুল্য গণ্য করে পরবর্তী কার্যক্রম নেবেন। এছাড়া কমিশনের তদন্তে যদি প্রতীয়মান হয় যে, অভিযোগে উল্লিখিত কার্য রাজনৈতিক প্রতিরোধের অংশ ছিল, তাহলে কমিশন মনে করলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে সরকারকে আদেশ দিতে পারবে। এক্ষেত্রে কোনো আদালতে সংশ্লিষ্ট কার্য-সম্পর্কিত কোনো মামলা করা যাবে না, কিংবা অন্য কোনো আইনগত কার্যধারা নেওয়া যাবে না।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ বিলটি উত্থাপনকালে আপত্তি জানানোর জন্য ফ্লোর নেন বিরোধী দলের সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ। তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণদের সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণের লক্ষ্যে যে বিলটা আনা হয়েছে, সেই বিলের দুই এর ঘ-তে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির অপরাধমূলক অপব্যবহারের ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিরোধের পরিবর্তে সংকীর্ণ ও ব্যক্তি স্বার্থে সংঘটিত যে হত্যাকাণ্ডগুলো হয়েছে, এটাকে একভাবে দেখা হবে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের উদ্দেশ্যে যেই কার্যাবলিগুলো সংগঠিত হয়েছে, সেটাকে একভাবে দেখা হবে। সমস্যার জায়গাটা হচ্ছে, সংকীর্ণ ও ব্যক্তিগত স্বার্থে যে ধরনের সংগঠিত হত্যাকাণ্ড হয়েছে, সেটাকে কে ডিফাইন করবে? এই আইন অনুযায়ী মানবাধিকার কমিশন সেটাকে কিন্তু ডিফাইন করবে। অর্থাৎ ইনডেমনিটিটা জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ওপরে নির্ভর করবে। অথচ জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের অধ্যাদেশটা ইতোমধ্যে ল্যাপস করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। কমিশন যদি ২০০৯ সালের অনুযায়ী যদি চলে, তাহলে সেটা পুরোপুরি সরকার নিয়ন্ত্রিত একটা মানবাধিকার কমিশন।

মানবাধিকার কমিশনের সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে যদি কমিশনকে আমরা একটা মন্ত্রণালয়ের অধীনে রাখি, তাদের মাধ্যমে আমরা নিরপেক্ষ ধরনের অনুসন্ধান আমরা কতটা পাবো সেটা নিয়ে আমরা সন্দিহান। সেই জায়গা থেকে এই বিলটিকে যদি আমরা বাস্তবায়ন ও ফাংশনাল করতে চাই, তাহলে কমিশনকে অবশ্যই স্বায়িত্বশাসিত করতে হবে। তিনি আরো বলেন, যারা সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত ও নিপীড়িত হয়েছে, তারাই এটাকে মন্ত্রণালয়ের অধীনে রাখতে চাচ্ছে। কমিশন যদি অটোনোমাস হয়ে যায়, তাহলে এটার জবাবদিহিতা কীভাবে নিশ্চিত হবে এই অজুহাতে। যেভাবে বর্তমানে প্রতিষ্ঠানগুলো নগ্ন করা হচ্ছে, কমিশন যে দলীয়করণ করা হবে না, আবার বাপের দোয়া একটা মানবাধিকার কমিশন বা বিরোধীদল দমন কমিশন করা হবে না, এটার প্রতি কিন্তু আমাদের আস্থা নাই।

বিরোধী দলীয় এই সংসদ সদস্য বলেন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নগ্নভাবে দলীয়করণ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকে দখল করা হয়েছে। বিসিবি এখন আর বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড এটা নাই। এটা বাপের দোয়া ক্রিকেট বোর্ডে পরিণত হয়েছে। অপরদিকে, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে স্বায়ত্তশাসিত না করা হলে তাহলে আরেকটি বাপের দোয়া কমিশন দেখতে পাবো। তিনি আরো বলেন, কমিশনকে যদি আমরা মন্ত্রণালয়ের অধীনে রাখি এবং তাকেই যদি আমরা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের কার্যক্রমগুলোকে বিচারের এবং নিরীক্ষণের দায়িত্ব দেয়, সেক্ষেত্রে এই নিরীক্ষণ কিন্তু প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ক্রিকেট বোর্ডসহ সারাদেশের ক্লাবগুলোতে প্রভাব বিস্তার করে অন্তর্বর্তী সরকারের ক্রীড়া উপদেষ্টা। বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার ইনকোয়ারি করেছে, তদন্তের পর বোর্ড ভেঙে দেয়া হয়েছে। পরে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে (বিসিবি) তামিম ইকবালের নেতৃত্বে আহ্বায়ক কমিটি করা হয়েছে। তিনি একজন খেলোয়াড়। এখানে বাপের দোয়া, মায়ের দোয়া কমিটি করিনি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের তৎকালীন ক্রীড়া উপদেষ্টা ক্ষমতার অপপ্রয়োগ করে সারা বাংলাদেশের জেলা কমিটিগুলোকে প্রভাবিত করেছেন। বাংলাদেশে যেগুলো নিবন্ধিত ক্লাব ছিল, সেগুলোকে সরকারি ক্ষমতার মাধ্যমে প্রভাবিত করা হয়েছে এবং হাইকোর্টে সর্বোচ্চ ক্ষমতা প্রয়োগ করে ক্রিকেট বোর্ডের একটি বডি গঠন করা হয়েছে। তার পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমান সরকার ক্রীড়া মন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে দিয়েছে, কী কী অনিয়ম হয়েছে তা খুঁজে বের করার জন্য। সেই তদন্ত কমিটির রিপোর্ট দেওয়ার পর তারা জানালো যে এখানে যথেষ্ট অনিয়ম হয়েছে। এরপর একটি আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছে। মানবাধিকার কমিশনসহ অন্যান্য বিষয়ে দেওয়া বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

সম্পর্কিত খবর

;