বাধা ভৌগোলিক শর্ত

আসিয়ান সদস্য হওয়ার স্বপ্ন ভাঙল বাংলাদেশ

প্রকাশ : 02 Aug 2026
আসিয়ান সদস্য হওয়ার স্বপ্ন ভাঙল বাংলাদেশ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর জোট আসিয়ানের সদস্য হওয়ার আশা কার্যত ভেঙে গেল বাংলাদেশ ও পাপুয়া নিউ গিনির। জোটটির সনদের ভৌগোলিক অবস্থানগত শর্ত পূরণ করতে না পারায় এই দুই দেশের পূর্ণ সদস্যপদ পাওয়ার সম্ভাবনা এখন নেই বললেই চলে বলে জানিয়েছেন জোট সংশ্লিষ্টরা।


আসিয়ান সনদের আর্টিকেল ৬ অনুযায়ী, নতুন সদস্য হতে হলে চারটি মৌলিক শর্ত পূরণ করতে হয়। প্রথমত, রাষ্ট্রটিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার স্বীকৃত ভৌগোলিক অঞ্চলে অবস্থিত হতে হবে। দ্বিতীয়ত, সব সদস্য রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত হতে হবে। তৃতীয়ত, আসিয়ান সনদ মেনে চলতে সম্মত হতে হবে এবং চতুর্থত, সদস্যপদের দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা ও ইচ্ছা থাকতে হবে। এর বাইরেও জোটের সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতিক্রমে নেওয়া হয়, ফলে একটি দেশের আপত্তিতেও সদস্যপদ আটকে যেতে পারে।


এই প্রথম শর্তটিই বাংলাদেশ ও পাপুয়া নিউ গিনির জন্য সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রচলিত ভৌগোলিক সংজ্ঞায় বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ হিসেবে ধরা হয়, আর পাপুয়া নিউ গিনিকে সাংস্কৃতিক ও ভৌগোলিকভাবে ওশেনিয়া অঞ্চলের দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে আসিয়ানের অনেক সদস্য মনে করেন, এই দুটি দেশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার স্বীকৃত ভৌগোলিক অঞ্চলের মধ্যে পড়ে না।


বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশ কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। দেশটি মিয়ানমারের সঙ্গে সীমান্ত ভাগ করে, বঙ্গোপসাগরের মাধ্যমে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরের সঙ্গে সমুদ্রপথে যুক্ত এবং ঐতিহাসিকভাবে আরাকান, চট্টগ্রাম ও মালয় বিশ্বের মধ্যে বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগের সেতু হিসেবে কাজ করেছে। প্রায় ১৮ কোটি মানুষের বাজার, তৈরি পোশাক, ওষুধ, জাহাজ নির্মাণ এবং বঙ্গোপসাগরের বন্দরগুলোর কারণে বাংলাদেশ আসিয়ানের জন্য অর্থনৈতিক ও সংযোগের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।


তবে তিমুর-লেস্তের উদাহরণ দেখিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভৌগোলিকভাবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও তিমুর-লেস্তেকে পূর্ণ সদস্য হতে ২০১১ সালে আবেদনের পর ১৪ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে এবং ২০২৫ সালে গিয়ে ১১তম সদস্য হিসেবে যুক্ত হয়েছে। সেখানে বাংলাদেশের মতো বড় জনসংখ্যা ও জটিল ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের দেশকে অন্তর্ভুক্ত করা আসিয়ানের জন্য আরও কঠিন সিদ্ধান্ত।


এছাড়া আসিয়ানের অনেক সদস্য আশঙ্কা করেন, বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করলে দক্ষিণ এশিয়ার উত্তেজনা, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক, মিয়ানমার সংকট এবং রোহিঙ্গা ইস্যু আসিয়ানের ফোরামে চলে আসতে পারে। আসিয়ান নিজেই মিয়ানমারের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে দেশটির সংকট সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে।


এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য বাস্তবসম্মত পথ হলো ধাপে ধাপে এগোনো। প্রথমে সেক্টরাল ডায়লগ পার্টনার, পরে ডায়লগ পার্টনার এবং তারপর পর্যবেক্ষক মর্যাদা অর্জনের মাধ্যমে বাণিজ্য, শ্রমবাজার, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু, সমুদ্র নিরাপত্তা ও ডিজিটাল অর্থনীতিতে সহযোগিতা বাড়ানো।


আসিয়ান বর্তমানে ১১টি সদস্য নিয়ে গঠিত। সর্বশেষ ১৯৯৯ সালে কম্বোডিয়া এবং ২০২৫ সালে তিমুর-লেস্তে জোটে যোগ দেয়। বাংলাদেশ ও পাপুয়া নিউ গিনি দীর্ঘদিন ধরে সদস্যপদের জন্য আগ্রহ দেখিয়ে আসছে।

সম্পর্কিত খবর

;