ফরিদপুরে পেঁয়াজ চাষে লোকসান,কৃষকের মুখে হতাশার ছাপ স্পষ্ট

প্রকাশ : 27 Mar 2026
ফরিদপুরে পেঁয়াজ চাষে লোকসান,কৃষকের মুখে হতাশার ছাপ স্পষ্ট

অনিক রায়, ফরিদপুর অফিস: চলতি মৌসুমে ফরিদপুর জেলায় পেঁয়াজের বাম্পার ফলন কৃষকের মুখে হাসি ফোটানোর কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবতা হয়েছে তার উল্টো—বাজারে আশানুরূপ দাম না থাকায় লাভের বদলে লোকসানের ভার বইতে হচ্ছে চাষিদের। উৎপাদন ব্যয় ক্রমাগত বাড়লেও বিক্রয়মূল্যের পতনে কৃষকের স্বপ্ন এখন অনিশ্চয়তার কুয়াশায় ঢাকা।

জেলার বিভিন্ন হাট-বাজার ঘুরে দেখা যায়, বর্তমানে প্রতি মন (৪০ কেজি) পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায়। অথচ কৃষকদের মতে, অন্তত ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা দরে বিক্রি করতে পারলেই তারা ন্যূনতম লাভের মুখ দেখতেন। বিদ্যমান দামে উৎপাদন খরচই উঠছে না—এমন অভিযোগ প্রায় সবারই।


সালথা উপজেলার বালিয়াগট্টি হাটে পেঁয়াজ বিক্রি করতে আসা কৃষক ছত্তার মাতুব্বরের কণ্ঠে হতাশার সুর স্পষ্ট—

“ফসল ভালো হয়েছে, কিন্তু বাজারে দাম নেই। ৮০০-৯০০ টাকায় বিক্রি করে সার, বীজ, সেচ আর শ্রমিকের খরচই ওঠে না। পুরোটা যেন লোকসানে ডুবে যাচ্ছে।”


একই এলাকার আরেক চাষি রহিম শেখ জানান, এক বিঘা জমিতে পেঁয়াজ উৎপাদনে তার ব্যয় হয়েছে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। কিন্তু বর্তমান বাজারদরে বিক্রি করলে সেই খরচের অর্ধেকও উঠে আসবে কি না, তা নিয়েই সংশয়। তার ভাষায়, “এই অবস্থায় চলতে থাকলে আগামী মৌসুমে পেঁয়াজ চাষ বন্ধ করা ছাড়া উপায় থাকবে না।”


ভাঙ্গা উপজেলার কৃষক মজিবর মোল্লা অভিযোগ করেন, উৎপাদন থেকে শুরু করে বাজারে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে ব্যয় বাড়ছে—শ্রমিক মজুরি, পরিবহন খরচ—সব মিলিয়ে চাপ বাড়ছে। অথচ বাজারে সিন্ডিকেট ও আমদানির প্রভাবে দাম পড়ে যাচ্ছে। “উৎপাদন করি আমরা, কিন্তু লাভের ভাগ যায় অন্যদের ঘরে”—ক্ষেপে ওঠেন তিনি।


কৃষকদের অভিযোগ, বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এবং আমদানিকৃত পেঁয়াজের প্রভাব দেশীয় পণ্যের দামকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। ফলে মাঠপর্যায়ের প্রকৃত উৎপাদকরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হচ্ছেন।


এ বিষয়ে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মো. শাহাদুজ্জামান জানান, এ বছর ফলন সন্তোষজনক হলেও বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও সরবরাহের ভারসাম্যহীনতা দামের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তিনি বলেন, “কৃষকদের ক্ষতি কমাতে সংরক্ষণ সুবিধা বাড়ানো, বাজার তদারকি জোরদার করা এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এখন জরুরি।”


বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক সংরক্ষণাগারের অভাব এবং পরিকল্পিত বিপণন ব্যবস্থার ঘাটতির কারণে কৃষকরা বাধ্য হয়ে কম দামে পণ্য বিক্রি করছেন। কার্যকর সংরক্ষণ অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনতে পারলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব।


এদিকে ক্ষুব্ধ কৃষকরা দ্রুত ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি আমদানি নিয়ন্ত্রণ ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমাতে দৃশ্যমান পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন। অন্যথায় পেঁয়াজ চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারেন তারা—যার প্রভাব পড়বে দেশের সামগ্রিক কৃষি উৎপাদনেও।

সম্পর্কিত খবর

;