সেইফটি এন্ড রাইটস সোসাইটি জরিপ

নিরাপত্তাহীনতায় পরিবহনখাত, ১ বছরে নিহত ৩৮৫ জন শ্রমিক

প্রকাশ : 31 Dec 2025
নিরাপত্তাহীনতায় পরিবহনখাত, ১ বছরে নিহত ৩৮৫ জন শ্রমিক

স্টাফ রিপোর্টার: পরিবহন খাতের ৩৮৫ জন সহ ২০২৫ সালে সারাদেশে ৭১৩টি কর্মক্ষেত্র দুর্ঘটনায় মোট নিহত হয় ৮০২ জন শ্রমিক, যা কর্মক্ষেত্রের ভয়ংকর নিরাপত্তহীনতার প্রতিচ্ছবি। ২০২৪ সালে সারাদেশে ৬৩৯ টি কর্মক্ষেত্র দুর্ঘটনায় ৭৫৮ জন শ্রমিক নিহত হয়েছিল। গত বছর থেকে এবছর কর্মক্ষেত্রে নিহতের সংখ্যা বেড়েছে । কর্মক্ষেত্রে আসা যাওয়ার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ৭৮ জন শ্রমিক।  


সংবাদপত্রে প্রকাশিত (১৫টি জাতীয় এবং ১১টি স্থানীয়) খবরের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত জরিপের ফলাফল হিসেবে বেসরকারি সংস্থা সেইফটি এন্ড রাইটস সোসাইটি (এসআরএস) আজ সংবাদপত্রে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই তথ্য প্রকাশ করে। 


জরিপে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ অনুযায়ী কর্মক্ষেত্র দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি শ্রমিক নিহত হয়েছেন পরিবহন খাতে। এর পরেই রয়েছে সেবামূলক প্রতিষ্ঠান (যেমন- ওয়ার্কশপ, গ্যাস, বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি) ১৪৫ জন, নির্মাণ খাতে নিহত হয়েছে ১২০ জন, কল-কারখানা ও অন্যান্য উৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠানে এই সংখ্যা ৫৮ জন এবং কৃষি খাতে ৯৪ জন শ্রমিক নিহত হয়েছে। 


মৃত্যুর কারণ বিশ্লেষণে দেখা যায়, সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৭৯ জন, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ৯৬ জন, বজ্রপাতে ৭৮ জন, মাঁচা বা উপর থেকে পড়ে ৫০ জন, পানিতে ডুবে ২৮ জন, ভারী বা শক্ত বস্তু দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত বা তার নিচে চাপা পড়ে ২৫ জন, আগুন ও বিভিন্ন বিস্ফোরণে ২০ জন, পাহাড় বা মাটি, সেতু, ভবন, ছাদ বা দেয়াল ধসে ১৪ জন, রাসায়নিক দ্রব্য বা সেপটিক ট্যাঙ্ক ও পানির ট্যাঙ্কে সৃষ্ট বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে ৮ জন এবং অন্যান্য কারণে ৪ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।


জরিপের পর্যবেক্ষণে এসআরএস উল্লেখ করে যে, পরিবহন খাতে দুর্ঘটনার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে দুর্বল সড়ক অবকাঠামো, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অদক্ষ চালক, অনিয়ন্ত্রিত পরিবহন ব্যবস্থা, আইন প্রয়োগে দুর্বলতা এবং বেপরোয়া যান চলাচল। অন্যদিকে উৎপাদনশীল খাতে দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই কারখানা নির্মাণ, শ্রমিকদের নিরাপত্তা বিষয়ে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব, রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহারে অদক্ষতা এবং নির্মাণ খাতে কোনো ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়াই বৈদ্যুতিক সংযোগ প্রদান, নিরাপত্তাবেষ্টনী ছাড়া মাঁচায় কাজ করা ও সেপটিক ট্যাঙ্ক বা পানির ট্যাঙ্কে কাজের সময় প্রয়োজনীয় সতর্কতার অভাব।


জরিপের তথ্য প্রকাশকালে এসআরএস-এর নির্বাহী পরিচালক সেকেন্দার আলী মিনা বলেন, “কর্মক্ষেত্র দুর্ঘটনায় নিহত শ্রমিকের প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে, কারণ সব দুর্ঘটনার খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয় না।” তিনি আরও বলেন, “এ বছর বিভিন্ন খাতে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৪৭৯ জন শ্রমিকের মধ্যে অন্তত ৭৬ জন শ্রমিক কর্মস্থলে যাতায়াতের পথে প্রাণ হারিয়েছেন। তাই কর্মস্থলে আসা-যাওয়ার সময় শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।” তিনি বজ্রপাতজনিত মৃত্যুর সংখ্যাও উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে উল্লেখ করে বলেন, “বজ্রপাতে নিহত অধিকাংশ কৃষিশ্রমিক কোনো ধরনের ক্ষতিপূরণ পান না। তাদের জন্য কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।”


এসআরএস জানায়, চলতি বছরে নিহত শ্রমিকদের অধিকাংশের বয়স ছিল ২১ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে, অর্থাৎ তারা দেশের গুরুত্বপূর্ণ যুব শ্রমশক্তির অংশ। এসব কর্মদুর্ঘটনার ফলে কী পরিমাণ আর্থিক ও সামাজিক ক্ষতি হচ্ছে, তা এখনো যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয় না। কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তার পাশাপাশি শ্রমিকদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারকে কার্যকর ও জরুরি উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়।


সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও উল্লেখ করা হয়, কর্মক্ষেত্রের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত আইএলও কনভেনশন ১৫৫ ও ১৮৭ অনুসমর্থনের আলোকে প্রয়োজনীয় আইন সংস্কার ও বিধিবিধান প্রণয়ন করে প্রতিটি কর্মক্ষেত্রে শোভন ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।


উল্লেখ্য, সেইফটি এন্ড রাইটস সোসাইটি (এসআরএস) একটি অলাভজনক বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা, যার লক্ষ্য কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং শ্রমিকসহ সাধারণ জনগণের অধিকার সুরক্ষা করা। এসআরএস নিয়মিত প্রশিক্ষণ, আলোচনা ও মতবিনিময় সভার মাধ্যমে কর্মক্ষেত্র দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধি করে আসছে। পাশাপাশি কর্মদুর্ঘটনায় আহত ও নিহত শ্রমিক পরিবারের ক্ষতিপূরণ আদায়ে বিনামূল্যে আইনি সহায়তা প্রদান এবং বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন থেকে আর্থিক সহায়তা পেতে সহযোগিতা করছে।

সম্পর্কিত খবর

;