জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থা চরম সংকটে

প্রকাশ : 20 Sep 2025
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থা চরম সংকটে

আমরান হোসাইন সাকিল: বাংলাদেশের কৃষি খাত জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বড় সংকটে পড়েছে। বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশে প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ সরাসরি কৃষির উপর নির্ভরশীল। কিন্তু ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, খরা, অতিবৃষ্টি, নদীভাঙন ও লবণাক্ততার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ কৃষি ব্যবস্থাকে প্রতিনিয়ত ক্ষতিগ্রস্ত করছে। খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষকের জীবিকা ও গ্রামীণ অর্থনীতি আজ ভয়াবহ হুমকির মুখে।


বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ৩০ লাখ হেক্টর জমি বর্তমানে লবণাক্ততার ঝুঁকিতে রয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, জোয়ারের পানি ও ঘূর্ণিঝড়ের জলোচ্ছ্বাসের ফলে জমির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে। সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, বরগুনা ও পটুয়াখালীর কৃষকরা শাকসবজি, ডাল বা ধান চাষ করতে পারছেন না।


সাতক্ষীরার কৃষক আব্দুল গফুর বললেন,

“আগে এক মৌসুমে ধান তুলে শাকসবজি লাগাতাম। এখন লবণের কারণে জমি একেবারে অনুর্বর হয়ে গেছে। ফসলের অর্ধেকই লোকসান।”


রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও দিনাজপুর অঞ্চলে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় খরা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ফলে কৃষকদের সেচের উপর নির্ভরশীলতা বেড়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খরচ বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচও অনেক গুণ বাড়ছে।


রাজশাহীর কৃষক তসলিমা খাতুন জানালেন,

“আমাদের এলাকায় পানির অভাবে ধান গাছ শুকিয়ে যায়। সেচ দিতে গিয়ে খরচ এত বেশি হয় যে শেষ পর্যন্ত লাভ থাকে না।”



সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলে প্রতিবছর আগাম বন্যায় ধানক্ষেত তলিয়ে যায়। এক ফসলি জমির কৃষকরা এপ্রিল মাসের আগাম বন্যায় বছরের একমাত্র ফসল হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েন।


কৃষক জয়নাল আবেদীন বললেন, “বছরে একবার ফসল করি, কিন্তু বন্যা এসে তা নিয়ে যায়। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে বীজ কিনি, শেষে ফসল ঘরে তুলতে না পেরে দেনার বোঝা বাড়ে।”


২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় ‘আইলা’, ২০২০ সালের ‘আম্পান’ এবং সম্প্রতি ঘূর্ণিঝড় ‘রিমাল’-এর মতো দুর্যোগ লক্ষাধিক একর কৃষিজমি লবণাক্ত পানিতে ডুবিয়ে দিয়েছে। ফলে শুধু কৃষিজমি নয়, গবাদি পশু ও মৎস্য খাতও ব্যাপক ক্ষতির শিকার হয়েছে।


বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, ধানের উৎপাদন প্রতিবছর গড়ে ১০-১৫ শতাংশ হ্রাস পাচ্ছে। গম উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। ভুট্টা ও ডালের উৎপাদনেও অস্বাভাবিক ওঠানামা দেখা যাচ্ছে।


ধান বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার মূল ভিত্তি হলেও অনিয়মিত বর্ষা ও অতিরিক্ত তাপমাত্রায় ফলন কমে যাচ্ছে।


কৃষি উৎপাদন হ্রাস পাওয়ায় কৃষকের আয় কমছে। ফলে গ্রামীণ দারিদ্র্য বাড়ছে এবং কৃষকরা শহরমুখী হচ্ছেন। এতে শহরে কর্মসংস্থানের সংকট এবং সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকি বাড়ছে।


বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট জলবায়ু সহনশীল ধান, গম ও শাকসবজির জাত উদ্ভাবন করেছে। যেমন—বিআর-৪৭ ধান লবণাক্ততা সহনশীল এবং বিনা-১১ ধান খরা সহনশীল। সরকার কৃষকদের সেচ সুবিধা, ভর্তুকি, কৃষিঋণ এবং প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করেছে।


আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও এ ক্ষেত্রে জরুরি হয়ে পড়েছে। জাতিসংঘের গ্রীন ক্লাইমেট ফান্ড (GCF) এবং অন্যান্য বৈশ্বিক জলবায়ু তহবিল থেকে অর্থায়ন পেলে কৃষি খাতে টেকসই অভিযোজন সম্ভব হবে।


আগামী নভেম্বরে ব্রাজিলের বেলেম শহরে অনুষ্ঠিতব্য COP 30 জলবায়ু সম্মেলনে বাংলাদেশ কৃষি খাতের অভিযোজনকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃষি খাতে পর্যাপ্ত আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি হস্তান্তর ছাড়া বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারবে না।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মনোয়ার হোসেন বলেন,

“বাংলাদেশ একা এই সংকট সামাল দিতে পারবে না। কৃষি খাতে অভিযোজনের জন্য উন্নত দেশগুলোর প্রতিশ্রুত অর্থায়ন বাস্তবে রূপ নিতে হবে। নইলে খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে।”

সম্পর্কিত খবর

;