বানারীপাড়ায় আওয়ামী লীগ নেতারা আত্মগোপনে, ‘অজ্ঞাতনামা’ আসামী আতঙ্কে ঘরছাড়া কর্মীরা.....

প্রকাশ : 16 Nov 2024
বানারীপাড়ায় আওয়ামী লীগ নেতারা আত্মগোপনে, ‘অজ্ঞাতনামা’ আসামী আতঙ্কে ঘরছাড়া কর্মীরা.....

রাহাদ সুমন ,বিশেষ  প্রতিনিধি॥ বরিশালের বানারীপাড়ায় সিংহভাগ আওয়ামী লীগ নেতা আত্মগোপনে রয়েছেন। মামলার “অজ্ঞাতনামা” আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার আতঙ্কে আছেন কর্মীরাও। তবে এসব নেতাকর্মীর মধ্যে কেউ কেউ সামাজিক মাধ্যমে সরব রয়েছেন। জানা যায়, উপজেলায় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীর একচ্ছত্র দাপটে গত সাড়ে পনেরো বছর বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মীরা মাঠেই দাঁড়াতে পারেননি। বিচ্ছিন্ন কিছু দলীয় কর্মসূচি পালণ ছাড়া ফেসবুকসহ সামাজিক মাধ্যমে সরব ছিল বিএনপি। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের দিন ৫ আগস্ট দুপুরের পরে বানারীপাড়ায় সাবেক সংসদ সদস্য ও ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি মো. শাহে আলম. উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আলহাজ¦ গোলাম ফারুক,সহ-সভাপতি ও সদর ইউপি চেয়ারম্যান আ. জলিল ঘরামী, যুগ্ম সম্পাদক সুব্রত লাল কুন্ডু, সাংগঠনিক সম্পাদক ও উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান নুরুল হুদা,আওয়ামী লীগ নেতা শামসুল আলম মল্লিক, পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ শহিদুল ইসলাম এবং পৌর কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতা জাকির হোসেন মোল্লার বাড়িঘরে বিক্ষুদ্ধরা হামলা চালিয়ে ভাংচুর করে। এরমধ্যে উপজেলা চেয়ারম্যান গোলাম ফারুকের বাড়ি ও উপজেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয় ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। গোলাম ফারুকের বাড়িতে গণভবন স্টাইলে লুটপাটও চালানো হয়। হামলা থেকে বাদ যায়নি দৈনিক যুগান্তরের উপজেলা প্রতিনিধি এসএম গোলাম মাহমুদ রিপনের বন্দর বাজারের ফেরীঘাটের দোকানঘরও। ৫ আগস্টের পর থেকে আওয়ামী লীগের বেশির ভাগ নেতাকর্মীকে প্রকাশ্যে দেখা যাচ্ছে না। রাজনীতির মাঠ দখলে নিয়েছে বিএনপি-জামায়াত। শুরুতেই গা-ঢাকা দেন উপজেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা। তৃণমূলের কর্মীরাও এখন মামলায় ‘অজ্ঞাত’ আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। যদিও আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীর একাংশ ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরব রয়েছেন।

বানারীপাড়া উপজেলায় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে হত্যা প্রচেষ্টা, চাঁদাবাজি, ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও মারধরসহ বিভিন্ন অভিযোগে বানারীপাড়া থানা ও বরিশাল আদালতে এ পর্যন্ত ডজন খানেক মামলা হয়েছে। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার (১৪  নভেম্বর) রাতে সুনির্দিষ্ট ১৪ ও অজ্ঞাতনামা ১৫/২০জন আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীকে আসামী করে থানায় মামলা দায়ের করা হয়।  এরমধ্যে সাবেক সংসদ সদস্য মো. শাহে আলমসহ নিজদলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে একটি মামলা এক যুবলীগ নেতা দায়ের করেছেন। বাকীগুলোর বাদী বিএনপি নেতা-কর্মীরা।  বেশ কয়েকজন নেতা একাধিক মামলার আসামী হয়েছেন। এসব মামলায় বরিশাল-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি মো. শাহে আলম,বানারীপাড়া  উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সদ্য সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আলহাজ¦ গোলাম ফারুক,বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক ও সদ্য সাবেক বানারীপাড়া পৌরসভার মেয়র অ্যাডভোকেট সুভাষ চন্দ্র শীল,উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক জেলা পরিষদ প্যানেল চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মাওলাদ হোসেন সানা,উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও চাখারের ইউপি চেয়ারম্যান সৈয়দ মজিবুল ইসলাম টুকু,সহ-সভাপতি ও সলিয়াবাকপুর ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান জিয়াউল হক মিন্টু, সহ-সভাপতি ও ইলুহার ইউপি চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম, যুগ্ম সম্পাদক সুব্রত লাল কুন্ডু ও অধ্যাপক জাকির হোসেন, সাংগঠনিক সম্পাদক ও জেলা পরিষদের সদ্য সাবেক সদস্য মামুন-উর রশিদ স্বপন,সাংগঠনিক সম্পাদক ও সদ্য সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান নুরুল হুদা, পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ শহিদুল ইসলাম ও উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ফোরকান আলী হাওলাদারসহ উপজেলা,পৌর ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের প্রায় দুই শতাধিক সুনির্দিষ্ট ও তিন শতাধিক অজ্ঞাতনামা আসামী করা হয়েছে। এরমধ্যে সাবেক সংসদ সদস্য মো. শাহে আলম ঢাকায় গুলশানে এক ছাত্র হত্যা মামলায় এবং বানারীপাড়ায় এক বিএনপি নেতার দায়েরকৃত মামলায় উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও চাখারের ইউপি চেয়ারম্যান সৈয়দ মজিবুল ইসলাম টুকু গ্রেপ্তার হয়ে বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। ইতোমধ্যে অজ্ঞাতনামা আসামী হিসেবে আওয়ামী লীগের ৮ নেতা-কর্মী গ্রেফতার হওয়ার পরে জামিনে বের হয়েছেন। এছাড়া মামলার আসামী হওয়া সিংহভাগ নেতাকর্মী বরিশাল আদালত থেকে জামিন নিয়েছেন। জামিন নিয়েও তাদের মধ্যে বেশীরভাগ আত্মগোপনে রয়েছেন। অজ্ঞাতনামা আসামী হিসেবে গ্রেফতার আতঙ্ক তাড়া করে ফিরছে দলের তৃনমূল নেতা-কর্মীদের। উপজেলার ৮ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের মধ্যে দু-তিনজন পরিষদে কালেভদ্রে গেলেও বাকী চেয়ারম্যানরা ও বেশীরভাগ ইউপি সদস্য হামলা ও গ্রেফতার আতঙ্কে পরিষদমুখী হননা। শুধু মূল দল নয়, আওয়ামী লীগের সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতারাও লাপাত্তা। যারা এলাকায় অবস্থান করছেন, তারাও ‘অজ্ঞাতপরিচয় আসামি’ আতঙ্কে রয়েছেন। যে কাউকে যে কোনো সময় আটক করে যে কোনো একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হতে পারে বলে মনে করছেন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা।

আওয়ামী লীগের দলীয় সূত্রে জানা যায়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়াতে তৃণমূল পর্যায়ের নেতারা ঘরছাড়া। তারা নিজেদের গোপন রাখার চেষ্টা করছেন। তবে পরিবার-পরিজনরা দিনরাত আতঙ্কের মধ্যে থাকছেন। ইউনিয়ন থেকে শুরু করে উপজেলা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, কৃষক লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, শ্রমিকলীগ ও মহিলা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও পালিয়ে বেড়াচ্ছেন বলে জানা গেছে। এ ব্যপারে

উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আক্তার হোসেন মোল্লা মুঠোফোনে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বানারীপাড়ায় রাজনৈতিক সহবস্থান ছিল। কিন্তু এখন ভূয়া অভিযোগে মিথ্যা মামলা দিয়ে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের হয়রাণি করা হচ্ছে। অজ্ঞাতনামা আসামী হিসেবে গ্রেপ্তার আতঙ্কে ঘরছাড়া দলের নেতা-কর্মীরা।

এ বিষয়ে বানারীপাড়া উপজেলা বিএনপির আহবায়ক মো. শাহ আলম মিঞা বলেন, তাদের অভিভাবক কেন্দ্রীয় বিএনপির কার্যনির্বাহী সদস্য এস সরফুদ্দিন আহম্মেদ সান্টুর নির্দেশনায় বানারীপাড়া-উজিরপুরে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে শুরু থেকেই জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি ও  এর অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা মাঠে সোচ্চার রয়েছেন। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা নিজেদের কৃতকর্মের ভয়ে আত্মগোপনে থাকছেন। অপরাধের বিচার আইন আদালতের বিষয়, বিএনপি কাউকে হামলা কিংবা মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রাণি করছে না বলেও জানান তিনি।

এ প্রসঙ্গে বক্তব্য নিতে শনিবার (১৬ নভেম্বর) দুপুরে বানারীপাড়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. মোস্তফাকে মুঠোফোনে কল দিলে তিনি একটি কনফারেন্সে রয়েছেন বলে জানান। 

সম্পর্কিত খবর

;