মাত্র ১৩ মিনিটের টর্নেডোয় আর্জেন্টিনা পৌঁছে গেল কোয়ার্টার ফাইনালে
।।
।। মুক্তার হোসেন নাহিদ ।।
আর্জেন্টিনার সমর্থক হিসেবে শেষ ১৬-তে বিজয়ের আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলাম। কেবল
আমি নয়, শ্বাসরুদ্ধকার অবস্থায় ছিলেন গোটা দুনিয়ার কোটি কোটি ভক্ত। হঠাৎ টর্নেডোর
গতিতে ফিরে এলো মেসি বাহিনী। মাত্র ১৩ মিনিটের অবিশ্বাস্য কামব্যাকে আর্জেন্টিনা
পৌঁছে গেল কোয়ার্টার ফাইনালে। চারদিকে স্লোগানের আওয়াজ-“এর নাম আর্জেন্টিনা, এর নাম
মেসি।” ফারাওদের নিশ্চিত বিজয়ের স্বপ্নভঙ্গ করা আলবিসেলেস্তেদের ছন্দময় খেলার অবিস্মরণীয়
বিজয়ে প্রাণ ফিরে আসে আর্জেন্টাইন শিবিরে।
২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ১৬-এর মঞ্চে আগের রাতেই বিষাদের ছায়া নেমে এসেছিল টেক্সাসের
আকাশে; হালান্ড ঝড়ে হেক্সা স্বপ্ন চূর্ণ করে ব্রাজিল টিকিট কেটেছিল বাড়ির পথে। ফুটবল
রোমান্টিকদের মনে তখন একটাই শঙ্কা-তবে কি পেলের উত্তসূরীদের পর এবার
ম্যারাডোনার উত্তসূরীরাও বিদায় নেবে? ফুটবল ইতিহাসের সেই চিরচেনা ল্যাটিন সাম্বা আর
আলবিসেলেস্তেদের ছন্দ ছাড়া কি পানসে হয়ে যাবে এই বিশ্বকাপের মহোৎসব? এমন এক চরম স্নায়ুচাপের
গত রাতে (৭ জুলাই) আটলান্টা স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হয়েছিল আর্জেন্টিনা ও মিশর। সেখানেই
রচিত হলো ফুটবল ইতিহাসের আরেকটি মহাকাব্য। ২-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়েও শেষ ১৩ মিনিটের
এক অবিশ্বাস্য টর্নেডোতে মিশরকে ৩-২ গোলে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট কাটল বিশ্ব
চ্যাম্পিয়নরা।
ম্যাচের শুরু থেকেই আর্জেন্টিনা স্বভাবসুলভ বল পজিশন ধরে রেখে ফারাওদের রক্ষণভাগে
একের পর এক আক্রমণ চালাতে থাকে। কিন্তু ‘নিটোল রক্ষণাত্মক’ কৌশলে মিশর যেন এক ফাঁদ
পেতে রেখেছিল। ম্যাচের মাত্র ১৫তম মিনিটে সেই ফাঁদে পা দেয় আর্জেন্টিনার ডিফেন্স; কর্নার
থেকে চমৎকার হেডে গোল করে মিশরকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন ইয়াসের ইব্রাহিম।
পিছিয়ে পড়া আর্জেন্টিনার কাছে ২০তম মিনিটে আসে সমতায় ফেরার সুবর্ণ সুযোগ। পেনাল্টি
পায় আলবিসেলেস্তেরা। কিন্তু পেনাল্টি স্পটে দাঁড়িয়ে সবাইকে স্তব্ধ করে দিয়ে বিশ্বকাপের
এই আসরে আবারো গোল করতে ব্যর্থ হন খোদ অধিনায়ক লিওনেল মেসি! মিশরীয় গোলরক্ষক মোস্তফা
শৌবির যেন সেদিন প্রতিজ্ঞা করে নেমেছিলেন কোনো বল জালে ঢুকতে দেবেন না। মেসির পেনাল্টি
সেভ করার পর প্রথমার্ধজুড়ে আলভারেজ ও ম্যাক অ্যালিস্টারের নিশ্চিত কিছু সুযোগও তিনি
নসাৎ করে দেন। মেসির একটি ফ্রি-কিক পোস্টে লেগে ফিরে এলে ১-০-তে পিছিয়ে থেকেই প্রথমার্ধ
শেষ করে আর্জেন্টিনা। আগের রাতে ব্রাজিলের পেনাল্টি মিসের ভূত যেন ভর করেছিল আর্জেন্টিনার
ওপরও!
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেও আর্জেন্টিনার খেলায় সেই চেনা ধার ফিরছিল না। উল্টো ৬৭
মিনিটে আর্জেন্টিনার অল-আউট আক্রমণের সুযোগ নিয়ে এক মারাত্মক কাউন্টার-অ্যাটাক থেকে
গোল করে বসেন মিশরের মোস্তফা জিকো। স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে তখন পিনপতন নীরবতা। ২-০
ব্যবধানে পিছিয়ে পড়া বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা তখন টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যাওয়ার চরম খাড়ার
প্রান্তে দাঁড়িয়ে।
ঠিক সেই মুহূর্তে আর্জেন্টিনার ডাগআউট থেকে আসে সেই লাইফলাইন। কোচ লিওনেল স্কালোনি
মাঝমাঠের ডি পল এবং ডিফেন্সের তাগলিয়াফিকোকে তুলে নিয়ে অল-আউট আক্রমণে মাঠে নামান লাউতারো
মার্টিনেজ ও নিকোলাস গঞ্জালেসকে। এই কৌশলগত পরিবর্তনই ম্যাচের ভাগ্য পুরোপুরি ঘুরিয়ে
দেয়।
৭৮ মিনিট পর্যন্ত ২-০ গোলে এগিয়ে থাকা মিশর হয়তো ভাবতেও পারেনি পরের ১৪ মিনিটে
তাদের ওপর দিয়ে কী ঝড় বইতে চলেছে!
৭৯ মিনিটে পেনাল্টি মেসির পাস থেকে উড়ে আসা বলে বুলেট হেডে গোল করে ব্যবধান ২-১
করেন ক্রিস্টিয়ান রোমেরো।
ওই গোলের মাত্র ৪ মিনিট পরে বক্সের ভেতর
জটলার মধ্য থেকে এক জাদুকরী ফিনিশিংয়ে গোল করে আর্জেন্টিনাকে ২-২ সমতায় ফেরান লিওনেল
মেসি। গ্যালারিতে তখন আকাশি-সাদার বাঁধভাঙা জোয়ার।
ম্যাচ যখন নিশ্চিতভাবেই অতিরিক্ত সময়ের দিকে গড়াচ্ছিল, ঠিক ইনজুরি টাইমের দ্বিতীয়
মিনিটে লিসান্দ্রো মার্টিনেজের মাপা অ্যাসিস্ট থেকে নরওয়ের বিরুদ্ধে ব্রাজিলের মতোই
এক নাটকীয় হেডে গোল করে বসেন এনজো ফার্নান্দেজ! ৩-২ ব্যবধানে লিড নেয় আর্জেন্টিনা।
ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজতেই যেখানে মিশরীয় ফুটবলাররা কান্নায় ভেঙে পড়লেন,
কান্নায় ভেঙে পড়েন বিজয়ী অধিনায়ক মেসিও। আর্জেন্টিনা মাঠ ছাড়ে এক বুক স্বস্তি আর বীরের
বেশে। প্রথমার্ধে পেনাল্টি হেলায় হারিয়েও আর্জেন্টিনা যেভাবে শেষ মুহূর্তে নিজেদের
ফিরে পেয়েছে, তা তাদের চ্যাম্পিয়ন মানসিকতারই প্রমাণ।
মিশরের জন্য সত্যিই মন খারাপ হয়। পুরো ম্যাচে মোস্তফা শৌবির যেভাবে গোলপোস্টের
নিচে মানবপ্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন এবং তাদের কাউন্টার-অ্যাটাক যেভাবে আর্জেন্টিনার
রক্ষণ কাঁপিয়ে দিয়েছিল, তাতে ফারাওদের এই লড়াই কুর্নিশ পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু ফুটবল
শেষ পর্যন্ত স্নায়ুর খেলা, আর সেখানে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত হাল না ছাড়ার গল্প লিখে জিতে
গেল আর্জেন্টিনাই।
ব্রাজিল ভক্তদের মন খারাপের এই বিশ্বকাপে যদি আর্জেন্টিনাও আজ বিদায় নিত, তবে কোটি কোটি ফুটবল প্রেমীর হৃদস্পন্দন থমকে যেত। পেলে-রোনালদোর উত্তরসূরীদের বিদায়ের পর ম্যারাডোনা-মেসির উত্তরসূরীদের এই টিকে থাকা ফুটবল বিশ্বকাপকে তার আসল জৌলুস ফিরিয়ে দিল। কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার সামনে এখন নতুন চ্যালেঞ্জ, তবে আটলান্টার এই রূপকথা ফুটবল ভক্তদের মনে রূপালী হরফে লেখা থাকবে অনেক দিন! অভিনন্দন আর্জেন্টিনা! অভিনন্দন মিশর।
লেখকঃ সাংবাদিক ও কলাম লেখক।
আতিকুল ইসলাম টিটু:জাতীয় সংসদ ভবন শুধু একটি প্রশাসনিক স্থাপনা নয়; এটি জাতীয় সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র এবং জনগণের রাজনৈতিক ইচ্ছার সাংবিধানিক প্রতীক। সেই সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম স্বাধী ...
।। মুক্তার হোসেন নাহিদ ।।হাইটিনা, জাপান্টিনা কিংবা নরওয়েন্টিনা—যে নামেই ট্রল করা হোক না কেন, আর্জেন্টিনার কট্টর সমর্থক হওয়ার পরেও আমি সবসময় ব্রাজিলের বিজয় কামনা করেছি। কারণ বিশ্ব ফুটবল উন্মাদনার ...
বিল্লাল বিন কাশেম:একটি দেশের উন্নয়নের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি তার মানবসম্পদ। প্রাকৃতিক সম্পদ, অবকাঠামো কিংবা প্রযুক্তিগত অগ্রগতি যতই থাকুক না কেন, দক্ষ, সৃজনশীল ও কর্মমুখী জনগোষ্ঠী ছাড়া টেকসই উন্নয়ন স ...
আফসানা আরেফিন:আমরা এক অদ্ভুত প্যারাডক্স বা আপাত-বিরোধিতার গোলকধাঁধায় দাঁড়িয়ে আছি। পুঁজিবাদী উৎপাদনব্যবস্থা, সোশ্যাল মিডিয়ার কৃত্রিম কিউরেট করা জীবন এবং করপোরেট সংস্কৃতির পারফরম্যান্স রিভিউ সবকিছু মিলে ...
সব মন্তব্য
No Comments