মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন:
বাংলাদেশের ইতিহাসে কিছু প্রকল্প থাকে, যেগুলো শুধু অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং একটি জাতির ভবিষ্যৎ পুনর্গঠনের প্রতীক হয়ে ওঠে। পদ্মা ব্যারাজ তেমনই একটি স্বপ্ন, তেমনই একটি দূরদর্শী পরিকল্পনা। দীর্ঘ কয়েক দশকের গবেষণা, সমীক্ষা ও পরিকল্পনার পর অবশেষে ‘পদ্মা ব্যারাজ (প্রথম পর্যায়)’ প্রকল্প চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে। প্রায় ৩৩ হাজার ৪৭৪ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন এই মহাপরিকল্পনা শুধু একটি ব্যারাজ নির্মাণ নয়; এটি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতি, কৃষি, নদী ব্যবস্থাপনা ও জনজীবনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে। প্রকল্পের আওতায় রাজবাড়ী জেলার পাংশা উপজেলায় পদ্মা নদীর ওপর ২.১ কিলোমিটার দীর্ঘ মূল ব্যারাজ নির্মাণ করা হবে। ব্যারাজটির মাধ্যমে প্রায় ২৯০ কোটি ঘনমিটার পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে, যা শুষ্ক মৌসুমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
প্রায় ২৫ বছর আগে বিএনপি সরকারের সময় পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের ধারণার সূচনা হয়। তখনই উপলব্ধি করা হয়েছিল, ফারাক্কা ব্যারাজের প্রভাবে শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা ও এর শাখা নদীগুলোর পানিপ্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাচ্ছে। এর ফলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা পানিশূন্যতা, খরা ও লবণাক্ততার সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছে; কৃষি, মৎস্যসম্পদ এবং নৌপথও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই সংকট মোকাবিলার লক্ষ্যেই পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। ব্যারাজ নির্মাণের সম্ভাবনা যাচাইয়ে গত শতাব্দীর ষাটের দশক থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত চারটি সমীক্ষা পরিচালিত হয়। পরে ২০০৫ সালে বিএনপি সরকার প্রকল্পটির বিস্তারিত সম্ভাব্যতা সমীক্ষার কাজ শুরু করে। দীর্ঘ গবেষণা ও পরিকল্পনার ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালে পদ্মা নদীর ওপর ব্যারাজ নির্মাণ প্রকল্প আনুষ্ঠানিক অনুমোদন লাভ করে।
মূলত ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজের কারণে শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা ও এর শাখা নদীগুলোতে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় যে পানি সংকট, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং কৃষি ও জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি হয়েছে, তা মোকাবিলার লক্ষ্যেই এই প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে গড়াই-মধুমতি, হিসনা-মাথাভাঙ্গা, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতি নদীসহ গুরুত্বপূর্ণ নদী ব্যবস্থার পুনরুজ্জীবন ঘটবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সেচব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন ঘটবে। এক্ষেত্রে ব্যারাজের মাধ্যমে পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ ও সংরক্ষণ করে শুষ্ক মৌসুমে ওইসব নদীতে প্রায় ৮০০ কিউসেক পানি সরবরাহ করা সম্ভব হবে। কৃষকেরা সারা বছর পর্যাপ্ত পানি পাবেন এবং যার ফলে যশোর, খুলনা, কুষ্টিয়া, মাগুরা, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, নড়াইল, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, রাজবাড়ী, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, পাবনা, রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও পিরোজপুর অঞ্চলের প্রায় ২৯ লাখ হেক্টর কৃষিজমি সেচ সুবিধার আওতায় আসবে। এর ফলে দেশে অতিরিক্ত প্রায় ২৪ লাখ টন ধান উৎপাদন সম্ভব হবে, যা খাদ্যনিরাপত্তা জোরদারে সহায়ক হবে।
এছাড়া নদীর নাব্যতা রক্ষা, মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতেও প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। প্রথম পর্যায়ে গড়াই-মধুমতী নদীর ১৩৫.৬ কিলোমিটার এবং হিসনা নদীর ২৪৬.৪৬ কিলোমিটার অংশে পুনঃখনন ও ড্রেজিং করা হবে। দ্বিতীয় পর্যায়ে চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতী নদী ব্যবস্থার পুনরুদ্ধার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে। ফলে পদ্মা ব্যারাজ শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়, বরং দেশের কৃষি, নদী ও অর্থনীতির পুনর্জাগরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। সুতরাং, পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প শুধু একটি পানি ব্যবস্থাপনা উদ্যোগ নয়; এটি বাংলাদেশের পানি নিরাপত্তা, খাদ্য নিরাপত্তা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।
মৎস্য খাতেও এ প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। নদীতে সারা বছর পানিপ্রবাহ বজায় থাকলে মাছের আবাসস্থল ও প্রজনন ক্ষেত্র সংরক্ষিত হবে, ফলে দেশীয় মাছের উৎপাদন প্রায় সোয়া দুই লাখ টন বৃদ্ধি পেতে পারে। এতে মৎস্যজীবীদের জীবিকা যেমন স্থিতিশীল হবে, তেমনি দেশের পুষ্টি ও অর্থনীতিও উপকৃত হবে। এ ছাড়া প্রকল্পটি সুন্দরবনসহ নদীতীরবর্তী এলাকার জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক হবে। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নৌপরিবহন ও শিল্পের প্রসারের মাধ্যমে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল এবং উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে পদ্মা ব্যারাজ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
ব্যারাজের মূল উদ্দেশ্য পানির প্রবাহ বন্ধ করা নয়, বরং তা নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনা করা। এ ধরনের অবকাঠামোয় একাধিক গেটের মাধ্যমে পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রিত হয় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কৃত্রিম খাল বা নদীপথে পানি সরবরাহ করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে একটি নদীর পানি অন্য নদীতে প্রবাহিত করে শুকিয়ে যাওয়া নদীগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করা হয়। পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পেও সেই পরিকল্পনাই গ্রহণ করা হয়েছে। বাংলাদেশে এর আগে মনু, তিস্তা ও টাঙ্গন নদীর ওপর ব্যারাজ নির্মাণ করা হয়েছে। তবে পদ্মা ব্যারাজ হবে দেশের অন্যতম বৃহৎ পানি ব্যবস্থাপনা প্রকল্প। ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজের কারণে শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বহু নদী শুকিয়ে যাচ্ছে, কৃষি ও মৎস্য খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের মাধ্যমে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মৃতপ্রায় পাঁচটি নদী পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নিজস্ব অর্থায়নে আগামী সাত বছরে বাস্তবায়নযোগ্য এ প্রকল্প সম্পন্ন হলে ২৪টি জেলার পানিসংকট হ্রাস পাবে এবং প্রায় সাত কোটি মানুষ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে উপকৃত হবে। একই সঙ্গে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, নদীর নাব্যতা রক্ষা এবং লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জিত হবে।
সবদিক বিবেচনায় পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পকে দেশের অন্যতম বৃহৎ ও দূরদর্শী উন্নয়ন উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এটি বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতিগুলোর একটি ছিল, যা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন পেয়েছে। আগামী অর্থবছর থেকেই এর প্রথম পর্যায়ের কাজ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলায় নির্মিতব্য ২.১ কিলোমিটার দীর্ঘ ব্যারাজে ৭৮টি স্পিলওয়ে, ১৮টি আন্ডার স্লুইস এবং মাছের নিরাপদ চলাচলের জন্য দুটি ফিশ পাস থাকবে। এর মাধ্যমে প্রায় ২৯০ কোটি ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা হবে এবং পানি বণ্টনের জন্য তিনটি অফটেক অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩৩ সালের মধ্যে ব্যারাজ নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ার পর দ্বিতীয় পর্যায়ে তিনটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র ও সাতটি স্যাটেলাইট শহর গড়ে তোলা হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নদীগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরবে, লবণাক্ততা কমবে, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য সুরক্ষিত হবে এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটবে।
পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প কেবল একটি অবকাঠামোগত উন্নয়ন কর্মসূচি নয়; এটি বাংলাদেশের পানি নিরাপত্তা, খাদ্য নিরাপত্তা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা। দীর্ঘদিনের পানিসংকট, নদীর নাব্যতা হ্রাস, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং কৃষি ও মৎস্য খাতের নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এ প্রকল্প একটি কার্যকর ও টেকসই সমাধানের পথ দেখাতে পারে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মৃতপ্রায় নদীগুলো নতুন প্রাণ ফিরে পাবে, কৃষি উৎপাদন ও মৎস্যসম্পদ বৃদ্ধি পাবে, কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং উপকূলীয় অঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও টেকসই উন্নয়নের ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করবে। তাই পদ্মা ব্যারাজকে শুধু একটি ব্যারাজ নির্মাণ প্রকল্প হিসেবে নয়, বরং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের সমৃদ্ধি, জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং নদীকেন্দ্রিক সভ্যতার পুনর্জাগরণের এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবেই বিবেচনা করা যায়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিযাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এটি শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়; বরং টেকসই উন্নয়ন, খাদ্যনিরাপত্তা, পরিবেশ সুরক্ষা এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়নের একটি সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ। সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে পদ্মা ব্যারাজ বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
#
-লেখক: সিনিয়র তথ্য অফিসার, তথ্য অধিদফতর।
পিআইডি ফিচার
বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় আজ একটি স্পষ্ট দ্বৈত বাস্তবতা দেখা যায়—একদিকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, অন্যদিকে প্রাইভেট স্কুল ও কিন্ডারগার্টেন। এই দুই ধারার মধ্যে শুধু কাঠামোগত পার্থক্য নয়, বরং ...
মানিক লাল ঘোষবাংলাদেশের প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক রাজনীতির ইতিহাসে এক অবিসংবাদিত নাম মোহাম্মদ নাসিম। ১৯৪৮ সালের ২ এপ্রিল সিরাজগঞ্জ জেলার কাজীপুর উপজেলায় জন্মগ্রহণ করা এই লড়াকু নেতা তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জ ...
তাহমিদ জেরিন নুর:বুলিং ও র্যাগিং শব্দদ্বয়ের সাথে আমরা সবাই কম-বেশি পরিচিত। বুলিং ও র্যাগিং হলো ইচ্ছাকৃতভাবে কাউকে শারীরিক বা মানসিকভাবে কষ্ট দেওয়া বা হেনস্থা করার আগ্রাসী আচরণ। কাউকে ব্যঙ্গনামে ডাকা ...
অন্তবর্তীকালীন সরকার বিদায় নিয়েছে। নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে গঠিত বর্তমান সরকারের সামনে আবারো উপস্থিত জাতীয় বাজেট ঘোষণার সেই অমোঘ সন্ধিক্ষণ!‘বাজেট’ শবদটি শুনলেই আমাদের চোখে-মুখে-অন্তরে-বাহিরে ভয় আর অস্বস্ ...
সব মন্তব্য
No Comments