ফরিদপুরে মরুর গোলাপ চাষ: সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত।

প্রকাশ : 23 Mar 2026
ফরিদপুরে মরুর গোলাপ চাষ: সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত।


অনিক রায়, ফরিদপুর অফিস: আফ্রিকার মরুপ্রান্তরে জন্ম নেওয়া এক অনন্য শোভাবর্ধক উদ্ভিদ এখন রঙিন সৌন্দর্য ছড়িয়ে দিচ্ছে ফরিদপুরের এক ছাদ বাগানে।


মরুর গোলাপ নামে পরিচিত অ্যাডোনিয়াম (Adenium obesum) গাছের বাহারি ফুলে সেজে উঠেছে বোয়ালমারীর তরুণ আকাশ সাহার বাড়ির ছাদ। শখ থেকে শুরু হলেও এখন তার এই উদ্যোগ পরিণত হয়েছে সফল এক সবুজ উদ্যোক্তা গল্পে।


অ্যাডোনিয়াম Apocynaceae পরিবারভুক্ত একটি শোভাবর্ধক উদ্ভিদ, যার আদি নিবাস আফ্রিকার শুষ্ক ও মরুভূমি অঞ্চল। মোটা কাণ্ড ও শিকড়ে পানি সঞ্চয় করার বিশেষ ক্ষমতা থাকায় গাছটি কম পানিতেও সহজে টিকে থাকতে পারে। এ গাছে সাধারণত লাল, গোলাপি, সাদা, হলুদসহ নানা রঙের আকর্ষণীয় ফুল ফোটে, যা দেখতে অনেকটা গোলাপের মতো। এ কারণেই একে ইংরেজিতে ‘ডেজার্ট রোজ’ বা মরুর গোলাপ বলা হয়।


ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার একটি বাড়ির প্রায় ১ হাজার ৮০০ বর্গফুট জায়গাজুড়ে তিনতলার ছাদে গড়ে উঠেছে আকাশ সাহার এই ছাদ বাগান। সেখানে বিভিন্ন প্রজাতির অ্যাডোনিয়ামসহ বিরল জাতের অসংখ্য ফুলের গাছ রয়েছে। সরেজমিনে দেখা যায়, ছাদজুড়ে সাদা, হলুদ, গোলাপি, কমলা, মেরুন ও বেগুনি রঙের অ্যাডোনিয়াম ফুল ফুটে আছে। ফুলের এই মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্য দেখতে প্রতিদিনই আশপাশের এলাকা ছাড়াও দূরদূরান্ত থেকে দর্শনার্থী ও ক্রেতারা ছুটে আসছেন।


জানা গেছে, আকাশ সাহা একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। প্রায় ছয় বছর আগে শুধুমাত্র শখের বশে মাত্র ২০টি গাছ দিয়ে তিনি ছাদ বাগান শুরু করেন। শুরুতে থাইল্যান্ড থেকে সংগ্রহ করা এসব গাছ কিনতে তার খরচ হয়েছিল দুই থেকে তিন হাজার টাকা। 


সময়ের সঙ্গে ধৈর্য, পরিশ্রম ও ভালোবাসা দিয়ে তিনি ধীরে ধীরে বাগানটি বড় করেছেন। বর্তমানে তার ছাদ বাগানে কয়েক হাজার গাছ রয়েছে এবং ফুল থেকে বীজ সংগ্রহ করে তিনি নিজেই চারা উৎপাদন করেন। তার বাগানে এখন প্রায় সাত থেকে আট লাখ টাকার বিভিন্ন প্রজাতির ফুল গাছ রয়েছে। এসব গাছের চারা বিক্রি করে প্রতি মাসে তিনি গড়ে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা আয় করছেন।


আকাশ সাহার স্ত্রী ঐশি সাহা জানান, তাদের ছাদ বাগানে এখন অসংখ্য মরুর গোলাপ গাছ ও চারা রয়েছে। বিভিন্ন জায়গা থেকে সংগ্রহ করা এসব গাছের যত্ন তারা দুজনেই নেন। সকাল-বিকেল গাছের পরিচর্যা করতে তাদের খুব ভালো লাগে। মরুভূমির গাছ হওয়ায় এগুলোতে পানি কম লাগে এবং পরিচর্যাও তুলনামূলক সহজ। ফুলগুলো দেখতে এতটাই সুন্দর যে অনেক মানুষ দূরদূরান্ত থেকে বাগান দেখতে এবং চারা কিনতে আসেন।


আকাশের মা সাধনা সাহা বলেন, শুরুতে তার ছেলে যখন গাছ লাগানো শুরু করেন, তখন তারা বিষয়টিকে খুব একটা গুরুত্ব দেননি। কিন্তু পরে যখন বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষ গাছ দেখতে আসতে শুরু করে, তখন তারা বিষয়টি দেখে খুব খুশি হন। এখন এই ছাদ বাগান তাদের সবারই ভালো লাগে।


গাছের চারা কিনতে এসে ফরিদপুর সদরের বাসিন্দা স্বপন সাহা বলেন, অনলাইনের মাধ্যমে খবর পেয়ে তিনি এখানে এসেছেন। এখানে মরুভূমি অঞ্চলের অনেক জাতের ফুল গাছ রয়েছে, যা কাছ থেকে দেখে তার খুব ভালো লেগেছে। তিনি কয়েকটি গাছ কিনে নিয়ে নিজের বাড়ির ছাদেও বাগান করার পরিকল্পনা করছেন।


নিজের উদ্যোগ সম্পর্কে আকাশ সাহা বলেন, শুরুতে অনেকেই তার এই উদ্যোগকে পাগলামি বলে মনে করতেন। কিন্তু শখ থেকেই ধীরে ধীরে এটি এখন বাণিজ্যিক রূপ নিয়েছে। দীর্ঘদিনের পরিশ্রম ও ভালোবাসা দিয়ে তিনি এই বাগান গড়ে তুলেছেন। এখন তার বাগানে ১০০ টাকা থেকে শুরু করে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত দামের গাছ রয়েছে। গরম যত বাড়বে, গাছগুলো ততই ফুলে ভরে উঠবে বলে তিনি জানান।


তিনি আরও বলেন, শীতকালে গাছগুলো কিছুটা সুপ্ত অবস্থায় থাকে এবং তখন পাতা ঝরে যায়। অতিরিক্ত বৃষ্টি বা বেশি পানি হলে ফুল নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তবে বাংলাদেশের আবহাওয়ার সঙ্গে অ্যাডোনিয়াম এখন বেশ মানিয়ে নিয়েছে। ফলে গরমের সময় গাছগুলোতে প্রচুর ফুল ফোটে।



বোয়ালমারী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আলভীর রহমান বলেন, আকাশ সাহা তার ছাদ বাগানে মরুর গোলাপ বা অ্যাডোনিয়াম চাষ করে একটি সম্ভাবনাময় উদ্যোগ গড়ে তুলেছেন। এখানে বিভিন্ন ধরনের ফুলের গাছ রয়েছে এবং তিনি কয়েকশ থেকে কয়েক হাজার টাকায় গাছ বিক্রি করছেন।


বোয়ালমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম রকিবুল হাসান বলেন, মরুভূমি অঞ্চলের গাছ আমাদের এলাকায় সফলভাবে চাষ হওয়া একটি ইতিবাচক দিক। এ ধরনের উদ্যোগী তরুণদের পাশে থেকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে।

সম্পর্কিত খবর

;