চা শ্রমিকদের ৫০০ টাকা মজুরিসহ চার দফা দাবিতে ১৩৫ নাগরিকের সংহতি

প্রকাশ : 13 Aug 2026
চা শ্রমিকদের ৫০০ টাকা মজুরিসহ চার দফা দাবিতে ১৩৫ নাগরিকের সংহতি

ডেস্ক রিপোর্টার: চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা নির্ধারণসহ চার দফা দাবিতে চলমান আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়েছেন দেশের ১৩৫ জন নাগরিক। বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) দেওয়া এক নাগরিক বিবৃতিতে তারা চা শ্রমিকদের ন্যায়সঙ্গত দাবি বাস্তবায়নে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ দাবি করেন।


বিবৃতিতে বলা হয়, প্রায় এক মাস ধরে বাংলাদেশের চা শ্রমিকরা চার দফা দাবিতে আন্দোলন করছেন। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—২০২৩ সালে ন্যূনতম মজুরি বোর্ড কর্তৃক প্রণীত ‘গেজেট-২০২৩’ বাতিল, দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা নির্ধারণ, বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন (বি-৭৭) এর নির্বাচন এবং চা শ্রমিকদের ভূমি অধিকার নিশ্চিত করা।


নাগরিকরা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে চা শ্রমিকরা মজুরি বৃদ্ধি, গেজেট বাতিল, শিক্ষা-চিকিৎসা ও ভূমি অধিকারসহ বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন। বর্তমানে চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ১৮৭ টাকা হলেও ১০ আগস্ট ২০২৬ থেকে গেজেট অনুযায়ী তা ৫ শতাংশ বেড়ে ১৯৬ টাকা ৮০ পয়সা হয়েছে।


বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বর্তমান মজুরি দিয়ে একটি চা শ্রমিক পরিবারের মৌলিক খাদ্য চাহিদা পূরণ করাই কঠিন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের হিসাব তুলে ধরে নাগরিকরা বলেন, দৈনিক ১০ ঘণ্টা কাজ করলে একজন পুরুষ শ্রমিকের ৩ হাজার ৪৬৪ কিলোক্যালরি এবং নারী শ্রমিকের ২ হাজার ৪০৬ কিলোক্যালরি শক্তি ক্ষয় হয়। পাঁচ সদস্যের একটি চা শ্রমিক পরিবারের শুধু খাদ্য চাহিদা পূরণেই দৈনিক ৭৫০ টাকার বেশি প্রয়োজন বলে তারা উল্লেখ করেন।


পাশাপাশি শ্রীলঙ্কা ও কেনিয়ায় চা শ্রমিকদের তুলনামূলক বেশি মজুরির বিষয়টিও বিবৃতিতে তুলে ধরা হয়েছে।


চা শ্রমিকদের মজুরি নিয়ে মালিকপক্ষের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধাকে মজুরির অংশ হিসেবে দেখানোর সমালোচনা করে নাগরিকরা বলেন, বাসস্থান, আলো, পানি, চিকিৎসা, অবসর ভাতা বা ভবিষ্যৎ তহবিলে মালিকের দেওয়া অর্থ শ্রম আইনের দৃষ্টিতে মজুরির অন্তর্ভুক্ত নয়। ফলে এসব সুবিধার অর্থকে নগদ মজুরির সঙ্গে যোগ করে চা শ্রমিকদের প্রকৃত মজুরি বেশি দেখানোর কোনো আইনি ভিত্তি নেই বলেও তারা দাবি করেন।


বিবৃতিতে ২০২২ সালের চা শ্রমিকদের আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে বলা হয়, দীর্ঘ ১৯ দিনের আন্দোলনের পর শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ৫০ টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছিল। পরবর্তীতে চা শ্রমিক প্রতিনিধিদের সম্মতি ছাড়া সরকার ও মালিকপক্ষের উদ্যোগে ‘গেজেট-২০২৩’ প্রকাশ করা হয়। ওই গেজেটে মূল মজুরি ১৭০ টাকা নির্ধারণ করে প্রতিবছর ৫ শতাংশ হারে মজুরি বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।


নাগরিকদের অভিযোগ, গেজেটটিতে চা শ্রমিকদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা কমানো হয়েছে এবং গেজেটের মেয়াদকালে মজুরি বাড়ানোর বিষয়ে শ্রমিক প্রতিনিধিদের আলোচনার আইনি সুযোগও সীমিত করা হয়েছে। তারা অবিলম্বে ‘গেজেট-২০২৩’ বাতিলের দাবি জানান।


বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন (বি-৭৭)-এর নির্বাচন নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিবৃতিদাতারা। তাদের ভাষ্য, নিয়ম অনুযায়ী তিন বছর পরপর নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও প্রায় আট বছর ধরে ইউনিয়নটির নির্বাচন হচ্ছে না। তারা অবাধ, গ্রহণযোগ্য ও হস্তক্ষেপমুক্ত নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানান।


একই সঙ্গে চা শ্রমিকদের পূর্বপুরুষের বসতভিটার আইনসঙ্গত অধিকার বা ভূমির অধিকার নিশ্চিত করার দাবিও জানানো হয়।


বিবৃতিতে চা শ্রমিকদের চার দফা দাবির প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে সরকারকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।


চার দফা দাবি হলো—


১. ২০২৩ সালে ন্যূনতম মজুরি বোর্ড কর্তৃক প্রণীত ‘গেজেট-২০২৩’ বাতিল করতে হবে।

২. চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা নির্ধারণ করতে হবে।

৩. বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন (বি-৭৭)-এর নির্বাচন করতে হবে।

৪. চা শ্রমিকদের ভূমি অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।


বিবৃতিটি পাঠান সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক রাফিকুজ্জামান ফরিদ। বিবৃতির পক্ষে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, অধ্যাপক সলিমুল্লাহ্ খান, অধ্যাপক ডা. হারুন অর রশীদ, সামিনা লুৎফা, মোশাহিদা সুলতানাসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, আইনজীবী, চিকিৎসক, সাংস্কৃতিক কর্মী, সাংবাদিক, শ্রমিক ও ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীসহ মোট ১৩৫ জন নাগরিক স্বাক্ষর করেছেন।

সম্পর্কিত খবর

;